ওরা তোমার মিস্ট্রেস নয় বলতে চাও?
ক্লাইভের আর সহ্য হল না। তার হাতের ঘুষিটা গিয়ে সোজা ওয়াটসনের মুখের ওপর ফেটে চৌচির হয়ে গেল।
আর সঙ্গে সঙ্গে ওদিক থেকে দৌড়ে এসেছে ড্রেক। দু’জনকে দু’হাতে ঠেকিয়ে দিয়েছে।
ক্লাইভ বললে–আমি কি চাকরির ভয় করি মনে করেছে ওয়াটসন? আমি কি নিজের সেফটির কেয়ার করি মনে করেছে ও? দি কাওয়ার্ড, দি ব্যাস্টার্ড, দি–
খবর পেয়ে কেল্লার ভেতরের আরও সবাই এসে পড়েছে সেখানে। ফোর্টের ভেতরে নবাব একটা মসজিদ তৈরি করিয়েছিল, সেটা তখন ভাঙা হচ্ছিল। আলিনগর নাম বদলে আবার ক্যালকাটা নাম লেখা হচ্ছিল চারদিকে। ভেতরে সেপাই, পল্টন, রাজমিস্ত্রিদের ভিড়, পল্টনরা সব কেল্লা সব শহর লুটপাট করে যা-কিছু এনেছে তাই নিয়ে হইচই শুরু করে দিয়েছে। রাজমিস্ত্রিরা ভাঙা কেল্লা আবার সারিয়ে তুলছে। তার মধ্যে হঠাৎ কর্নেল আর অ্যাডমিরালের ঝগড়া কথাকাটাকাটি শুনে দৌড়ে কাছে। এসেছে।
অলরাইট, আমি এখানে থাকব না, আমি বরানগরে গিয়ে থাকব।
ড্রেক অনেক বোঝাতে লাগল–কর্নেল, আপনি ইংরেজদের এই বিপদের সময় রাগ করলে চলবে কী করে? যখন এনিমি দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন আপনি কেন নন-কোঅপারেট করছেন?
ক্লাইভ বললে–তা আমি ইংলিশ আর্মির কম্যান্ডার, না ওয়াটসন? কে?
ড্রেক বললে–ফোর্টের মধ্যে আমিই হচ্ছি গভর্নর, আমার কথা তো আপনারা দুজনেই শুনবেন! তারপর কাউন্সিলের সিলেক্ট কমিটি যা ঠিক করে তাই-ই হবে
তবে তাই-ই হোক, আমি কিন্তু এখানে থাকব না। আমি বরানগরের ক্যাম্পে গিয়ে উঠছি, আমি সেখানে নেটিভদের সঙ্গে মোর কম্ফোর্টেবলি থাকতে পারব–আই হেট ইউ পিপল অল
দুর্গা, ছোট বউরানি, হরিচরণ সবাই ব্যাপারটা দেখেছিল। শুধু তাদের জন্যেই সাহেবকে এত অপমান সইতে হল। বরানগরের পথে যেতে যেতে ক্লাইভ চেয়ে দেখলে চারদিকে। সমস্ত শহরটা পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল সাহেবের। শহর ভাঙা কত সহজ! হুগলিও তো। নিজে পুড়িয়ে এসেছে এমনি করে। এমনি করে কি সমস্ত ইন্ডিয়াকেই পোড়াতে হবে? কান্ট্রি না পোড়ালে কি নতুন করে কান্ট্রি গড়া যায় না? কে জানে! হয়তো নতুন করে ইন্ডিয়াকে গড়বার জন্যেই। লর্ড জেসাস ক্রাইস্ট ক্লাইভকে পাঠিয়েছে এই এখানে। হয়তো রবার্ট ক্লাইভই নতুন করে গড়ে তুলবে ইন্ডিয়াকে। হয়তো ইন্ডিয়াই হবে রবার্ট ক্লাইভের মাদারল্যান্ড। এই মাদারল্যান্ডেই রবার্ট ক্লাইভ খুঁজে পাবে নিজেকে। আশ্চর্য! কত স্বপ্নই না দেখেছিল একদিন ক্লাইভ।
সেদিন বরানগরে পৌঁছেই দুর্গা একেবারে সাহেবের কাছে এসে হাজির হয়েছিল।
দুর্গা বলেছিল আমাদের জন্যে তোমার অনেক হেনস্থা হল বাবা, তোমায় অনেক দুর্গতি সইতে হল
ক্লাইভ জিজ্ঞেস করেছিল–আপনাদের কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো? অসুবিধে হলে বলবেন!
তুমি থাকতে আর আমাদের অসুবিধে হবে কী করে বাবা। হরিচরণকে তো আমাদের সেবা করবার জন্যেই ছেড়ে দিয়েছ, সে তো আমরা দেখতে পাচ্ছি। ছেলেটি বড় ভাল বাবা!
সাহেব বললে–সব ইন্ডিয়ানরাই ভাল, ইউরোপিয়ানরাই খারাপ
ও কথা কেন বলছ বাবা! তুমিও তো ফিরিঙ্গি, তুমি কি খারাপ?
ক্লাইভ বললো দিদি, আমি খারাপ! আমি লেখাপড়া শিখিনি, আমি ইললিটারেট, মুখ, আমার বাবা-মা, আমার সোসাইটি, আমার ফ্রেন্ডস, আমাদের পার্লামেন্ট, সবাই আমাকে ওয়ার্থলেস বলে এইখানে পাঠিয়ে দিয়েছিল। ভেবেছিল আমি এখানকার ক্লাইমেটে মাছিমশার কামড়ে অসুখ হয়ে মারা যাব। মারা গেলেই ওরা গ্ল্যাড হত। কেন যে মারা গেলুম না, গড নোজ।
সাহেব গম্ভীর মুখে বসে ছিল। কথা বলতে গিয়ে যেন খই ফুটতে লাগল মুখ দিয়ে।
বলতে লাগল–মরতেই আমি চেয়েছিলুম দিদি! বিলিভ মি! আমি মরতেই চেয়েছিলুম! প্রত্যেকটা লড়াইতে আমি ফায়ার আর্মসের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েছি মরে যাবার জন্যে। আমি নিজের বুক লক্ষ্য করে দু-দুবার পিস্তলের গুলি ছুঁড়েছি। তবুও মরিনি। লোকে আমাকে বলে কী জানো দিদি, বলে আমি নাকি খুব বীর। আমি নাকি খুব সাহসী! কিন্তু ওরা তো আসল কথাটা জানে না, ওরা তো জানে না মরার মতো শক্ত কাজ আর নেই। আমি সেই শক্ত কাজটাই করতে পারলুম না। আই ওয়ান্ট টু ডাই দিদি, আই ওয়ান্ট টু ডাই। আমি মরতেই চাই–
দুর্গা বললে–ছি বাবা, ওকথা কি মুখে আনতে আছে? আমাদের হিন্দুঘরে একটা কথা আছে–মরার বাড়া গাল নেই। ওকথা বারবার বোলো না
সাহেব বলতে লাগল ও তুমি বুঝবে না দিদি, মরার মতো সুখ নেই এই ওয়ার্লডে! এখানকার নবাব যেমন বাঁচার জন্যে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, আমি তেমনই মরার জন্যে যুদ্ধ করতে ইন্ডিয়ায় এসেছি কিন্তু মরতে পারলাম কই? কলকাতার ফোর্টে আজ আমাদের যে সব ইউরোপিয়ান দেখলে, ওদের সঙ্গে এইজন্যে আমার বনে না! ওরা তোমাদের ইনসাল্ট করল বলেই সে ইনসাল্ট আমার গায়ে লাগল। আমি তাই এখানে চলে এসেছি! ওরা ইন্ডিয়ানদের হেট করে, ওরা ইন্ডিয়াতে এম্পায়ার তৈরি করতে চায়, কিন্তু আমি ওদের বলে বোঝাতে পারি না যে, বেঙ্গলের নবাব খারাপ হতে পারে, কিন্তু ইন্ডিয়ানরা আমাদের সঙ্গে কী দোষ করেছে? তারা তো কোনও অন্যায় করেনি। তাদের কেন আমরা হেট করব? তাদের কেন আমরা ক্ষতি করব?
নিজের ঘরে যেতেই ছোট বউরানি জিজ্ঞেস করলে–এতক্ষণ কী গল্প করছিলি রে দুর্গা? সাহেবের সঙ্গে এত কী গল্প তোর? হাতিয়াগড়ে ফেরত পাঠিয়ে দেবার কথা কিছু বললে?
