সাহেব বললে–পরে সব পাবে।
কী করে পাব? না পেলে ওঁরা খাবেন কী? আমি তো হুজুর হাতিয়াগড়ে ওঁদের আত্মীয়স্বজনদের খবর দিতে যাব, তখন কে দেখবে ওঁদের?
সাহেব বললে–তা তুমি যাও, আমি ওঁদের সব দেখাশোনার বন্দোবস্ত করব–তোমার কোনও ভাবনা নেই ওঁদের জন্যে
হরিচরণ সেই রাত্রেই হাতিয়াগড় যাবার জন্যে বন্দোবস্ত করছে, এমন সময় দুমদাম করে কামানের গোলা পড়তে লাগল হুগলি ফোর্টের ওপর। একটার পর একটা। সে আর থামে না। হরিচরণ বাইরে এসে দেখে অবাক কাণ্ড। ওলন্দাজদের ওপর কারা গোলা ছুড়ছে! দূর থেকে আগুন দেখা গেল। চুঁচুডোর ঘাট থেকে সোজা দেখা যায় হুগলির কেল্লাটা। হুড়মুড় করে দৌড়োত দৌড়োতে লোকগুলো ছুটে আসতে লাগল চুঁচুড়োর দিকে।
দুর্গা বললে–এ আবার কোথায় নিয়ে এলে আমাদের হরিচরণ, যে-দিকে যাই সেদিকেই যে নবাবের সেপাই, যাই কোথায় আমরা?
জাহাজ থেকে গোরাপল্টনরা নেমে একেবারে বাড়িঘর সব জায়গায় আগুন লাগিয়ে দিলে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে লাগল হুগলি শহরে। একটা আগুনের ফুলকি চুচুড়োতে এসে পড়লেই এখানকার বাড়িঘরও পুড়তে শুরু করবে। দোকান-পাটকেল্লা-শহর-ফৌজদারের দপ্তর সব পুড়ে তখন ছাই হয়ে যাবার জোগাড়। ছোট বউরানির সারারাত ঘুম নেই। দুর্গা কেবল হরিচরণকে ডাকে। বলে–তুমি বাপু একলা আমাদের ফেলে রেখে কোথাও যেয়ো না–এ আমাদের কী বিপদে ফেললে বলো দিকিনি তুমি? কোথায় তোমার সাহেব? সাহেবকে ডাকো দিকিনি একবার আমার কাছে, আমি কথা শুনিয়ে দিচ্ছি ডাকো–আমি এখন মেয়েকে নিয়ে কী করি? ভাল জ্বালা হল দেখছি তোমার কথায় বিশ্বাস করে–
সাহেব এল না, কিন্তু এল আর একজন সাহেব। রবার্ট ক্লাইভ!
একী হরিচরণ, তোমরা এখানে?
স্যার, এই ডাক্তারসাহেব আমাদের এখানে রেখেছেন।
ক্লাইভ বললে–তা তো শুনলাম, কিন্তু ওদের বাড়ি পৌঁছে দিতে পারলে না?
হরিচরণ বললে–যাব কোথা দিয়ে? চারদিকে রাজা মানিকচাঁদ কামান সাজিয়ে রেখেছে যে। আলিগড়ের দিকে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে কামানের শব্দ এল, টানার দিকে গিয়েছিলাম, শুনলাম রাজা মানিকচাঁদ ওত পেতে আছে ওখানে। হাতিয়াগড়ের দিকে যাবার চেষ্টা করলাম সে-পথও বন্ধ। কেষ্টনগরের দিকে যাচ্ছিলাম ওদের রাখতে, সেদিকেও শুনলাম চূর্ণি নদীর মোহনায় কামান সাজানো। হাঁটা-পথে যাওয়ার চেষ্টা করিনি হুজুর, তাতে মেয়েছেলে নিয়ে আরও বিপদ
তা এখন কী করবে ওদের নিয়ে? কলকাতায় যাবে? কলকাতার কেল্লা তো আমরা নিয়ে নিয়েছি।
হরিচরণ বললে–ওদের জিজ্ঞেস করে দেখি তা হলে!
ততক্ষণে হুগলির ওদিকের আকাশটা ধোঁয়ায় ধোঁয়া হয়ে গেছে। রাজা মানিকচাঁদের সেপাইরা দলে ছিল দু’হাজার জন। তারা তখন কেল্লা ফেলে পালাচ্ছে। ক্লাইভ তাদের পেছনে গোরা পল্টনদের লেলিয়ে দিয়ে ফোর্থ সাহেবের কাছে চলে এসেছিল। সেখানে এসেই এদের খবরটা শুনতে পেয়েছে।
ফোর্থ সাহেব জিজ্ঞেস করেছিল–হু আর দোজ লেডিজ? তুমি চেনো নাকি ওদের?
ক্লাইভ সেকথার উত্তর না দিয়ে সোজা এখানে চলে এসেছিল। শেষকালে এত জায়গা থাকতে ওদের এখানে নিয়ে এসেছে হরিচরণ!
*
বজবজ জয় হয়েছে, টানা জয় হয়েছে, মেটিয়াবুরুজ জয় হয়েছে, কলকাতা জয় হয়েছে, শেষকালে এই হুগলি ফোর্ট! এখনও তার জয়ের অনেক বাকি আছে যে। কোম্পানির ইনসাল্টের প্রতিশোধ নিতে হবে যে! লেফটেনান্ট কর্নেল ক্লাইভকে ইংলন্ড যে অপমান করেছে, তারও যে প্রতিশোধ নিতে হবে! তার নিজের ওপরেও যে প্রতিশোধ নিতে হবে কর্নেল ক্লাইভকে। যে-পৃথিবী সম্মান দেয় অন্যায়কে, যে পৃথিবী শ্রদ্ধা করে ডিসঅনেস্টিকে, যে-পৃথিবী মিথ্যেকে মর্যাদা দেয়, সে-পৃথিবীর ওপরেও যে প্রতিশোধ নিতে হবে! যে বাপ-মা তাকে সংসারে নিয়ে এসে তাচ্ছিল্য আর অবহেলা দিয়ে তার অভ্যর্থনা করেছে, তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়াও যে বাকি আছে এখনও। ওরা ভাবে, ওই অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, ক্যাপ্টেন কুট, মেজর কিলপ্যাট্রিক, গভর্নর হলওয়েল, ড্রেক, সবাই ভাবে ক্লাইভ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি করে বলেই বুঝি এত প্রাণ দিয়ে লড়ছে। চাকরি না করলেও যে লড়ত এটা তারা জানে না। তারা একথা কল্পনাও করতে পারে না। তারা জানে না ইংলন্ডকে আর ক্লাইভ তার বার্থপ্লেস বলে মনে করে না। এই ইন্ডিয়াই তার দেশ, এই বেঙ্গলই তার মাতৃভূমি। এখানকার লোকদের সে নিজের লোক বলে মনে করে ফেলেছে।
তা ক’দিন আর লাগল হুগলি জয় করতে। ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি। নদিন। নদিনেই হুগলি শহর পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। হুগলি থেকে ব্যান্ডেল পর্যন্ত একখানা বাড়ি একখানা খামারও আস্ত রইল না।
সেদিন ক্লাইভ জাহাজ নিয়ে আবার কলকাতার কেল্লায় ফিরে এল, দু’জন লেডিকে সঙ্গে দেখে সেদিন সবাই অবাক হয়ে গেছে।
হলওয়েল, ড্রেক, ওয়াটসন সবাই তাজ্জব হয়ে গেছে দেখে। রবার্ট কি নেটিভ মেয়ের সঙ্গে লাভে পড়ল নাকি! স্ট্রেঞ্জ!
ওয়াটসন জিজ্ঞেস করলে–তুমি কি ওই নেটিভ গার্লদের ফোর্টের মধ্যে রাখবে নাকি?
ক্লাইভ বলে–যদি রাখি সে আমার খুশি, তোমার অর্ডার মানব এমন লোক পাওনি আমাকে।
জানো, এখানে ইংলিশ লেডিরা রয়েছে, এর ভেতরে তোমার নেটিভ মিস্ট্রেসদের রাখতে দেব না, দ্যাটস মাই কমান্ড
ক্লাইভের রক্ত গরম হয়ে উঠেছিল। একটা ঘুষি উঁচিয়ে ওয়াটসনের মুখের ওপর মারতে যাচ্ছিল–স্টপ দ্যাট ননসেন্স, আর একবার ওই কথা উচ্চারণ করলে আমি তোমার মুখ ভেঙে ক্রাশ করে দেব!
