দুর্গা বললে–তা হলে এক কাজ করো না বাবা, আমাদের হাতিয়াগড়ের দিকে পৌঁছিয়ে দাও না, ঘরের লোক ঘরে ফিরে যাই, বাবা বিশ্বনাথ আমাদের মাথায় থাকুন
তবে তাই চলি।
শ্রীনাথ বইঠা ধরে ছিল। হরিচরণ শ্রীনাথকে গিয়ে সেই কথাই বললে। বজরা আবার হাতিয়াগড়ের দিকেই ফিরে চলল। শ্রীনাথের সব রাস্তাই চেনা। ছোটমশাইকে নিয়ে বহুদিন এই বজরার বইঠা বেয়েছে। সকালবেলা বজরার জানালাটা দিয়ে সূর্য উঠতে দেখা যায়, আবার সন্ধ্যাবেলা এ-পাশের জানালাটা দিয়ে সেই সূর্যটাকেই ডুবতে দেখা যায়।
ছোট বউরানি বলে–আর কতদিন এইরকম কাটবে রে দুগ্যা?
দুর্গা বলে–পাঁজি পুঁথি দেখে না বেরুলে এই হয় গো, তোমার বড় বউরানির যা মেজাজ, হুকুম করলে তো আর কারু না’ বলবার সাধ্যি নেই
হঠাৎ আবার হরিচরণের মতিগতি বদলে যায়। বলে–না দিদি, আর হাতিয়াগড়ের দিকে যাওয়া হবে না
দুর্গা জিজ্ঞেস করে কেন?
শুনলাম ওলন্দাজরা ওদিকে নৌকোর ওপর কামান সাজিয়ে বসে আছে, নদীতে নৌকো দেখলেই গোলা ছুড়বে
দুর্গা বললে–তা হলে কী করবে হরিচরণ?
হরিচরণ বললে–কী করব এখন তাই বলো? অন্য কোথাও যাবে তো চলো
দুর্গা বললে–তা হলে কেষ্টনগরে নিয়ে যেতে পারো?
তা কেষ্টনগরেই যাচ্ছি! বলে হরিচরণ শ্রীনাথকে নৌকোর মুখ ঘোরাতে বললে।
ছোট বউরানি বললে–দুগ্যা, তুই উচাটন করতে পারিসনে? এত লম্বা-চওড়া কথা বলিস, ওদের উচাটন করে দে না
কাকে?
কেন, নবাবকে!
দুর্গা বললে–শেষপর্যন্ত তাই-ই করতে হবে দেখছি। কিন্তু বজরায় বসে তো আর উচাটন হয় না। ঘোড়ার খুরই বা কোথায় পাব আর পারাভস্মই বা কোথায় পাব? একবার ড্যাঙায় নানামলে তো আর তা হচ্ছে না।
বউরানি বললে–এই ফিরিঙ্গি সাহেবটা খুব ভালমানুষ, না দুগ্যা? আমি তো ভয় পেয়েছিলাম প্রথমে, কিন্তু ম্লেচ্ছ হোক আর যাই হোক বাপু, বড় মিষ্টি কথা ফিরিঙ্গিটার–
দুর্গা বললে–আমি তো তাই গড় হয়ে পেন্নাম করে এলাম আসবার সময়,
হরিচরণ আবার সেদিন বাইরে এসে ডাকলে–দিদি
কী হরিচরণ?
হরিচরণ ভেতরে এসে বললে–কেষ্টনগরের দিকে যাওয়া যাবে না দিদি। চূর্ণি নদীর মোহনায় ফরাসিরা নৌকোর মহড়া দিচ্ছে–নদীর দিকে কামান সাজিয়ে বসে আছে গোরা পল্টনরা।
কেন?
ইংরেজ ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে যে ফরাসি ফিরিঙ্গিদের লড়াই বেধেছে গো।
দুর্গা বললে–তা বাছা, সবাই কি লড়াই করে করেই মরবে! ফিরিঙ্গিরা নিজেদের মধ্যে লড়াই। ক্রছে, নবাবের সঙ্গেও লড়াই করছে, হলটা কী? আমরা সাতজন্মে তো এত লড়াই দেখিনি কখনও। আমাদের সময় বর্গিরা আসত, আবার লুটপাট করে চলে যেত, এমন নাগাড়ে লড়াই চলত না তো তখন! তা তুমি বাপু কাছাকাছি কোথাও নিয়ে চলো, বজরার দুলুনি আর সহ্য হচ্ছে না আমার মেয়ের যেখানে পারো আমাদের নামিয়ে দাও, ডাঙায় পা রেখে বাঁচি
শেষকালে একদিন হরিচরণ বললে–চলো দিদি, এবার একটা ভাল জায়গা পেইছি
কোথায় গো? কোথায় ভাল জায়গা? নাম কী জায়গার?
হুগলি!
হুগলি? এখানে আবার ভাল জায়গা কোথায় আছে? তোমার জ্ঞাতিগুষ্ঠি কেউ আছে নাকি?
হরিচরণ বললে–না, জ্ঞাতিগুষ্ঠি আমি কোথায় পাব দিদি? এখানে একজন সজ্জন সাহেব আছে দিদি, বড় ভালমানুষ। কাশিমবাজার কুঠির ডাক্তারসাহেব এখানে এই চুঁচুড়োয় পালিয়ে এসে আছেন। নবাবের ভয়ে এখানে রয়েছেন। আমার চেনা সাহেব দিদি। তোমাদের বিপদের কথা সাহেবকে বললুম কিনা
দুর্গা বললে–ওমা, জানাশুনো নেই কিছু না, অমনি তার বাড়িতে গিয়ে উঠব?
তার বাড়িতে তো উঠছ না তোমরা, তার আলাদা একটা বাড়ি খালি পড়ে আছে, সেখানে গিয়ে উঠবে! তারপর তোমাদের সেখানে নামিয়ে দিয়ে আমি হাতিয়াগড়ে গিয়ে খবর দিয়ে আসব, তখন চলে যেয়ো, দুটো তো মাত্তর দিন! থাকতে পারবে না তোমরা? আর এ তো নবাবের এলাকাও নয়, ওলন্দাজদের জমিদারির মধ্যে পড়ল চুঁচুড়ো, ভয়টা কী তোমাদের?
তা অগত্যা তাই-ই সাব্যস্ত হল। সার্জন ডাক্তার উইলিয়ম ফোর্থ। বেশ পাকা দেয়াল বাড়িটার। কিন্তু খড়ের চাল। চারদিকে বাগান। বাগানে বেশ বড় বড় গাছ। ফোর্থ সাহেব কোম্পানির ডাক্তার হয়ে এসেছিলেন। কাশিমবাজার কুঠি ভেঙে দেবার পর এই চুঁচুডোর ডাচদের এলাকায় এসে লুকিয়ে আছেন। হরিচরণকে চুঁচুড়োর ঘাটে দেখে সাহেব জিজ্ঞেস করেছিলেন–তুমি হরিচরণ? এখানে কেন? বোটের ভেতর কে?
হরিচরণ বলেছিল–আজ্ঞে, আমাকে কর্নেল ক্লাইভ দু’জন মেয়েমানুষকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছিয়ে দিতে হুকুম দিয়েছেন
কোন মেয়েমানুষ? কাদের লোক? ইউরোপিয়ান? ইংলিশ লেডি?
না হুজুর, হিন্দুর মেয়ে। নবাবের ফৌজের ভয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি ওঁদের নিয়ে। হাতিয়াগড়ে যাবার উপায়ও নেই, কেষ্টনগরে যাবারও উপায় নেই, ক’দিন ধরে জলে জলে ঘুরে বেড়াচ্ছি, খাওয়াদাওয়া মাথায় উঠেছে, উপোস করছি সবাই মিলে।
বেশ ফাঁকা বাড়িটা। বাইরে থেকে দেখা যায় না। মেয়েদের ভেতরে উঠিয়ে দিয়ে তাদের রান্না-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়ে হরিচরণ সাহেবের ঘরে এল।
সাহেব জিজ্ঞেস করলে–ওদের কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?
হরিচরণ বললে–বাজারে কোনও জিনিসই পাওয়া যাচ্ছে না, ফিরিঙ্গিদের কেউ জিনিসপত্তর বেচতে চাইছে না, সবাই পালিয়ে যাচ্ছে। বলছে, রাজা মানিকচাঁদ নাকি হুকুম দিয়ে গেছে ফিরিঙ্গিদের কেউ চাল ডাল বেচবে না। আমি হিন্দু বলে কিছু কিনে এনেছি, কিন্তু পরে কী হবে?
