মরিয়ম বেগম, মরিয়ম বেগম!
বাইরের ডাকে যেন হঠাৎ কান্তর সংবিৎ ফিরে এল। কে যেন দরজা ঠেলছে আর ডাকছে–মরিয়ম বেগম, মরিয়ম বেগম—
*
জেনারেল ক্লাইভ ডাকলে—মুনশি–
মুনশিকে সঙ্গেই এনেছিল ক্লাইভ সাহেব। টিকি দোলাতে দোলাতে মুনশি নবকৃষ্ণ সামনে এসে হাজির।
হুজুর!
বশির দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল একপাশে। মনসুর আলি মেহেরও দাঁড়িয়ে ছিল। মিরজাফর খাঁ দাঁড়িয়ে ছিল। জামাই মিরকাশিম খাঁ-ও দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলে মিরন দাঁড়িয়ে ছিল। নিজামত সরকারের আমলা-ওমরাহ সবাই হাজির। সারা মুর্শিদাবাদের নোক আজ শহর-গ্রাম-জনপদ ঝেটিয়ে এসে মুর্শিদাবাদের নবাবের আম-দরবারে হাজির। সবাই ভেতরে ঢুকতে পারেনি। সবাইকে চুকতে দেওয়া হয়ওনি। এত মানুষ দেখে কর্নেল সাহেবের লাল চোখ-মুখ আরও লাল হয়ে গেছে। সকাল থেকেই করোরিয়ান, চৌধুরীয়ান, জমিদারানরা হাজির ছিল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র গোড়া থেকেই সামনে ছিলেন। যা-কিছু নবাবের মালখানার সিন্দুক থেকে পাওয়া গিয়েছে সব জড়ো করে তুলে নিয়েছে ক্লাইভ সাহেব। এত মোহর, এত টাকা, এত হিরে, এত চুনি, এত পান্না, এত কিছু জীবনে দেখেনি সাহেব। প্রথমে সিন্দুকটা খুলতেই চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল সাহেবের। মুনশি নবকৃষ্ণ পাশেই ছিল। তারও চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। শায়েস্তা খাঁ শুধু নয়। বখতিয়ার খিলিজির আমল থেকেই এই টাকা জমে জমে পাহাড় হয়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদের খাজাঞ্চিখানায়। মুর্শিদকুলি খাঁ’র সময় থেকেই আরও পাকাপাকি রকমের জমা বন্দোবস্ত হতে শুরু করেছিল। তার বন্দোবস্তের নাম ছিল জমা কাসেল তুমারি। সারা বাংলাদেশের টাকা এসে ঢুকত এইসব সিন্দুকে। এসে পুরুষানুক্রমে জমা হয়েছে এখানে। সে-টাকা দেখে চোখ ঘুরে যাবার মতো অবস্থা হল কর্নেলের।
মুনশি নবকৃষ্ণ বললে–এ-সব আপনার হুজুর–আপনি নিন—
কর্নেল সাহেব যা নিলে তা নিলে। তারপর নিলে মুনশি।
আমি যে সঙ্গে কিছু বাক্সটাক্স আনিনি।
আমি সিন্দুকসুষ্ঠু আপনাকে দেব, আপনার নিতে কোনও অসুবিধে হবে না–একেবারে জাহাজে তুলে সুতানুটিতে পাঠিয়ে দেব আপনার হাবেলিতে–
মাসিক সাত টাকা মাইনের চাকরিতে ঢুকে এখানে এসেছিল ক্লাইভ সাহেব। সঙ্গে সঙ্গে রাজত্ব পাওয়া হয়ে গেল। কিন্তু শুধু রাজত্ব তো দেওয়া যায় না। রাজকন্যা দেওয়ারও নিয়ম আছে এ-দেশে। মিরজাফর খাঁ তাও দিলেন। রাজকন্যা নয়, নবাব-বেগম।
ক্লাইভ মুশকিলে পড়লে। বললে–এদের নিয়ে আমি কী করব?
হুজুর, এইটেই যে কানুন। নবাবের যা কিছু আছে সবই আপনার। নবাবের টাকা আপনাকে দিয়েছি, নবাবের এই বেগমদেরও আপনাকে নিতে হবে–
বলে ডাক পাড়ল–নুর বেগম–
সমস্ত বন্দোবস্ত আগে থেকেই করা ছিল। হারেমের খোঁজা-সর্দার পিরালিকে আগে থেকেই হুকুম দেওয়া ছিল। সমস্ত বেগমরা সকাল থেকেই সাজতে গুজতে শুরু করেছে। চোখে সুরমা দিয়েছে, বুকে বুটিদার কঁচুলি পরেছে, ঠোঁটে আলতা মেখেছে, নখে মেহেদি রং লাগিয়েছে; ঘাগরা, চোলি, ওড়নি কিছুই বাদ যায়নি। আজ সবাই হারেম ছেড়ে আর-এক হারেমে গিয়ে উঠবে। এতদিন যাকে মনোরঞ্জন করবার জন্যে তারা জন্মেছিল, সে নেই। এবার অন্য একজনের মনোরঞ্জন করবার জন্যে আবার বেঁচে থাকতে হবে। আবার বিকেল থেকে প্রতিদিন আর একজনের মন ভোলাবার জন্যে তৈরি হতে হবে। সে দিশি নবাব নয়, সে সাহেব। লাল পল্টনদের গোরা সাহেব। লক্কাবাগের লড়াইতে যে-সাহেব নবাবকে হারিয়ে দিয়েছে।
জিন্নৎ বেগম!
আজ আর কারও কোনও অভিযোগ নেই। অবশ্য অভিযোগ ছিলও না কোনওদিন। নবাব হারেমে কোনও অভিযোগ থাকতে নেই কারও। খেতে পরতে পেরেছে একদিন, আবার এবার যেখানে যাবে সেখানেও তারা খেতে পরতে দেবে। আমরা জারিয়া। মানে ক্রীতদাসী। আমাদের আবার জাতকুল কী, আমাদের আবার মান-সম্মান বা কী।
তক্কি বেগম।
এক-একজনের নাম ডাকা হয় আর সে ওড়নি ঢাকা দিয়ে মাথা নিচু করে এসে দাঁড়ায়। একজনের পর আর একজন। তারপর আর একজন। আম-দরবারের শোভা যেন আজ হাজার গুণ বেড়ে গেছে রূপসিদের জেল্লার জৌলুসে! রসুননচৌকিতে এতক্ষণ মিঞা-কী মল্লার বাজাচ্ছিল নবাব নিজামতের বহুদিনের মাইনে-করা পুরনো নহবতি বুড়ো ইনসাফ মিঞা। সে এ-রাগ বহুবার আগে বাজিয়েছে। বুড়ো নবাবসাহেব যেবার কাটোয়াতে বর্গিসর্দার ভাস্কর পণ্ডিতকে খুন করে রাজধানীতে ফিরে এসেছিলেন, সেবারও ইনসাফ মিঞা এই মিঞা-কি-মল্লারই বাজিয়েছিল। যেবার বুড়ো নবাবের নাতি মির্জা মহম্মদের বিয়ে হল সেবারও একবার বাজিয়েছিল এই মিঞা-কি-মল্লার। বড় কড়া রাগ। তানসেনজির নিজের মেজাজের তৈরি জিনিস। তানসেনজি বাদশা আকবর শাহকে এই মিঞা-কি-মল্লার পেশ করেছিলেন। এ-রাগ যখন-তখন যাকে-তাকে শোনানো যায় না।
তাড়াতাড়ি বশির মিঞা দৌড়ে এসেছে রসুনচৌকির ওপরে।
এ কী বাজাচ্ছ মিঞাসায়েব?
কেন জনাব, এ তো মিঞা-কি-মল্লার!
না না, গোরা সাহেবরা ওসব বুঝতে পারবে না। নবাবসাহেব গোসা করছেন—
নবাব? কোন নবাব?
নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা যে নেই তা যেন জানে না ইনসাফ মিঞা। তা যেন শোনেইনি সে। বচপন থেকে মির্জাকে দেখে এসেছে ইনসাফ মিঞা। মির্জা মহম্মদ সেই ছোটবেলাতেই এই নহবতখানায় উঠে এসে বাঁশির ফুটোতে ফুঁ দিতে চেষ্টা করত কতবার। কতবার ইনসাফের চোখের আড়াল থেকে বাঁশি চুরি করে পালিয়েছে। সেই মির্জা মহম্মদই বড় হয়ে তোমাদের সিরাজ-উ-দ্দৌলা হল। তোমরা তার জন্যে না-কাঁদতে পারো, কিন্তু আমি কী করে কান্না থামাই? আমার কি মন কেমনও করতে নেই?
