কে?
হঠাৎ রাস্তায় চলতে চলতে পায়ে একটা ধাক্কা লাগতেই কান্ত চমকে উঠেছে–কে!
এমন শীতের রাত্রে এরকম করে যে রাস্তায় মানুষ শুয়ে থাকবে তা যেন ভাবতেই পারা যায় না। অন্যমনস্ক অবস্থায় চলতে গিয়ে লোকটার পায়ে ধাক্কা লেগে গিয়েছে।
কে তুমি?
মাথা নিচু করে দেখতে গিয়ে কেমন সন্দেহ হল। ঠিক যেন চেনা চেনা চেহারা।
উদ্ধব দাস!
তাড়াতাড়ি ভাল করে মুখটা দেখেই আবার মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। মদের গন্ধে যেন কান্তর বমি এসে গেল। আশ্চর্য, লোকটা মদ খেয়ে রাস্তার ওপরেই শুয়ে পড়ে আছে। খেয়ালও নেই কিছু যদি পালকি-বেহারারা যেতে গিয়ে পায়ে হোঁচট লাগে। যদি নবাবের হাতির দল চলতে চলতে লোকটাকে চাপা দিয়ে পিষে দেয়।
লোকটাকে দুহাতে ধরে রাস্তার একধারে শুইয়ে দিল কান্ত। তবু লোকটার সাড় নেই। তারপর আবার চকবাজারের পথ ধরে চলতে লাগল।
তারপর সারাফত আলির দোকানের কাছে এসে পেছন দিকে গিয়ে ডাকলে-বাদশা, ও বাদশা
বাদশা তখনও ওঠেনি। বাদশা দেরি করে ওঠে ঘুম থেকে। সারাফত আলি ওঠে আরও দেরি করে।
বাদশা, ও বাদশা, আমি কান্তবাবু
অনেকবার ডাকতে তবে বাদশার ঘুম ভাঙল। ঘুমচোখে দরজা খুলে দিয়ে বললে–এত দেরি হল বাবুজি? আপনাকে যে একজন তালাশ করতে এসেছিল
কে? কে তালাশ করতে এসেছিল?
একটা তাঞ্জামে করে সফিউল্লা খাঁ সাহেব এসেছিল চেহেল্-সুতুন থেকে।
তুমি কী বললে? বা
দশার তখন ঘুমের ঘোর কেটে গেছে। বললে–আসলে সফিউল্লা খাঁ সাহেবনয় বাবুজি, মরিয়ম বেগম।
তারপর?
তারপর আসলি সফিউল্লা খাঁ সাহেব মরিয়ম বেগমকে ধরে নিয়ে গেল হুজুর মতিঝিলে।
তারপর সেখানে গিয়ে কী হয়েছে, তার কিছু শুনেছ?
না বাবুজি, আর কিছু শুনিনি!
ভালই হয়েছে। সফিউল্লা সাহেবের খুন হয়ে যাওয়ার খবরটা এখনও শোনেনি তা হলে বাদশা। না শুনেছে ভালই হয়েছে। বাদশা আবার ঘুমোতে গেল। কান্তও নিজের ঘরের ভেতর ঢুকল। ছি ছি, মাতাল লোকটাকে কিনা উদ্ধব দাস বলে ভুল করেছিল সে। উদ্ধব দাস কেন মদ খেতে যাবে আর মদ খেয়ে ওরকম’রাস্তাতেই বা শুয়ে থাকবে কেন?
শুতে গিয়েও কান্ত কিন্তু শুতে পারল না। পাশেই সারাফত আলির ঘর। সেই একখানা ঘরেই সারাফত আলি ঘুমোয়, বসে, যা কিছু করে। একটা মাত্র দেয়ালের ফারাক। ভাবনাটা আসতেই সমস্ত ঘুম মাথায় উঠে গেল কান্তর। সারাফত আলির তো অনেক টাকা। অনেক মোহর, অনেক আসরফি! চাইলে এক হাজার আসরফি দেয় না! কিন্তু যদি না দেয়। সারাফত আলির সমস্ত টাকাকড়ি যা কিছু একটা সিন্দুকের ভেতর থাকে। আধখানা মাটিতে পোঁতা। অত টাকা মিঞাসাহেবের কী হবে! যদি কান্ত। মোহরগুলো সিন্দুক ভেঙে নিয়ে নেয়। বুড়ো জানতে পারবে? বুড়ো সন্দেহ করবে? কিন্তু সাফত আলি সন্দেহ করলেই বা, জানতে পারলেই বা। মরালী তো ছাড়া পাবে! মরালীকে তো ছেড়ে দেবে সদরস সুদুর। বুড়োর টাকা খাবার তো কেউ নেই। তবু টাকাটা সদ্ব্যয় হবে। এক হাজার আরফি নিলে বুড়োর আর কীসের ক্ষতি!
ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে এল। সারাফত আলির নাক-ডাকা তখন থেমে গিয়েছে। এইবার বোধহয় উঠবে মিঞাসাহেব। দিনেরবেলা সিন্দুকটা ভাল করে দেখে নেবে কান্ত, তারপর সন্ধেবেলা যখন আগরবাতি জ্বেলে দিয়ে বুড়ো আফিং খেয়ে তামাক টানতে শুরু করবে তখন নেশার বেঁকে কিছুই বুঝতে পারবে না মিঞাসাহেব। নেশার মৌতাতে তখন মশগুল হয়ে থাকবে। তখনই সিন্দুক ভাঙা ভাল।
কথাটা ভেবে যেন নিশ্চিন্ত হল কান্ত। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল।
*
হুগলি তখন পুড়ছে। রবার্ট ক্লাইভের একদিন ঘুম ছিল না। সেন্ট কোর্ট ডেভিডের কম্যান্ডর বেঙ্গলে এসেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অপমানের প্রতিশোধ নিতে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রতিশোধ বড় কঠিন প্রতিশোধ। এক একটা ফোর্ট দখল করেছে আর্মি আর প্রতিশোধের নেশা যেন বেড়ে গেছে রবার্ট ক্লাইভের। এমন করে ভাগ্য উলটে যাবে নিজামতি ফৌজের এ যেন রাজা মানিকচাঁদ ভাবতেই পারেনি। নবাব মির্জা মহম্মদও।
কিন্তু রাজা মানিকচাঁদ তো জানত না কাকে বলে অপমান। অপমান যে নিজে না পেয়েছে, সে অপমানের প্রতিশোধ নিতেও জানে না। রাজা মানিকচাঁদ জানত না অপমান শুধু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরই নয়, অপমান কর্নেল ক্লাইভের নিজেরও। নবাবের ফৌজকে হারিয়ে ক্লাইভ যেন নিজেরই অপমানের প্রতিশোধ নিচ্ছে। তোমরা আমাকে রেসপেক্ট দাওনি, তোমরা আমাকে দেশছাড়া করেছ, তোমরা আমাকে কিক করে তাড়িয়ে দিয়েছ এখানে। আমি তাই এসেছি তোমাদের অপমানের প্রতিশোধ নেব বলে। এই তোমরা, যারা আমার স্বজাত, যারা আমার স্বধর্মী! তোমরা দূর থেকে দেখো কাকে তোমরা মাতৃভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছ, সে একটার পর একটা লড়াইতে জিতে তোমাদের মুখে কালি লেপে দিচ্ছে।
হরিচরণ বড় মুশকিলে পড়েছিল। কোথায় কোম্পানির চাকরি নিয়ে পল্টনের দলে কাজ করবে না, এই এদের নিয়ে হুগলিতে এসে উঠেছিল।
বজরার মধ্যে দু’জন চুপ করে বসে ছিল।
হরিচরণ বাইরে থেকে ডাকলে–দিদি
কে? হরিচরণ? এসো—
হরিচরণ আসতেই দুর্গা জিজ্ঞেস করলে–কী বাবা; কিছু হদিস পেলে?
হরিচরণ বললে–বড় যে ভয় করছে দিদি, কেউ বলছে নবাব আলিগড়ের দিকে আসছে, কেউ বলছে পূর্ণিয়ার দিকে গেছে। কিছু তো টের পাচ্ছিনে। বুঝতে পাচ্ছিনে কী করব!
