সম্মান যারা নিতে জানে, সম্মান তারা দিতেও জানে। সম্মান দিলে তবে সম্মান নেবার অধিকার জন্মায়। তুমি আমাকে মনে মনে গালাগালি দিয়েছ তোমাকে মর্যাদা দিইনি বলে! কিন্তু আমাকে কে সম্মান দিয়েছে? আমাকে কে মর্যাদা দিয়েছে? আমি তো তোমাদের শত্রুতা আর ঘৃণার ওপর দাঁড়িয়ে তোমাদের কাছ থেকে নিজের সম্মান আদায় করে নিয়েছি। কই, আমি তো সেজন্য তোমাদের কাউকে আঘাত দিইনি। কাউকে অপমানও করিনি। হোসেন কুলি খাঁ-কে আমি খুন করেছি স্বীকার করছি, কিন্তু সে তো আমাকে অপমান করেছে বলে নয়। সে তো হাজি-মহম্মদের বংশে কলঙ্ক দিয়েছিল বলে। কিন্তু তার আগে তো আমি নানিবেগমের মত চেয়ে নিয়েছি, নানানবাবের সমর্থন চেয়ে নিয়েছি! আর ঘসেটি? আমার শৈশব থেকে যে আমার শত্রুতা করেছে, যে আমার মৃত্যু কামনা করে আসছে, তাকেও আমাকে ক্ষমা করতে বলো? রাজা মানিকচাঁদের কথা বলছ তোমরা। কিন্তু রাজা মানিকচাঁদ কি বিপদের দিনে তোমাদের মতো আমার পাশ থেকে কখনও সরে দাঁড়িয়েছে?
আমি আজ আপনার ওপর খুব খুশি জাফর আলি খাঁ!
মিরজাফর আলি তখনও চুপ করে ছিল। একটু পরে বললে–আমি এখানে আসবার আগে নানিবেগমের কাছে প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলাম–
আপনি আপনার প্রতিজ্ঞা রেখেছেন দেখে আমি খুব খুশি জাফর আলি খাঁ।
আমি আপনার বান্দা, নবাব!
মিরজাফর আলি কি মির্জা মহম্মদকে না দিয়ে ছাড়বে না নাকি!
মিরজাফর আবার বললে–আমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম যে, শওকত জঙকে লেখা চিঠি বলে যেটা আপনি দেখেছেন, সেটা জাল!
নবাব বললেন–এখন আমার বিশ্বাস হল জাফর আলি, সত্যিই জাল–
রাত বোধহয় তখন ভোর হয়ে আসছে। ওপারে নবাবগঞ্জ আর মনিহারি, আর এপারে বলডিয়াবাড়ি। মাঝখানে শুধু একটা বিল। ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে যেন রাত্রের সমস্ত কদর্যতা চোখের ওপর স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল।
বেগমরা কোথায়?
রাজা মোহনলাল বললে–সবাইকে সৈয়দ আহম্মদ সাহেবের হাবেলিতে নজরবন্দি করে রেখেছি জাঁহাপনা
নবাব বললেন–ওদের সম্পত্তি যা কিছু আছে, যারা মুর্শিদাবাদে যেতে চায়, সকলকে মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দাও–কাউকে যেন কোনও অসম্মান করা না হয়, দেখো তুমি
আর শওকত জঙ সাহেব?
তাকে কবর দেবে। সে তো এখন সম্মান-অসম্মানের বাইরে চলে গেছে।
নিজের শিবিরের কাছে এসে হাতিটা থামল।
জাঁহাপনা, রাজা মানিকচাঁদের চিঠি নিয়ে এসেছে আলিনগরের উজিরের লোক।
কীসের চিঠি?
সেই হাতির পিঠে বসেই চিঠিটা হাতে নিলেন নবাব। জরুরি চিঠি। তাড়াতাড়ি লেফাফা খুলে পড়তে লাগলেন–
রাজা মানিকচাঁদ লিখেছে
…ফিরিঙ্গিরা দলবল লইয়া ফিরিয়া আসিয়া আমাদিগের বজবজের কেল্লা অধিকার করিয়া ফেলিয়াছে। আরও দুঃসংবাদ এই যে, বজবজ কেল্লা অধিকার করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই। তাহাদের আক্রমণে আমাদের সৈন্যদল টানা দুর্গমধ্যে চল্লিশটি কামান ফেলিয়া রাখিয়া পলায়ন করিয়াছিল, সে । দুর্গও ফিরিঙ্গিরা ১ জানুয়ারি তারিখে অধিকার করিয়া ফেলিয়াছে। ২ জানুয়ারি তারিখে রবার্ট ক্লাইভ সাহেব সহসা কলিকাতা-দুর্গ অতর্কিতে আক্রমণ করাতে আমি সৈন্যদল সমেত কলিকাতা-দুর্গ পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া আসিয়াছি। ইহার পর কী ঘটিয়াছে জানি না। শুনিয়াছি তাহারা হুগলি-দুর্গ আক্রমণ করিয়াছে। দুর্গ ও ফৌজদারি সম্পত্তি এবং হুগলি নগর লুণ্ঠন করিয়া তাহারা সরকারি গোলাবাড়ি আদি আক্রমণ করিতেছে। আমি আজই মুর্শিদাবাদ যাত্রা করিতেছি, সাক্ষাতে সমুদয় সংবাদ বলিব। ভবদীয় বশংবদ
রাজা মোহনলাল পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। নবাব তারই হাতে চিঠিটা দিলেন। তারপর হুকুম দিলেন–সোজা মুর্শিদাবাদ চলো, মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা, তারপর দরকার হলে কলকাতা থেকে সোজা হুগলি!
সে হুকুম শুনল মোহনলাল। শুনল মিরজাফর আলি খাঁ, শুনল দোস্ত মহম্মদ খাঁ, মিরকাজেম খাঁ, দিলির খাঁ, আসালৎ খাঁ, সবাই।
আর ইতিহাস সেই মুহূর্তে আবার আর একদিকে মোড় ঘুরল।
.
তখন বেশ ভোর হয়েছে। চকবাজারের রাস্তায় তখন কান্তর পা দুটো যেন আর চলতে চাইছে না। কোথায় কার কাছে যে সান্ত্বনা চাইবে, কার কাছে যে পরামর্শ চাইবে, তারও যেন কোনও হদিশ নেই। ছোটবেলা থেকে একলাই সে বড় হয়েছে, একলাই নিজের অন্নসংস্থান করে নিয়েছে, তবু কখনও তার যেন নিজেকে এত নিঃসঙ্গ নিঃসহায় মনে হয়নি।
আকাশের দিকে একবার চোখ তুলে চাইল কান্ত।
যার কেউ নেই, তার হয়তো এই আকাশ আছে, এই সসাগরা পৃথিবী আছে, অন্তত এই নিঃসঙ্গ নির্জীব রাত্রিটা আছে। হে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের দেবতা, হে অনন্ত-অনাদি-অদৃষ্ট সৃষ্টিকর্তা, তোমার কাছে কোনওদিন কিছু অঞ্জলি পেতে আমি চাইনি। তোমার কাছে নিজের জন্যে কোনওদিন কিছু প্রার্থনা করবার প্রয়োজন আমার হয়নি। কিন্তু আজ চাইছি। আজ আমাকে তুমি ভিক্ষা দাও। আজ তুমি এমন কিছু আমাকে দাও যা দিয়ে আমি আর একজনের শৃঙ্খল মোচন করতে পারি। সে কিছু অপরাধ করেনি। আমি শপথ করে বলতে পারি, তার কোনও অপরাধ নেই। সে নিষ্পাপ। সে আর একজনের ক্ষতি নিবারণ করবার জন্যে নিজে এই পাপ মাথায় তুলে নিয়েছে। আর আমি তার এই পাপের সাহায্য করেছি তাকে এখানে এনে এই চেহেল্-সুতুনে তুলে দিয়ে। আমারই সব পাপ ভগবান, আমারই সব অপরাধ। আমিই দোষী, আমিই অপরাধী! তুমি তার ওপর প্রসন্ন হও ঈশ্বর! তোমার প্রসন্নতা আমার চিরন্তন অন্তরের সম্পদ হয়ে আমার অনন্তজীবনের সম্বল হোক!
