হঠাৎ মনে হল কে যেন ঘরে ঢুকেছে।
কে?
নবাব মির্জা মহম্মদ উঠে বসলেন। আবার জিজ্ঞেস করলেন–কৌন হ্যায়?
আমি মিরজাফর!
এত রাত্রে তুমি? লড়াইয়ের কী খবর?
খবর ভাল নয়। এ-লড়াইয়ের খবর ভাল হতে পারে না।
কেন? ওকথা বলছ কেন?
ভাল খবর কী করে তুমি আশা করো?
নবাব মির্জা মহম্মদ যেন চমকে উঠলেন। তবু নিজের মনের ভাব নিজের মনেই চেপে রাখলেন।
বললেন–তুমি আছ, তবু কেন খারাপ খবর আশা করব?
মিরজাফর আলি যেন একটু দ্বিধা করতে লাগল। তারপর বললে–আমাকে কি তুমি আমার যথার্থ সম্মান দিয়েছ মির্জা? আমাকে কি তুমি নিজের রিস্তাদার বলে বিচার করেছ যে ভাল খবর আশা করবে?
তার মানে?
তার মানে মানিকচাঁদকে তুমি আলিনগরের রাজা করে দিলে। অথচ আমি কি ফিরিঙ্গিদের কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দিইনি? আবার এবার পূর্ণিয়ার লড়াইতেও তুমি হয়তো আর কাউকে আরও বড় চাকরি দিয়ে দেবে, তা হলে কেন আমি তোমার স্বার্থের জন্যে প্রাণ দিয়ে লড়াই করব?
নবাব মির্জা মহম্মদ রেগে উঠতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ নিজেকে সামলে নিলেন।
বললেন–এই কথাই বলতে তুমি এখানে এসেছ লড়াই ছেড়ে?
লড়াই ছেড়ে নয়, লড়াইতে হেরে। আমিই তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি।
আর শওকত জঙ?
মিরজাফর আলি গম্ভীর গলায় বললে–শওকত জঙ জিতেছে, সে আসছে তোমার সঙ্গে মোলাকাত করতে।
বলছ কী তুমি? তুমিই আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে?
মিরজাফর আলি বললে–তুমি কারও সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করোনি? তুমি রাজা রাজবল্লভকে তাড়িয়ে দাওনি? তুমি ঘসেটিকে চেহেল্-সুতুনের ফাটকে আটকে রাখোনি? তুমি হুসেন কুলি খা-কে খুন করোনি? নিজে বিশ্বাসঘাতক হয়ে আমাকে বিশ্বাসঘাতক বলতে তোমার লজ্জা করল না?
নবাব মির্জা মহম্মদ স্তম্ভিতের মতো মিরজাফর আলির দিকে চেয়ে রইলেন। মিরজাফর আলি কি তাকে ভয় দেখাতে এসেছে নাকি?
মোহনলাল কোথায় গেল?
শওকত জঙ তাকে ধরে নিয়ে বন্দি করে রেখেছে।
সেকী? দোস্তমহম্মদ খাঁ, মিরকাজেম খাঁ, দিলির খাঁ, আসাল খাঁ, তারা কোথায়?
তারা খুন হয়ে গেছে!
তা হলে তুমি? তুমি এখনও চুপ করে আছ? আমি কি একটু বিশ্রাম করতেও পাব না? তোমাদের দিয়ে কি আমার একটা উপকারও হবে না? তুমি আমার কাছে এসেছ নিজের কঁদুনি গাইতে?
মিরজাফর আলির মুখের ভেতর দাঁতে দাঁত চাপার শব্দ হল।
বললে–না, আমি এসেছি তোমার কাছে জবাবদিহি চাইতে!
কীসের জবাবদিহি?
এই অন্যায় ব্যবহারের।
আমার সেপাইরা কোথায়? আমার সিপাহশালার না হয় নেই, কিন্তু সেপাই-লস্কর–গোলন্দাজ, তারা কোথায়?
মিরজাফর যেন দাঁত বার করে হাসতে লাগল। আজ মির্জা মহম্মদের বিপদের দিনেই যেন মিরজাফর আলির হাসবার পালা। অন্য সময় হলে বুকে এক লাথি দিয়ে জাফর আলিকে ছুঁড়ে ফেলে। দিতেন তিনি। কিন্তু এ-সময় আশেপাশে যে কেউ নেই তার।
কই, জবাবদিহি দাও!
নবাব মির্জা মহম্মদের যেন শ্বাসরোধ হয়ে এল। বললেন–জবাবদিহি চাইছ তুমি কার কাছে তা জানো?
চাইছি নবাব আলিবর্দি খাঁর আদরের নাতির কাছে।
খবরদার, জাফর আলি খাঁ!…
নবাবগঞ্জের জল-হাওয়ার বোধহয় কোনও জাদু আছে। যে-মির্জা মহম্মদ কখনও কোনওদিন ঘুমিয়ে পড়ে না, তার যে কেমন করে এমন অকাতর ঘুম এসেছিল কে জানে! হঠাৎ বাইরে হইহই শব্দে নবাব উঠে বসলেন। ছোট একটা শিবির। বাইরের বিল থেকে ব্যাঙ ডাকার শব্দ আসছিল। তাকে ছাপিয়ে আর একটা আওয়াজ কানে আসতেই তার ঘুম ভেঙে গেছে।
কোথায়? মিরজাফর আলি খাঁ কোথায় গেল হঠাৎ?
খবর দিলে প্রথম রাজা মোহনলাল নিজে। রাজা মোহনলাল এত বড় সুখবরটা আর কারও মুখ দিয়ে শোনাতে চায়নি বলেই নিজে এসেছে।
ভেবেছিলাম, আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন জাঁহাপনা।
নবাব বললেন মিরজাফর আলি কোথায়? তাকে দেখছি না
মোহনলাল বললে–মিরজাফর সাহেব আজকে জান দিয়ে লড়েছে জাঁহাপনা। শওকত জঙ খুন হয়ে গেছে, এই খবরটা দিতে এলাম
পেছন পেছন আরও অনেকে এল। একেবারে ভিড় করে দাঁড়াল সবাই। দোস্ত মহম্মদ, মিরকাজেম, দিলির, আসালৎ। সবাই এসে নবাবের সামনে কুর্নিশ করে দাঁড়াল।
জাফর আলি সাহেব কোথায়? আসেনি?
মোহনলাল বললে–তাঁর হাতে চোট লেগেছে জাঁহাপনা, দাওয়াই লাগাতে গেছে হেকিমখানায়
চলো, আমি যাই জাফর আলি সাহেবকে দেখে আসি
মিরজাফর আলির হাতে চোট লেগেছিল। সত্যিই জাফর সাহেব প্রাণ দিয়ে লড়েছে আজ। হেকিমখানার একটা খাঁটিয়ায় শুয়ে ছিল। মির্জাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করলে।
আপনি আমার জন্যে যা করেছেন জাফর আলি সাহেব, আমি তা ভুলব না-
বলে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলেন নবাব মিরজাফর আলিকে। তখনও তার সারা গায়ে ঘাম ঝরছে। তখনও মিরজাফরের মুখে কোনও কথা নেই। হঠাৎ স্বপ্নটার কথা মনে পড়ল মির্জা মহম্মদের।
নবাবগঞ্জের মাঠের ওপর তখন সেপাইরা ছুটে ছুটে পালাচ্ছে। এ দৃশ্য আগেও অনেকবার দেখেছে মির্জা। কলকাতার লড়াইয়ের পর ঠিক এই রকমই ঘটেছিল। ঠিক তারই পুনরাবৃত্তি। বাংলার ইতিহাসের সে এক সন্ধিক্ষণ। তবু সেদিন মির্জার মনে হয়েছিল এ হয়তো ভালই হল। এ না হলে কি তিনি জানতে পারতেন, মিরজাফর আলি তার কত আপন, কত আত্মীয়! এ না হলে কি তিনি জানতে পারতেন, যে-মসনদের ওপর তিনি বসে আছেন তা পাথরের না মাটির!
মির্জা মহম্মদের চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। এরা তার এত আপনার জন। অথচ এদেরই তিনি এত সন্দেহ করেছেন। এদেরই তিনি এত অপমান করেছেন। কিন্তু সম্মান বিলোনো কি অত সহজ। তার হাতে তো সম্মানের অফুরন্ত ভাড়ার নেই। ক’জনকে তিনি রাজা করবেন, ক’জনকে মহারাজা। অথচ তিনি নিজেই কি নবাব বলে নিজেকে ঘোষণা করতে পারেন!
