ফটকের কাছে পৌঁছে দিয়ে নজর মহম্মদ তখন চলে গেছে।
হঠাৎ পেছন ফিরে কান্ত চিৎকার করে ডাকল-নজর মহম্মদ
কী হুজুর?
পেছনের অন্ধকার থেকে নজর মহম্মদ আবার এগিয়ে কাছে সরে এল। বললে–আস্তে আস্তে কথা বলুন হুজুর, আজ বড় কড়া পাহারা বসে গেছে শহরে–
কান্ত গলা নামিয়ে বললে–বলছি কী, তোমাদের কাজিসাহেব, তোমাদের সদরস সুদুরকে বলে কয়ে মরিয়ম বেগমের ফাঁসিটা ঠেকানো যায় না?
না হুজুর, ঠেকানো যায় না।
কেন? যদি নবাবকে খুব করে পায়ে ধরি, তা হলে?
না হুজুর, তা হলেও ঠেকানো যাবে না। তবে এক কাজ করলে ঠেকানো যায়
কী কাজ? বলো না নজর মহম্মদ, কী কাজ?
আপনার টাকা আছে? কিছু টাকা খরচ করতে পারবেন?
টাকা? কত টাকা?
আসরফি! এক হাজার আসরফি!
কান্তর যেন একটু আশা হল। বললে–এক হাজার আসরফি দিলে মরিয়ম বেগমসাহেবার ফাঁসি আটকানো যাবে?
বিলকুল!
সত্যি বলছ তুমি? এক হাজার আসরফি দিলে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে ছেড়ে দেবে? …।
আলবত ছেড়ে দেবে হুজুর, কেউ না ছাড়ে তো আমাকে বলবেন। আমার কাছে আসবেন আপনি এক হাজার আসরফি নিয়ে, মহকুমে কাজার সদরস সুদুরের সঙ্গে আমি আপনার মুলাকাত করিয়ে দেব। গুনে গুনে এক হাজার আসরফির পয়জার মারব তার মুখে আর সে তোবা তোবা বলে মরিয়ম বেগমকে ছেড়ে দেবে! তা হুজুর, মরিয়ম বেগমের জন্যে ঝুটমুট কেন এতগুলো আসরফি খরচ করতে যাবেন? পেশমন বেগমকে কি আজ আপনার পসন হল না? পেশমন বেগম কি আপনাকে সুখ দিলে না?
কান্তর গাটা রি-রি করে উঠল।
বললে–ওকথা থাক, তুমি মরিয়ম বেগমের কথা বলো! মরিয়ম বেগমের জন্যে আমি সব করতে পারি। বলো, কী করলে একবার তার সঙ্গে দেখা করতে পারি।
কোথায়? মতিঝিলে? মতিঝিলে গিয়ে মুলাকাত করবেন? তা হলেও, ভি টাকা লাগবে আপনার। নেয়ামত খিদমদগারকে দিতে হবে, কোতোয়ালকে ভি দিতে হবে–
কত লাগবে?
পাঁচ মোহর।
পাঁচ মোহরের কমে হয় না?
নজর মহম্মদ বললে–কী যে বলেন হুজুর, কোতোয়াল তো এক মোহর দিলে বাতই বলবে না। নেয়ামত নেবে এক মোহর, আরও দু’জন খিদমদগার আছে, তারা নেবে এক মোহর, তারপর ফটকের পাহারাদার আছে, তারাও ভি নেবে এক-দু’ মোহর। তা পাঁচ মোহর না দিতে পারেন, চার মোহর দেবেন,–আমার সঙ্গে কোতোয়ালের জান-পহচান আছে, আমি বলে-কয়ে বন্দবস্ত করে দেব
তারপর কান্তকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বললে–আপনি কিছু ঘাবড়াবেন না হুজুর, মোহর দিলে দিল্লির মসনদ ভি আপনার পায়ের তলায় এনে দিতে পারি, মরিয়ম বেগম তো দূর অস্ত! আপনি কিছু ঘাবড়াবেন না, সারারাত আপনার পরেশান হয়েছে, এখন আরামসে নিদ দিনগে যান।
বলে কান্তর পিঠ চাপড়ে দিয়ে নজর মহম্মদ আবার ফটকের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। তখন বাইরের জগতে অন্ধকার পাতলা হয়ে আসছে। আর খানিক পরেই হয়তো চেহেল-সুতুনের মসজিদের ওপর থেকে মৌলভি সাহেব আজান পড়তে শুরু করবে সুর করে করে। আর তারপর ইনসাফ মিঞা নহবতে টোড়ির আলাপ তুলবে উদারার নিখাদ থেকে।
কান্ত তাড়াতাড়ি চকবাজারের দিকে পা বাড়াল।
*
পাটনার নায়েব-নাজিম রামনারায়ণকে আগের থেকে খবর পাঠানো হয়েছিল। শওকত জঙকে দু’দিক থেকে আক্রমণ করা হবে। রামনারায়ণ সেপাই নিয়ে ওদিক থেকে এগোবে। আর এদিকে রাজা মোহনলাল সেপাইদের নিয়ে গঙ্গা পেরিয়ে মালদহ জেলার সোমদহ, হিয়াৎপুর আর বসন্তপুর গোলার দিকে এগিয়ে গিয়ে পৃর্ণিয়ার ওপর গোলা ছুড়বে।
ছাব্বিশ বছরের নবাব শান্তি পেতে চেয়েছিল জীবনে। নানিবেগমের কাছে শান্তির জন্যে খোদাতালার দরবারে দোয়া চাইতে বলেছিল। কিন্তু শান্তি চাইবার আগে শান্তির যোগ্যতা অর্জন না করলে চলবে কেন? শান্তি আমি তোমাকে দেব, কিন্তু শান্তির বোঝাই কি তুমি বইতে পারবে? শান্তির যন্ত্রণা কি অশান্তির যন্ত্রণার চেয়ে কিছু কম দুর্বিষহ মির্জা মহম্মদ!
রাজা মোহনলাল বলেছিল–আপনি জাঁহাপনা এখানে থাকুন, আমি শওকত জঙ সাহেবের সঙ্গে ফয়সালা করে আসি
নবাব মির্জা মহম্মদ নিজের মনেই হাসলেন। মোহনলাল হয়তো ভাল মনে করেই কথাটা বলেছে। সে নবাবের মঙ্গলই চায়। নবাবকে বাঁচাতেই চায় সে। কিংবা হয়তো ভেবেছে নবাব ভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সংকোচ করবে! শওকতের গায়ে তরোয়াল ছোঁয়াতে দ্বিধা করবে।
একবার শুধু জিজ্ঞেস করলেন–জাফর আলি আছে?
মোহনলাল বললে–আছে জাঁহাপনা
ওর দিকে একটু লক্ষ রাখবে মোহনলাল। ওকে আমি বিশ্বাস করি না। আর কে কে আছে সঙ্গে?
আর আছে দোস্তমহম্মদ খাঁ, মিরকাজেম খাঁ, আর আছে দিলির খাঁ আর আসালৎ খাঁ
ওরা আবার কারা?
ওরা হল জাঁহাপনা, উমের খাঁ’র ছেলে।
নবাব মির্জা মহম্মদ একটু আশ্বস্ত হলেন। শওকত জঙ-এর দলে আছে শ্যামসুন্দর, আর আছে লালুহাজারি। ওদের ওপর একটু নজর রাখবে ভাল করে।
রাজা মোহনলালকে কিছু বলতে হয় না। নবাবের মনের কথাটুকু যেন সে আগে থেকে জানতে পারে। সে কামান থেকে গোলা ছোড়বার হুকুম দিয়ে দিলে। গোলাগুলো গিয়ে নবাবগঞ্জ আর মনিহারির মধ্যিখানের বিলের মধ্যে দুমদাম করে পড়তে লাগল।
রাত্রে যখন নবাব মির্জা মহম্মদ শুতে গেলেন, তখনও গোলা ছোঁড়ার শব্দ আসছিল কানে। কিন্তু বিছানায় শুয়ে শুয়েও ঘুম এল না। সমস্ত জীবনটার কথা মনে পড়তে লাগল। কোথায় মসনদ পাবার পর এখন মতিঝিলে বিশ্রাম নেবার কথা, কিংবা চেহেল সুতুনের ঘরে পালকের বিছানায় শুয়ে বেগমসাহেবাদের গান শোনা আর কোথায় এই পূর্ণিয়া! কোন অপ্রত্যাশিত কোণ থেকে এই আবার আর-এক অশান্তি এসে হাজির হয়েছে।
