বেগমটা যেন আরও খেপে গেল।
মরিয়ম বেগম তো বাইরে গেছে।
বাইরে? কোথায়?
চকবাজারে তার বালমের সঙ্গে দেখা করতে গেছে। কেন, আমাকে তোমার পছন্দ হচ্ছে না? আমি জওয়ান নই? আমি সুন্দরী নই? আমায় মহব্বত দেবে না তুমি?
শেষকালে বেগমটা বোধহয় একেবারে পাগলের মতো হয়ে গেল। আঁচড়ে কামড়ে খামচে একেবারে একাকার করে দিলে কান্তকে। কান্তকে বোধহয় পিষে গুঁড়িয়ে ফেলবে বেগমটা! কান্ত প্রাণপণে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলে। কিন্তু কিছুতেই ছাড়বে না বেগমটা। কেবল বলে–আমাকে মহব্বত দাও জনাব, মহব্বত দাও–
শেষপর্যন্ত কান্ত বোধহয় হেরেই যেত বেগমটার গায়ের জোরের দাপটে, কিন্তু চেহেল্-সুতুনের ভেতরে হঠাৎ যেন অনেকগুলো পায়ের আওয়াজ হতে লাগল। কোথায় যেন ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বেজে উঠল। অনেক মেয়েলি গলার আওয়াজ আসতে লাগল কানে। তাতেও বেগমটা কাবু হয়নি। বেগমটার লাল মুখ আরও টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন তার মুখে এসে জমাট বেঁধে গেছে।
হঠাৎ সেই সময়ে বলা নেই কওয়া নেই, নজর মহম্মদ হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে এসে ঢুকেছে। সেদিন নজর মহম্মদ ঠিক সেই সময়ে পেশমন বেগমের ঘরে ঢুকে না পড়লে কী হত বলা যায় না। হয়তো কান্তকে আঁচড়ে কামড়ে খামচে মেরেই ফেলত বেগমটা।
পেশমন বেগমের তখন উত্তাল-উদ্দাম অবস্থা। তার ওড়নি-ঘাগরা ছিঁড়ে গেছে টানাটানিতে। নজর মহম্মদকে সেই অবস্থায় ঘরে ঢুকতে দেখেই বেগমসাহেবা পাগলের মতো চিৎকার করে উঠেছে–তুম কুঁ আয়া? তুম কুঁ অন্দর ঘুষা? নিক যাও–নিক যাও–নিকলো ইহাসে
বেগমসাহেবা, খুব বিপদ হয়েছে!
যো কুছ হোনে দেও, আব তুম নিকলো, নিকল যাও–নিকল যাও
নজর মহম্মদকেই বোধহয় সেদিন খুন করে ফেলত বেগমটা। কিন্তু নজর মহম্মদ বেগমটার মুখের ওপরেই বললে–মতিঝিলমে সফিউল্লা খাঁ সাহাব খুন হো গিয়া
যেন আগুনে জল পড়ল।
সফিউল্লা সাহেব রাতে মতিঝিলে ঢুকেছিল, এখন নেয়ামত খবর পাঠিয়েছে, সাহাব খুন হয়েছে।
কে খুন করেছে?
মরিয়ম বেগমসাহেবা!
কান্ত চিৎকার করে উঠল–কে? কার নাম বললে?
নজর মহম্মদ আবার সেই একই উত্তর দিলে–মরিয়ম বেগমসাহেবা খুন করেছে খাঁ সাহেবকে।
মরিয়ম বেগমের নামটা শুনে কান্তর মাথাতেও যেন শরীরের সমস্ত রক্ত উঠে জমাট বেঁধে গেল। মরিয়ম বেগম! রানিবিবি! মরালী! মরালী খুন করেছে সফিউল্লা খাঁ সাহেবকে?
তুমি ঠিক শুনেছ নজর মহম্মদ? ভুল শোনোনি তো?
না হুজুর, নেয়ামত কোতোয়ালকে খবর ভেজিয়ে দিয়েছে। মতিঝিলের ঘরে খুন ঝরছে। ঝুট শুনব কেন হুজুর? নানিবেগমসাহেবাকে ভি খবর দিয়ে দিয়েছি আমি। নানিবেগমসাহেবা লুৎফুন্নিসা বেগমসাহেবাকে খবর ভেজিয়ে দিয়েছে। আপনি এখন চলুন হুজুর, এখন চেহেল্-সুতুন তালাস করতে পারে কোতোয়াল সাহাব। পিরালি খাঁ চেহেল্-সুতুনের পাগলা-ঘন্টি বাজিয়ে দিয়েছে চলিয়ে, বাহার চলিয়ে
পেশমন বেগমের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে কান্ত মুক্তির নিশ্বাস ফেলবার সময়টাও পেল না। তার মনে হল, এ আবার কোন বিপদের মধ্যে জড়িয়ে পড়ল মরালী।
বাইরে আসতে আসতে কান্ত জিজ্ঞেস করলে মরিয়ম বেগম মতিঝিলে কী করতে গিয়েছিল নজর মহম্মদ? আমি তো মরিয়ম বেগমের সঙ্গে দেখা করতেই চেহেলসুতুনে এসেছিলুম
নজর মহম্মদ–কিন্তু হুজুর, পেশমন বেগমসাহেবা ভি আচ্ছি জওয়ান বেগম, উও ভি মরিয়ম বেগমসে খুবসুরত–
হোক খুবসুরত, তুমি তো আমাকে বলোনি যে মরিয়ম বেগম চেহেল সুতুনে নেই, তা হলে আমি আজ এখানে আসতুম না।
নজর মহম্মদ বললে–তা আমার মালুম হবে কী করে হুজুর, আমি কী করে জানব যে মরিয়ম বেগমসাহেবা বরকত আলির সঙ্গে চকবাজারে যাবে?
চকবাজারে? চকবাজারে কোথায়?
হুজুর, সারাফত আলির দোকানে। মরিয়ম বেগম তাঞ্জামে করে সারাফত আলির দোকানে গিয়েছিল আপনার সঙ্গে মুলাকাত করতে!
সারাফত আলির দোকানে গিয়েছিল? আমার সঙ্গে দেখা করতে?
হ্যাঁ হুজুর, আর আমি এদিকে আপনাকে নিয়ে চেহেল্-সুতুনে চলে এসেছি। আমি হুজুর তখন তো জানি না যে বরকত আলি মরিয়ম বেগমকে নিয়ে সারাফত আলির দোকানে গেছে। সেখানে যাবার পরই তো সফিউল্লাসাহেব মরিয়ম বেগমকে মতিঝিলে নিয়ে গেছে
কান্ত আকাশ থেকে পড়ল যেন সব শুনে।
বললে–এখন তা হলে কী হবে নজর মহম্মদ? মরিয়ম বেগমের কী হবে?
নজর মহম্মদ বললে–কাজির কাছে কাছারিতে বিচার হবে!
বিচার হয়ে যদি প্রমাণ হয় যে মরিয়ম বেগম সফিউল্লা খাঁ সাহেবকে খুন করেছে, তা হলে কী হবে?
তা হলে ফাঁসিতে লটকে দেবে, হুজুর।
ফাঁসি হয়ে যাবে মরিয়ম বেগমের?
তা তো হবেই হুজুর। কোতোয়াল সাহাব যে বড়া কড়া আদমি, ঔর কাজিসাহাব ভি বড়া কড়া সদরস সুদুর
কথা বলতে বলতে দু’জনেই চোরাফটকের কাছে এসে পড়েছিল। রাত গভীর। বাইরের আকাশে তারাগুলো ভাল করে দেখা যায় না কুয়াশার জন্যে। যে-গানটা সন্ধেবেলা চেহেল্-সুতুনের ভেতর। হচ্ছিল সেটা অনেক আগেই থেমে গেছে। যো হোনেকা থি উও তো হো গয়ি, আভি উসকো ক্যা পরোয়া। কান্তর মনে হল তবু যেন কিছু করার আছে। সে যেন মরালীর কিছু উপকার করতে পারে এখনও। সমস্ত বুকটা তার দুরদুর করে কাঁপতে লাগল। যদি সত্যিই মরালীর ফাঁসি হয়ে যায়! যদি কাজি সাহেব তার ফাঁসির হুকুম দিয়ে বসে! কিন্তু কেন সে খুন করতে গেল সফিউল্লা সাহেবকে? মরালী কি জানে না যে সফিউল্লা খাঁ সাহেব নবাব মির্জা মহম্মদের কত পেয়ারের দোস্ত!
