পেশমন বললে–এই শরবতটা খেয়ে নিন, এ আপনার পা টিপে দেবে।
কান্ত আগের বারে এখানে এসেছিল মরালীর কাছে। সেবার তো শরবত এনে দেয়নি কেউ। পা টিপে। দিতেও আসেনি কেউ। এবারে এরা এমন করছে কেন? নাকি চেহেলসূতুনের বেগমদের এই-ই নিয়ম!
আমি শরবত খাব না–আমার তেষ্টা পায়নি!
পেশমন যেন আদরে ফেটে পড়ল–তা কেমন করে হয় জনাব, আপনি আমার মেহমান, আপনাকে তা হলে কী দিয়ে খাতির করব? নিন
কান্ত ঢোক ঢোক করে শরবতটা গিলে বেগমসাহেবার হাতে ফেরত দিলে।
নাচ দেখবেন, নাচ?
কান্ত আরও আড়ষ্ট হয়ে পড়ল! এতখানি ধাড়ি একজন মেয়েমানুষ তার সামনে নাচবে সেটাই বা কী রকম!
আপনি আরাম করে বসুন জনাব, আমার বাঁদি আপনার পা টিপে দিক, পা টিপলে আপনার তকলিফ দূর হবে, আপনি অনেক দূর থেকে আসছেন
কান্ত বললে–আমি অনেক দূর থেকে আসিনি তো, আমি সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকান থেকে আসছি
পেশমন বললে–সে তো আমি জানি সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকান থেকে অনেক জওয়ান আসে, এসে চেহেল্-সুতুনের শরবত খেয়ে যায় আমার বাঁদি তাদের পা টিপে দেয়,
কান্ত বললে–আমি আগে আসিনি, একবার শুধু এসেছিলাম
কোন বেগমসাহেবার ঘরে? গুলসন বেগম?
কান্ত বললে–না।
তক্কি বেগম?
না না, ওসব কেউ-ই না—
পেশমন বেগম বললে–আপনি আর কারও ঘরে যাবেন না জনাব। সবাই আপনার কাছ থেকে টাকা খিচে নেবে। টাকাও খিচে নেবে, ঔর আরাম ভি পাবেন না। আপনি নজর মহম্মদকে বলে আমার ঘরে আসবেন। রাতভর আমার ঘরে থাকতে পারবেন, কেউ দেখতে পাবে না, কেউ জানতেও পারবে না। নজর মহম্মদ আমার বড় পেয়ারের খোঁজা, বড় বিশ্বাসি আদমি, ওকে বলে দেবেন, ও সোজা আপনাকে আমার ঘরে নিয়ে আসবে
বাঁদিটা হঠাৎ তার পায়ে হাত দিতেই কান্ত পা দুটো টেনে নিয়েছে। বললে–না না, পা টিপতে হবে না, তুমি যাও।
কেন, টিপুক না
কান্ত বললে–না না, ওকে যেতে বলে দিন
পেশমন বাঁদিকে বাইরে চলে যেতে বলতে সে চলে গেল। তারপর বললে–আপনার খুব শরম বুঝি?
না, শরম নয়, আমার পা কখনও কাউকে দিয়ে টেপাইনি আগে। পেশমন বেগম হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসল। একেবারে কান্তর মুখের কাছাকাছি এসে গেল। প্রায় গায়ের ওপর পড়ে আর কী। মুখের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করলে আপনার বয়েস কত জনাব?
কান্ত নিজের মুখখানা সরিয়ে নিতে যেতেই পেশমন বেগম তার মুখখানা দুই হাতের পাতা দিয়ে ধরে ফেলেছে।
বলুন জনাব, আপনার উমর কত?
পেশমন বেগমকে এড়াবার জন্যেই কান্ত নিজের বয়েসটা বলে দিলে।
কিন্তু তাতে উলটো ফল হল। কান্তর বয়েসটা শুনে যেন পেশমন বেগম একেবারে খেপে গেল। কান্তর পাশেই বসে দু’হাতে তাকে জড়িয়ে ধরলে। বললে–তোমার কানে কানে একটা কথা বলব, মুখটা সরিয়ে নিয়ে এসো–
কী কথা?
পেশমন বেগম বললে–কী কথা শুনতে চাও তুমি বলো! আমি তাই-ই বলব। আমি তোমার মতন সুন্দর একটা জওয়ান চেয়েছিলুম, জানো জনাব! ঠিক তোমার মতন খুবসুরত! তুমি খুব খুবসুরত! দুনিয়ামে সব চিজ ঝুটা, তা জানো৷ আসল চিজ শুধু মহব্বত, আর সব চিজ ঝুটা–সব–
কান্ত হঠাৎ বললে–নজর মহম্মদ কোথায় গেল?
পেশমন যেন আরও জোরে আঁকড়ে ধরল কান্তকে। বললে–নজর মহম্মদকে দূরে হটাও, সবাইকে দূরে হটাও, এখন আর কেউ নেই চেহেল সুতুনে জনাব, শুধু তুমি আছ আর ম্যায়! মহব্বত তোমার ভাল লাগে না জনাব? মহব্বত?
যেন আবোল-তাবোল সব কথা বলতে লাগল বেগমটা। বলতে লাগল–আমি সব পেয়েছি জনাব, জিন্দগিতে যা কিছু জেনানারা চায়, সব পেয়েছি। রুপেয় পেয়েছি, আসরফি পেয়েছি, রূপ পেয়েছি, জওয়ানি পেয়েছি, দিল্লির দরবারে আমি সব কুছ পেয়েছি জনাব, শুধু মহব্বত পাইনি। এখানে নাচ-গান করতে এসেছিলাম, ভেবেছিলাম এখানে এসে মহব্বত পাব, কিন্তু এই মুর্শিদাবাদের চেহেল্-সুতুনে এসে আমার সব খোয়া গেল। আমার রূপ গেল, আসরফি ভি গেল, তবু মহব্বত আমি পেলাম না জনাব, তবু মহব্বত আমি পেলাম না
বেগমটার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
এ কী বিপদে পড়ল কান্ত! বেগমটাকে যত ছাড়াতে চায়, ততই জড়িয়ে ধরে সে।
কান্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললে–আমি উঠি এবার বেগমসাহেবা
না না না, আমাকে তুমি মহব্বত দেবে জনাব? আমি যে মহব্বত পাইনি! আমি কী নিয়ে বাঁচব? আমি তোমার কাছে আর কিছু চাই না, আমি শুধু মহব্বত চাই আমাকে মহব্বত দেবে না?
কান্ত আর পারলে না। তাড়াতাড়ি বেগমটাকে সরিয়ে উঠে পঁড়াল। তারপর ঘরের দরজাটার দিকে এগিয়ে যেতেই বেগমটা হাতটা ধরে ফেলেছে।
তোমাকে যেতে দেব না জনাব, তুমি রাতভর আমার ঘরে থাকবে। আমায় তুমি মহব্বত দেবে
কান্তর মনে হল সে চিৎকার করে নজর মহম্মদকে ডাকে।
নজর মহম্মদ! নজর মহম্মদ!
কিন্তু তার আগেই বেগমটা তার মুখ চাপা দিয়ে দিয়েছে নিজের হাতের পাতা দিয়ে।
বলো, তুমি আমার এখানে রাতভর থাকবে, আমায় মহব্বত দেবে?
কান্ত বললে–আমি তো আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসিনি
বেগমটা ততক্ষণে তার মুখখানা নিয়ে নিজের মুখের ওপর চেপটে দিতে শুরু করেছে। তার গাল, ঠোঁট, নাক সব যেন জখম করে দিতে চাইছে। বেগমটার গায়ে এত জোর! কান্তর মনে হল তার ঠোঁট দিয়ে যেন রক্ত বেরোতে শুরু করেছে।
আমি মরিয়ম বেগমের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম বেগমসাহেবা, ভুল করে নজর মহম্মদ আমাকে আপনার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে।
