নজর মহম্মদ না?
নজর মহম্মদও দেখতে পেয়েছে তাকে।
আপনার কাছেই যাচ্ছিলাম কান্তবাবু! আজকে চেহেল্-সুতুনে যাবেন না? নবাব তো ফৌজ নিয়ে পূর্ণিয়ায় লড়াই করতে গেছে।
মেহেদি নেসার সাহেব?
মেহেদি নেসার সাহেব ভি গেছে। চলিয়ে।
আমার কাছে তো এখন মোহর নেই নজর মহম্মদ, চলো, সারাফত আলি সাহেবের খুশবু তেলের দোকানে চলো।
নজর মহম্মদ বললে–সে আমি পরে মোহর নিয়ে নেব, আপনি সেজন্য ভাববেন না। আমি মিঞাসাহেবের পুরনো খদ্দের
অনেক আশা নিয়ে সেদিন কান্ত চেহেল্-সুতুনে গিয়েছিল। কিন্তু তখন কি জানত সেখানে গিয়ে সে আর এক অদৃশ্যপূর্ব নাটকের মধ্যে জড়িয়ে পড়বে।
মরালী তার একটু আগেই চলে গেছে। পেশমন বেগম তখন সবে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। পেশমন বেগম একদিন নাচতে এসেছিল, গান গাইতে এসেছিল। একদিন অনেক আশা নিয়ে দিল্লির বাদশার দরবারে মার সঙ্গে যাতায়াত শুরু করেছিল। সে অনেকদিন আগের কথা। পেশমনের মা বলেছিল আখের চিনে জিন্দগির পথে চলবি মা, নইলে দুনিয়া থেকে একেবারে বরবাদ হয়ে যাবি
সেই বরবাদই শেষ পর্যন্ত হয়ে গেছে পেশমন বেগম। আজ আর তার ডাক পড়ে না। আজ মতিঝিলের দরবারে গুলসনের ডাক আসে। অথচ একদিন পেশমন না হলে মহফিলের আসরই বসতে পারত না। সে-সব দিন আর নেই। সেসব দিন আর আসবেও না।
বাইরে থেকে গুলসনের গান ভেসে আসছিল তখনও। গুলসন আজ নিজের ঘরে বসেই সন্ধে থেকে গানের তালিম দিচ্ছে। যো হোনেকা থি, উও তো হো গয়ি, আভি উসকো ক্যা পরোয়া। যা হবার ছিল তা তো হয়েই গেছে, এখন আর তা নিয়ে ভেবে কী লাভ! সমস্ত চেহেলসুতুনটাই যেন ওই কথা বলে চলেছে। গুলসন যেন সকলের হয়েই সকলের মনের কথা বলে চলেছে। কী হবে এই জীবন। রেখে! কী হবে রোজ রাত্তিরে এই সেজেগুজে, কী হবে এই রূপ-যৌবন-মোহর প্রশংসা নিয়ে। সবই তো নিরর্থক। সবই তো মিথ্যে! তাই শুধু ফুর্তি করে যাও। যা হবার তা হবেই। একদিন ছিল যখন নবাব। মির্জা মহম্মদ পেশমনের পায়ে মাথা বিকিয়ে দিতে পারলে ধন্য হয়ে যেত। একদিন ছিল যখন মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, সফিউল্লা সাহেব পেশমনকে খোশামোদ করে গান শুনতে চাইত। একদিন ছিল যখন এই চেহেল্-সুতুন পেশমনের সেবার জন্যে উন্মুখ হয়ে থাকত। আজ তাকে নিজের ঘরে একলা কাটাতে হচ্ছে। পেশমন বেগমের হাসি পেল সেদিনের কথা ভেবে।
এতক্ষণ বোধহয় মরিয়ম বেগম চকবাজারে পৌঁছে গেছে। চুস্ত পায়জামা সেরোয়ানি আর তাজ মাথায় দিয়ে নিজের বালমের সঙ্গে দেখা করছে।
একদিন পেশমন বেগমও খোজাদের সঙ্গে নিয়ে তাঞ্জামে করে চকবাজারে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে রাত কাটিয়ে এসেছে। তারপর আজ আর তার কোথাও ডাক পড়ে না। এখন গুলসনের পালা। কিন্তু একদিন গুলসনেরও দিন চলে যাবে। তখন মরিয়ম বেগমের পালা শুরু হবে। এমনি করেই অনাদি অনন্তকাল ধরে চেহেল্-সুতুন চলবে, ইতিহাস গড়িয়ে গড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। আর তারপর একদিন পেশমনের মতো মরিয়ম বেগমও মুছে যাবে চেহেল্-সুতুন থেকে। তখন আবার আসবে নতুন একজন। সেই নতুনকে নিয়েই আবার কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে তখন!
কে?
হঠাৎ মনে হল যেন ঘরের বাইরে কার ছায়া নড়ে উঠল।
আমি বেগমসাহেবা, আমি নজর মহম্মদ!
নজর মহম্মদকে দেখেই পেশমন উঠে বসল। এমন তো হয় না কখনও। নজর মহম্মদ তো এমন সন্ধেবেলা কখনও আসে না তার ঘরে।
একজন জওয়ান এসেছে বেগমসাহেবা। খুব খুবসুরত জওয়ান, আপনার ঘরে আনব?
এমন ঘটনাও যেন অনেকদিন তার জীবনে ঘটেনি। একটু অবাক হয়ে গেল পেশমন।
আমার ঘরে?
হ্যাঁ বেগমসাহেবা, সারাফত আলির খুশবু তেলওয়ালার আদমি। বহুত খুবসুরত!
পেশমন তবু বললে–আমার ঘরে? ঠিক জানিস তুই? অন্য দুসরি কোনও বেগম নয়, আমি?
নজর মহম্মদ তাড়াতাড়ি গিয়ে কান্তকে ঘরে ডেকে নিয়ে এসেছে। কান্তও কম অবাক হয়নি। এ কার ঘরে আজ নজর মহম্মদ তাকে নিয়ে এল। এ তো রানিবিবি নয়। এ তো মরিয়ম বেগম নয়। এ তো মরালী নয়।
কান্ত চুপ করেই দাঁড়িয়ে ছিল। নজর মহম্মদ এ কার ঘরে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেল তাকে। পেশমন বেগমও যতখানি অবাক, কান্তও ততখানি।
বাইরের পৃথিবীতে যখন পূর্ণিয়ায় শওকত জঙ-এর সঙ্গে নবাব মির্জা মহম্মদের লড়াই চলছে আর যখন মানিকচাঁদ বজবজের কেল্লার ওপর থেকে ফিরিঙ্গিদের পল্টনদের ওপর কামানের গোলা ছুড়ছে, যখন হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে নিয়ে দুর্গা গঙ্গার বুকের ওপর বজরার ছইয়ের ভেতরে বসে দুর্গানাম জপ করছে, তখন এখানে এই চেহেল্-সুতুনের ভেতরে পেশমন আর এক স্বপ্ন দেখতে লাগল।
স্বপ্নই বটে।
এতদিন তো নজর মহম্মদ কাউকে তার ঘরে আনেনি! হঠাৎ কি আবার তার ভাগ্য ফিরে গেল। কিন্তু নিজের ওপরেই মায়া হতে লাগল পেশমন বেগমের। এখন তো সে বাতিল হয়ে গেছে। এখন কেন একে তার ঘরে নিয়ে এল নজর মহম্মদ!
বৈঠিয়ে;
একটা গদিমোড়া বসবার জায়গা দেখিয়ে দিয়ে পেশমন বেগম তাকে আদর-অভ্যর্থনা করবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বসুন আপনি
কান্ত বসল না। বললে–আমি কিছু বুঝতে পারছি না,নজর মহম্মদ আমাকে এ কোথায় নিয়ে এল!
পেশমন বেগম বললে–আপনি কিছু ভাববেন না জনাব, আমি তো আছি, আমার নাম পেশমন বেগম। আপনি আরাম করে বসুন–
তারপর পাশের কামরায় গিয়ে নিজের বাঁদিকে ডেকে নিয়ে এল। ঘাগরা-পরা মেয়ে একটা হাসি হাসি মুখ। হাতে কাঁচের একটা পাত্রে শরবত এনেছে।
