কিন্তু মরালীই কি জানত এমন হবে!
সফিউল্লা সাহেব গালে চড় খেয়ে চুপ করে থাকবার মানুষ নয়। একেবারে হিড়হিড় করে টেনে বার করলে মরালীকে। আর টানাটানিতে তার মাথার তাজটা খসে পড়ে গেল। আর সবাই দেখলে একজন জেনানা, একেবারে খাস বেগম-মহলের জেনানা।
সফিউল্লা খাঁ সাহেব আর দেরি করেনি।
একবার শুধু বরকত আলিকে জিজ্ঞেস করেছিল–এ কে? এ কোন বেগম?
কিন্তু বরকত আলিরও তো গর্দানের ভয় আছে! বরকত আলিরও তো জানের ভয় আছে। সে বোবার মতো দাঁড়িয়ে থেকে তারপর কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল, আর দেখতে পাওয়া যায়নি তাকে। তারপর সারাফত আলির চোখের সামনে দিয়ে চকবাজারের হাজার হাজার মানুষের সামনে দিয়ে সফিউল্লা সাহেব একেবারে মরালীকে নিয়ে গিয়ে তুলেছিল মতিঝিলে। মতিঝিলের ফটক বন্ধ করে দিয়েছিল পাহারাদার। তারপর মতিঝিলের একটা ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে সফিউল্লা সাহেব চিৎকার করে উঠেছিল–তুমি কে? তুম কৌন?
সে-ঘটনার কথা মনে আছে মরালীর। মরালী তখন হাঁসফাস করছে।
বললে–আমাকে ছেড়ে দাও
সরাবখানার ভেতরে বসে ইব্রাহিম খাঁ সব দেখছিল। মরালীকে দেখেই চমকে উঠেছে আবার। আবার মুখপুড়ি এখানে এসেছে সফিউল্লা খাঁ সাহেবের সঙ্গে। মুখপুড়ি চরিত্রটা একেবারে খারাপ করে ফেলেছে গো! ছি ছি ছি!
ইতিহাসের আর একটা শিক্ষা এই যে, যে-জাত একবার ক্ষয় হবার মতো হয়, তখন তার সবদিক দিয়ে সর্বাঙ্গে ক্ষয়ের লক্ষণ প্রকাশ পায়। আলিবর্দি খাঁর মসনদ ছিল ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের মসনদ। মানুষের মনুষ্যত্বকে অস্বীকার করার মসনদ। শুধু তো জয় দিয়ে ইতিহাসের বিচার হয় না, তার পরাজয়ও ইতিহাসের মানদণ্ডে বিচার করে দেখতে হয়। মসনদ যখন পঁড়িয়ে থাকে তখনও তার পরীক্ষা, যখন পতন হয়, তখনও তাই। তাই শান্তির সময়ের হালচাল দেখে পতনের সময়ে চমকে উঠতে নেই। পতনের বীজ লুকিয়ে থাকে শান্তির মধ্যে। সে-পতনের বীজ পুঁতে গিয়েছিলেন আলিবর্দি খ নিজেই। নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা শুধু তার অসহায় উত্তরাধিকারী।
সেদিন মতিঝিলের মধ্যে নবাব সুজাউদ্দিনের আত্মাও বোধহয় চমকে উঠেছিল তার নিজের মূর্তি। দেখে। সফিউল্লা যেন তারই প্রতিচ্ছায়া, তারই মানস-শয়তান। শুধু সুজাউদ্দিনই নয়। সরফরাজ, আলিবর্দি সবাই যেন নিজেদের প্রতিমূর্তি দেখে একসঙ্গে তারস্বরে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন। আর। শুধুই কি সরফরাজ, আলিবর্দি খা? হোসেনকুলি খাঁ, করিম খাঁ, ভাস্কর পণ্ডিত, যারা এতদিন ঘুমিয়ে ছিল বিস্মৃতির অতলগর্ভে, তারাও হঠাৎ জেগে উঠে বলে উঠল–শাবাশ–শাবাশ ।
মতিঝিলের খিদমদগাররাও জানতে পারেনি ইতিহাসের প্রতিশোধ তখনও ষোলোকলা পূর্ণ হতে কতখানি বাকি আছে। মরালীও জানতে পারেনি সেদিন তার অতখানি দুঃসাহস কে অমন করে জুগিয়ে দিয়েছিল। কারা! কারাই বা তারা। সেদিন সে তার অতীত ভাবেনি, বর্তমান ভাবেনি, ভবিষ্যৎও ভাবেনি। ভাবেনি কী তার প্রতিফল, কতখানি তার শাস্তি, কেমন তার প্রতিক্রিয়া। সাধারণ গ্রামের একটা মেয়ে সে। নিয়তির অমোঘ চক্রে সে এসে পড়েছিল বাংলার ইতিহাসের এক বিষণ্ণ সন্ধিক্ষণে। সে জানতে পারেনি, তাকে উপলক্ষ করেই ইতিহাসের গতি একদিন নতুন করে মোড় ঘুরবে।
সফিউল্লা সাহেব তখন মতিঝিলের একটা ঘরের মেঝের ওপর অজ্ঞান অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। শ্বেতপাথরের ঠান্ডার ওপরেও সফিউল্লা সাহেবের গরম রক্ত যেন জমে বরফ হয়ে উঠতে জানে না। শীতকালের ঠান্ডাতেও টগবগ করে ফুটছে সে-রক্ত। সফিউল্লা সাহেবের ঠান্ডা দেহটার পাশে টগবগে গরম রক্ত গড়গড় করে গড়িয়ে গড়িয়ে চলেছে নর্দমার দিকে।
আমাকে অপমান? আমার ইজ্জৎ কি তোমার মা-বোনের ইজ্জতের চেয়ে কোনও অংশে ছোট? আমি কি তোমার রক্তের হকদার? মানুষের সম্মানের দাম কি রাস্তার ধুলো? যদি রাস্তার ধুলোই হয় তো সেই রাস্তার ধুলোতেই তোমার ঠাই হোক!
সঙ্গে সঙ্গে মতিঝিলের খিদমদগাররাও বোধহয় গন্ধ পেয়েছিল। বাইরে থেকে নেয়ামত দরজা ঠেলছে। কেওয়াড়ি খোলো, কেওয়াড়ি খোলো, কেওয়াড়ি খোলো
কেওয়াড়ির তলার ফাঁক দিয়ে সফিউল্লা সাহেবের গরম রক্ত বাইরের বারান্দায় এসে তখন এদিক-ওদিকে মাথা কুটতে লেগেছে। তবে কি আরও অনেকের মতো মরিয়ম বেগমও খুন হয়ে গেল!
আবার সেই এক চিৎকার এল–কেওয়াড়ি খোলো, কেওয়াড়ি খোলো, কেওয়াড়ি খোবলা
মরালী তখন পাথর হয়ে গেছে। মতিঝিলের শ্বেতপাথরের থামগুলোর মতোই নিথর-নিশ্চল নিষ্প্রাণ পাথর।
*
চেহেসূতুনের ভেতরের বাগানে তখনও সেই গানটা ভাসছে–যো হোনেকা থি, উও তো হো গয়ি, আভি উসকো ক্যা পরোয়া
মতিঝিলে যাওয়া হয়নি কান্তর। ইব্রাহিম খাঁর কাছে গিয়েই বা কী লাভ। বশির মিঞা হাতিয়াগড়ে গিয়েছিল। সেখানে কী করছে কে জানে! হয়তো এবার সব জানাজানি হয়ে যাবে। তার আগে যদি মরালী বেরিয়ে আসে তো বেঁচে যাবে!
মহিমপুরের দিক থেকেই ফিরে আসছিল আবার। সব যেন গোলমাল হয়ে গেছে কান্তর। যেভাবে কান্ত জীবন আরম্ভ করেছিল, সে যেন আজ কল্পনা। হয়তো এ-চাকরিও তার থাকবে না বেশিদিন। মেহেদি নেসার সাহেব তার ওপর চটে গেছে, মনসুর আলি মেহেদি সাহেবও চটে গেছে। এরপর কে তাকে রাখবে! সারাফত আলি সাহেব? কিন্তু সারাফত আলি সাহেবের যে-চাকরি সে-চাকরিও কি তার পোষাবে!
