হঠাৎ সামনে একটা তাঞ্জাম এসে দাঁড়াতেই যেন সারাফত আলির নেশাটা জমে উঠল।
কৌন?
না, খদ্দের নয়, খোজা বরকত আলি।
হুজুর, কান্তবাবু এই খুলিতে থাকে?
থাকে। কেন?
ওমরাহ সফিউল্লা খাঁ সাহেব একবার মুলাকাত করতে চান।
কান্তবাবু কি আবার আমির-ওমরার সঙ্গে দোস্তালি লাগিয়েছে।
কী জরুরত?
তা জানি না মিঞাসাহেব, খাঁ সাহেব তাঞ্জামের অন্দরে বসে আছেন, কান্তবাবুর সঙ্গে বাতচিজ আছে–
এই সফিউল্লা, ইয়ারজান, মেহেদি নেসার একদিন এই চকবাজারের রাস্তায় রাস্তায় বেত্তমিজি করে বেড়িয়েছে। জেনানাদের বোরখা উঠিয়ে মুখ দেখেছে, গঙ্গায় চান করতে করতে আওরতদের দেখে শিষ দিয়ে খোয়ার করেছে। আর এখন আবার তাঞ্জাম না হলে এক পা নড়তে পারে না। ইজ্জতদার আদমি হয়ে গেছে। তাজ্জব দুনিয়া।
সারাফত আলি সেইখানে বসেই চেঁচিয়ে উঠলে কী, সফিউল্লাসাহাব, মিঞাসাহেবকে আর যে পছনতে পারেন না দেখছি! আমি খুশবু তেলওয়ালা সারাফত আলি। বহুত বহুত বন্দেগি জনাব
বরকত আলি একটু ভড়কে গেল।
সারাফত আলি তখনও বলে চলেছে–তাঞ্জামটা সাবনে নিয়ে আসুন না সফিউল্লাসাহাব, আমাকে অত ডর কেন?
বরকত আলি তাঞ্জামের কাছে গেল। মুখ নিচু করে বললে–মিঞাসাহেব বাত করছে আপনার সঙ্গে
মরালী বললে–জিজ্ঞেস করো, কান্তবাবু কুঠিতে আছে কি না–
সারাফত আলি সাহেব তখনও চেঁচাচ্ছে। বহুদিন পরে সফিউল্লার সঙ্গে দেখা, এমন সুযোগ ছাড়া যায় না, যাদের এককালে কুকুর-বেড়ালের মতো মনে করেছে সারাফত আলি, তারাই আজ মুর্শিদাবাদের মসনদ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। তারাই এখন আট-বেহারার তাঞ্জামে চড়ে চকবাজারের রাস্তা দিয়ে বুক ফুলিয়ে চলছে।
সে-সব দিনের কথা বেবাক ভুলে গেলে খাঁ সাহেব! আজকে মির্জা মহম্মদের পা চেটে চেটে বুড়ো মিঞাসাহেবকেও ইয়াদ রাখলে না। নিমকহারামের বাচ্চা যত–
নেশার ঝোঁকে মিঞাসাহেব যা-নয়-তাই বলে সফিউল্লা খাঁ সাহেবকেনাগাড়ে গালাগালি দিয়ে যেতে লাগল। চকবাজারের রাস্তার কিছু লোক জড়ো হয়ে গেল খুশবু তেলের দোকানের সামনে। বাদশাও এসে দাঁড়াল ভেতরে। বরকত আলি দেখলে এ এক মহাবিপদ শুরু হয়ে গেল।
মিঞাসাহেব বললে–কোথায় যাচ্ছিস তুই? দাঁড়া এখানে। তুই তো নবাবের নোকরি করিস, সফিউল্লা সাহেব তোর কৌন? তুই সফিউল্লা খা’র পা চাটিস কেন? সফিউল্লা তোকে তলব দেয়?
বুড়ো যেন হঠাৎ অনেকদিন পরে একেবারে হাজি আহম্মদকে সামনে পেয়েছে হাতের কাছে। হাতের কাছে পেয়ে তার বিবি চুরির বদলা নিচ্ছে।
মরালী তাঞ্জামের মধ্যে তখন থরথর করে কাঁপছিল। কী করতে গিয়ে কী হয়ে গেল। চকবাজার থেকে পালাতে পারলেই যেন বাঁচে সে। চেহেল্-সুতুনের ভেতরেই যেন তার নিশ্চিন্ত আশ্রয়। অথচ বরকত আলি হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে আর গালাগালিগুলো শুনছে।
ততক্ষণে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। চকবাজার সুষ্ঠু সব লোক এসে ভেঙে পড়েছে দোকানের সামনে৷ বুড়োকে সবাই নিরীহ মানুষ, নেশাখোর মানুষ বলে জানে, সে হঠাৎ কেন চিল্লাচিল্লি করছে তা বুঝতে পারলে না।
কিন্তু ওদিকে আর এক কাণ্ড হল। ওদিক থেকে আর একটা আট-বেহারার তাঞ্জাম আসছিল। সেটা এই ভিড়ের সামনে এসেই হঠাৎ থেমে গেল।
কৌন?
তাঞ্জামের দরজার পাল্লা দুটো ভোলাই ছিল। তার ভেতর থেকে মুখ বাড়িয়ে বেরিয়ে এল নবাব মির্জা মহম্মদের ইয়ার ওমরাহ সফিউল্লা খাঁ।
সবাই তাজ্জব হয়ে গেছে। এ কোন সফিউল্লা সাহেব!
আরে মিঞাসাহেব, এত গালাগালি দিচ্ছ কোন বেল্লিককে?
আরে তুম সফিউল্লা সাহেব?
বুড়ো সারাফত আলিও যেন এতক্ষণে চমকে উঠেছে। তা হলে এতক্ষণ কোন সফিউল্লাকে গালাগালি দিচ্ছিল সে? তারপর বরকত আলিকে দেখে বললে–এই, তোর তাঞ্জামের মধ্যে কোন সফিউল্লা? অ্যাঁ?
সফিউল্লা সাহেব তখন নিজেই মরালীর তাঞ্জামের দরজাটা হাট করে খুলে দিয়েছে।
আরে তুম কোন হো?
মরালীর সমস্ত শরীরই কাঁপছিল। এবার কান দুটোও ঝা ঝা করে উঠল! কেন যে বরকত আলি সফিউল্লা খাঁ সাহেবের নাম করতে গিয়েছিল, আর কে যে সফিউল্লা সাহেব তাও সে জানে না। মাথার ওপর যেন বাজ ভেঙে পড়ল তার।
ততক্ষণে মরালীর হাত ধরে টান দিয়েছে সফিউল্লা সাহেব। একেবারে নরম তুলতুলে হাত। কী যেন সন্দেহ হতেই সফিউল্লা সাহেব মুখ নিচু করে তাঞ্জামের ভেতরে উঁকি দিয়েছে। আশেপাশের ভিড়ের মধ্যে থেকেও অনেকে উঁকি মেরে দেখলে। ভারী কচি মুখখানা।
বরকত আলি হাঁহাঁ করে বাধা দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু ওমরাহ সফিউল্লাকে বাধা দেবার সাহস নেই খোজা বরকত আলির। আর ঠিক সঙ্গে সঙ্গে মরালী চিৎকার করে উঠেছে–ছাড়ো, হাত ছাড়ো–
প্রথমটায় সফিউল্লা একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মুর্শিদাবাদের ফুর্তির স্বাদ একবার পেয়ে যার হাড় পেকে গেছে, সে অত সহজে ছাড়বার পাত্র নয়।
জিজ্ঞেস করলে–কে, ও কৌন, বরকত আলি? কোন সফিউল্লা?
বরকত আলি তখন বোবা! পাথরের মতো সে ঠায় চুপ দাঁড়িয়ে আছে। তার নোকরি তো এবার যাবেই, কিন্তু কোতল থেকে রেহাই পাবে কি না তাই-ই তখন সে ভাবছে।
সফিউল্লা সাহেব আবার হাত ধরতে যেতেই মরালী এক চড় মেরেছে সফিউল্লা সাহেবের গালে।
আর যাবে কোথায়! সফিউল্লা সাহেব চিৎকার করে উঠেছে কোতোয়াল!
মরালীর মনে আছে সে-সব দিনের কথা। সমস্ত মুর্শিদাবাদ যেন একেবারে আনচান করে উঠেছিল। এত বড় দুঃসাহসের কথা তখন কেউ ভাবতেই পারেনি। কল্পনা করতেও ভয় পেয়েছিল। নানিবেগম পাগলের মতো ছুটে এসেছিল মতিঝিলে। বলেছিল–এ কী করলি মা তুই, এমন করে নিজের সর্বনাশ কেন করতে গেলি?
