হরিচরণ দুর্গার দিকে ফিরে বললে–তা তোমরা কোথায় যাবে ঠিক করো আগে, সেইরকম ব্যবস্থা করে দেবে–তবে সাহেব কাশীধামে পৌঁছিয়ে তো দিতে পারবে না। যদি নিজের দেশে ফিরে যেতে চাও তো বলো–
সাহেবও বললে–আমাদের নিজেদেরই তো এখানে দাঁড়াবার জায়গা নেই, আগে ছিল, এখন নবাবের সঙ্গে ওয়ার চলছে–এ-অবস্থায় আমরাই বা তোমাদের কতটুকু সাহায্য করতে পারি
তা বটে! দুর্গাই বা কী বলবে! সব কথা কি খুলে বলা যায় সবাইকে!
সাহেব বললে–তা হলে তোমরা এখন ভাবো–ভেবে বোলো
বলে সাহেব চলে গেল। হরিচরণকে ওদের দেখাশোনা খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে বললে। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন পাশের জাহাজে ছিল। সেখানে যেতেই অ্যাডমিরাল জিজ্ঞেস করলে–তুমি কী ঠিক করলে রবার্ট?
ক্লাইভ বললে–ওদের বলে এসেছি ভাবতে, ভেবে যা ঠিক করে তাই হবে
অ্যাডমিরাল রেগে গেল–আমি ওদের কথা বলছি না, লেট দেম গো টু হেল এখন এগিয়ে যাবে, না এখানেই ক’দিন থেকে ওয়াচ করবে
ক্লাইভ বললে–জাহাজ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ভাল লেট আস গো নিয়ারার
ওয়াটসন বললে–না, জাহাজ নয়, হাঁটা-পথে গিয়ে ওদের অ্যাটাক করা ভাল-
খানিক তর্ক হল। কিন্তু অ্যাডমিরাল ওয়াটসন চাকরিতে বড়, সুতরাং তার কথায় সায় দিতে হল। হাঁটা-পথেই যাবে ইংরেজ ফৌজ। দশ মাইল রাস্তা। সেপাইরা পথের নিশানা জানে। তারাই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। শীতকাল, রাস্তায় কাদা নেই, যেতে কষ্টও হবে না কারও।
ছোট বউরানি ভোরবেলা ডাকলে–দুগ্যা—
কী বউরানি?
তুই বললি না কেন আমরা কেষ্টনগরে যাব, তা হলে এখানে আর এমন করে পড়ে থাকতে হত না—
দুগ্যা বললে–হ্যাঁ, কেষ্টনগরের কথা বলি আর সব জানাজানি হয়ে যাক, তখন?
কিন্তু আমার যে বড় ভয় করছে!
ভয় কীসের সাহেবকে? দুর, সাহেব এমনিতেই জব্দ হয়ে গেছে।
কীসে জব্দ হল?
তোমাকে দেখে!
তোর মরণ। ফের যদি ওকথা বলবি তো আমি এই গঙ্গায় ঝাঁপ দেব বলে রাখছি!
সাহেব কিন্তু সত্যিই ভাল। মাঝে মাঝে হরিচরণকে দিয়ে খবর নেয়। নিজেও আসে। কোনও কষ্ট হচ্ছে কিনা, খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে হচ্ছে কিনা এইসব। পল্টনের দল হেঁটে হেঁটে চলেছে, আর জাহাজগুলো চলেছে গঙ্গার ওপর দিয়ে।
কিন্তু সেদিন সাহেবও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। জাহাজ দাঁড়িয়ে ছিল গঙ্গায় নোঙর বেঁধে, হঠাৎ খবর এল মানিকচাঁদ দু’হাজার ফুট-সোলজার আর দেড় হাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে আগেই কখন বজবজে এসে হাজির হয়েছে টের পায়নি কেউ। হঠাৎ দুমদাম শব্দ পেয়েই দুর্গার ঘুম ভেঙে গেছে। ছোট বউরানিও উঠে বসেছে। উঠে বসে জিজ্ঞেস করলে–ও কীসের শব্দ রে দুগ্যা?
বাইরে ডাঙায় তখন হট্টগোল। সেদিকে উঁকি মেরে দেখে দুর্গা বললে–হরিচরণকে ডাকি
হরিচরণকে আর ডাকতে হল না। তার আগেই সাহেব এসে হাজির। একেবারে পাচ্ছে। পেছনে পেছনে হরিচরণ।
এসেই বললে–লেডিজ, আমাদের বড় বিপদ হয়েছে, জানি না আমাদের কপালে কী আছে। তোমরা যদি কোথাও যেতে চাও, এই হরিচরণ তোমাদের বোটে করে নিয়ে যাবে। আমার সঙ্গে আর দেখা হবে না। উইশ ইউ গুড লাক–
তখন আর ভাববারও সময় নেই ক্লাইভ সাহেবের। মাত্র এই ক’টা সোলজার নিয়ে মানিকচাঁদের সঙ্গে লড়াই করা মানেই তো মারা যাওয়া।
ওদিক থেকে ওয়াটসন চিৎকার করছে–রবার্ট, রবার্ট
আর দাঁড়াতে পারলে না সাহেব। দুর্গা হঠাৎ উঠল। উঠে সাহেবের কাছ থেকে এক হাত দূরে হঠাৎ মাথাটা মেঝের ওপর ঠেকিয়ে গড় করলে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললে–তোমার ভাল হবে সাহেব, তোমার কথা আমাদের অনেকদিন মনে থাকবে
নৌকো ছেড়ে দিলে। হরিচরণও উঠল। মাঝিরা তৈরি ছিল। সেদিকে অত দেখবার সময় নেই ক্লাইভের। মেজর কিলপ্যাট্রিক, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, রবার্ট ক্লাইভ তখন আর এক লড়াইয়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
দূর থেকে কখনও কামানের শব্দ আসছে। ছোট বউরানি বললে–ফিরিঙ্গিটা ভাল লোক, না দুগ্যা, আমাদের তো কিছু করলে না
দুর্গা বললে–করবে কী করে, আমি যে তার আগেই উচাটন করে দিয়েছিলাম, দেখলে না, আমি সামনে গড় হয়ে পেন্নাম করলাম। তার মানেটা কী?
শ্রীনাথ তখন প্রাণপণে বইঠা বেয়ে চলেছে। হরিচরণ ফিরিঙ্গি কোম্পানির সেপাই। সেপাই হলেও ক্লাইভ সাহেব তাকে এই কাজের ভার দিয়েছে। যে-কোনও নিরাপদ জায়গায় এদের পৌঁছে দিয়ে আবার যেমন করে হোক ফৌজের দলে ফিরে যেতে হবে।
কিন্তু তখনও হরিচরণ জানে, না দুর্গাই জানে যে, তাদের জন্যে আরও এক নতুন বিপদ অপেক্ষা করে আছে!
বজবজের ওপারে আলিগড়, আর ওদিকে মকওয়া। দুটো জায়গাতেই দুটো মাটির কেল্লা রয়েছে। নবাবের বজবজের কেল্লার ভেতর থেকে রাজা মানিকচাঁদের সেপাইরা গোলা ছুড়ছে। বড় বড় কামানের গোলা এসে পড়তে লাগল গোরা পল্টনদের সামনে।
কর্নেল ক্লাইভের মাথায় তখন বজ্রাঘাত। আর পেছনে চলে না। অর্ডার দিলে ফরওয়ার্ড মার্চ
শ্রীনাথ তখন প্রাণপণে বইঠা বেয়ে চলেছে। হরিচরণ বললে–আরও জোরে চালাও ছিন্নাথ ফিরিঙ্গিদের আর ভরসা নেই, রাজা মানিকচাঁদ এবার আর ছেড়ে কথা বলবে না, এবার পালাবে এ-তল্লাট ছেড়ে
নৌকোটা যেন তিরের মতো সোঁ সোঁ করে এগিয়ে চলল।
*
সারাফত আলি যথারীতি দোকানে বসে মৌতাতে ঝিমোচ্ছিল। এই ঝিমুনিটাই তার বড় আরামের জিনিস। এই আরামটার জন্যেই সে আগরবাতি জ্বালায়, গড়গড়ায় তামাকের ধোঁয়া টানে। এই আরামের মধ্যেই মনে মনে সে অনেক মতলব আঁটে। তার মনে হয় একদিন চেহেসূতুন গুঁড়ো হয়ে মাটিতে মিশিয়ে ধুলো হয়ে যাবে। হাজি-আহম্মদের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এ-মসনদ চিরকাল এমনি চলবে না। ভাইতে ভাইতে লড়াই শুরু হয়ে গেছে। এবার শওকত জঙ আসছে নবাব হয়ে। শওকত জঙকেও আবার যেতে হবে। তারপর ফিরিঙ্গিরা আসবে, ফিরিঙ্গিরাও যাবে। এমনি করেই দুনিয়াদারি চলবে ইন্তেকাল পর্যন্ত। এই-ই দুনিয়া। কিন্তু তবু সারাফত আলির মনে হয় চোখের সামনে সব ঘটনাটা না দেখতে পারলে যেন তৃপ্তি নেই।
