লোকে গান শুনছে আর তারিফ করছে। বলছে–বাঃ বাঃ বলিহারি–বলিহারি—
কে একজন বললে–ও-গান নয় হে, এবার একটা প্রেমসংগীত গাও তো হে—
লোকটা বললে–একটা খেদের গান গাই শুনুন হুজুর—
তাই গাও—
আবার গান হতে লাগল–
আমি রব না ভব-ভবনে–
শুন হে শিব শ্রবণে ॥
যে নারী করে নাথ হৃদিপদ্মে পদাঘাত
তুমি তারই বশীভূত আমি তা সব কেমনে ॥
রানিবিবি হঠাৎ যেন গম্ভীর হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করলে–ও কে গাইছে ওখানে?
কান্ত বললে–কী জানি, আপনিও যেখানে আমিও সেখানে গানটা থামাতে বলে আসব?
রানিবিবি বললে–না, তুমি জেনে এসো তো লোকটা কে, ওর নাম কী?
কেন, আপনি চেনেন নাকি ওকে?
তুমি জেনেই এসো না—
কান্ত বাইরে যাচ্ছিল, পেছন থেকে রানিবিবি আবার মনে করিয়ে দিলে–নামটা জেনে এসে আমাকে বলবে কিন্তু–
বাইরে তখনও গান হচ্ছে
পতিবক্ষে পদ হানি ও হল না কলঙ্কিনী
মন্দ হল মন্দাকিনী ভক্ত হরিদাস ভনে।
আমি রব না ভব-ভবনে।
তখন গানটা আরও জমে উঠেছে। অশ্বথ গাছতলাটার নীচেয় বেশ গুছিয়ে বসেছে সেপাইরা। আর মধ্যিখানে একটা আধাবয়সি লোক হাত-মুখ নেড়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গান গাইছে। কান্ত সামনে আসতেও যেন লোকটার সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। খানিক পরে গান থামিয়ে লোকটা কান্তর দিকে চাইল।
তোমার নাম কী গো?
লোকটা রসিক খুব। বললে–আমি হরির দাস হুজুর, আমার আবার নাম কী! তাঁর নাম গান করেই তো বেঁচে আছি–
তবু নাম তো একটা আছে, বাপ-মায়ের দেওয়া নাম, আমাদের রানিবিবি জানতে চাইছেন—
রানিবিবি!
রানিবিবির নাম শুনে লোকটার বোধহয় একটু চেতনা হল। বললে–ভেতরে বুঝি রানিবিবিকে নিয়ে লীলেখেলা হচ্ছে? তা ভাল, তা ভাল–আমার নাম উদ্ধব দাস; রানিবিবিকে গিয়ে বলো–
তারপর কথাটা বলেই লোকটা আর একটা গান ধরতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই কোতোয়াল এসে হাজির। কোতোয়ালকে দেখে সেপাই টেপাই যারা ছিল সবাই সসম্ভ্রমে পঁড়িয়ে উঠল।
তুমি আবার এখানে?
বন্দেগি হুজুর, আমি হরির দাস, ভক্ত হরিদাস–আমি আর যাব কোথায় বলুন–অধীনের কি আর যাবার জায়গা আছে?
কথাটা শেষ হবার আগেই কোতোয়াল বললে–ভাগো এখান থেকে, ভাগো–
বলে আর সেদিকে না-চেয়ে সেপাইদের দিকে চাইলে। কান্তকেও একবার দেখলে। তারপর হুকুম হল তখনই রওনা দিতে হবে মুর্শিদাবাদের দিকে। কোতোয়াল সাহেব গম্ভীর স্বভাবের মানুষ। একেবারে যে-কথা সেই কাজ। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পালকিতে ঘেরাটোপ লাগিয়ে দিয়ে সকলকে রওনা করিয়ে দিয়েছিল। আবার পালকি চলতে লাগল রানিবিবিকে নিয়ে। রানিবিবির সঙ্গে তার কথাই হল না, দেখা তো দূরের কথা। শুধু দূর থেকে ভক্ত হরিদাসের গানের কথাগুলো একটু একটু ভেসে আসছে–
পতিবক্ষে পদ হানি ও হল না কলঙ্কিনী
মন্দ হল মন্দাকিনী ভক্ত হরিদাস ভনে।
আমি রব না ভব-ভবনে।
উদ্ধব দাসকে বুঝি ভব-ভবনে রাখাই যায় না। উদ্ধব দাস তাই কেবল এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। গান গায় আর ঘুরে বেড়ায়। রানিবিবির পালকির পেছন পেছন চলতে চলতে কান্ত তখনও কেবল কথাটা ভাবছিল। খানিকক্ষণের জন্যে দেখা। অনেক কথা জানতে চেয়েছিলেন। কান্তর জীবনের। কান্তর কথা বড় মন দিয়ে শুনেছিলেন রানিবিবি। সকলে কি সকলের কথা শোনে নাকি! বিশেষ করে কান্ত তো তার পর। কান্তর দুঃখের কথা শুনে লাভই বা কী হত তারা বলেছিলেন–নামটা জেনে এসে আমাকে বলবে। অথচ বলা হল না। পুরনো সেপাই বদল হয়ে গেছে। এবার কাটোয়ার কোতোয়ালের নতুন সেপাই চলেছে সঙ্গে।
*
চেহেল্-সুতুনের ভেতরে বোরখায় মুখ ঢেকে সব কথাগুলোই মনে পড়ছিল। অথচ এই তো সেদিন। সবে সঙ্গে করে এনেছে রানিবিবিকে, তারই মধ্যে সমস্ত ওলোট পালোট হয়ে গেল। তারই মধ্যে লড়াই। শুরু হল, লড়াই শেষও হয়ে গেল। মসনদ পর্যন্ত বদলি হব হব। কে নবাব হবে কে জানে! এখন তলবটা পেলে হয় শেষপর্যন্ত! কান্ত সেই অল্প-অল্প আলো-ছায়ার ভেতর দিয়ে রানিবিবির কথাই ভাবতে লাগল। কোথায় সেই কাটোয়া আর কোথায় এই মুর্শিদাবাদ। এই পথ দিয়ে কত নবাব কত বেগম ভেতরে এসেছে, আবার ভেতর থেকে বাইরেও গিয়েছে। এই পথ দিয়েই মুর্শিদকুলি খাঁ এসেছে একদিন এইখানে। এইখানে দাঁড়িয়েই রাজবল্লভ সেন ঘসেটি বেগমের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছে। কাটোয়ায় ভাস্কর পণ্ডিতকে খুন করে এইখান দিয়েই আলিবর্দি খাঁ এই হারেমে ঢুকেছে। দেখতে দেখতে কান্তর চোখের সামনে দিদিমার কাছে শোনা গল্পগুলো যেন আবার দেখতে পেল। আবার ঘনিয়ে এল সেই সব রাত, সেই সব দিন, সেই সব কাল। একদিনের মধ্যে সব ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল। মনে হল এখনও যেন এখানে-ওখানে নবাবের রক্ত লেগে রয়েছে। কোথায় গেল সেই হোসেন কুলি খাঁ, কোথায় গেল সেই আলিবর্দি খাঁ। ইতিহাসের পাখায় চড়ে যেন সবাই আবার ফিরে আসতে লাগল উড়ে উড়ে। দিদিমা সব জানত। দিদিমার কথাই যেন সত্যি হল। যেন পায়ের তলার শব মাড়িয়ে সে ইতিহাসের সিংহদ্বারে এসে দাঁড়িয়েছে আজ। আজ যদি মসনদই নেই, আজ যার জন্যে এখানে রানিবিবিকে আনা সেই নবাবই যখন নেই, তখন কেন রানিবিবি এখানে থাকবে? কোথাকার কোন খোরাসান, কান্দাহার, চট্টগ্রাম থেকে। আনা বেগমরা যেন এতদিন পরে ইতিহাসের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়েছে। একসঙ্গে সবাই বুঝি তাই হেসে উঠেছে। মুক্তির হাসি, আনন্দের হাসি, স্বাচ্ছন্দ্যের হাসি। কান্ত সেইখানে বসেই ইতিহাসের অমোঘ বাণী যেন শুনতে লাগল।
