কথা বলতে বলতে কর্নেল ক্লাইভ নিজেকে আবার হঠাৎ সামলে নেয়। বেশি বললে–আবার ওরা অন্যরকম ভাববে। ইন্ডিয়ায় সার্ভিস করতে এসে নিজের অফিসারকে আর চটাবে না আগেকার মতো! সবাই সেলফিশ! সবাই ডেঞ্জারাস। একসঙ্গে এক জাহাজে যাদের সঙ্গে খায়দায়-ঘুমোয় তাদেরও যেন হেট করতে ইচ্ছে করে ক্লাইভের। যাদের জন্যে ক্লাইভ এত কিছু করল তারা তার কী উপকার করেছে। আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে কখন তন্দ্রা আসে, আর চোখ দুটো বুজে আসে। স্বপ্ন দেখে, ইংলন্ডের লোকেরা তার গলায় ফুলের গারল্যান্ড পরিয়ে দিচ্ছে, তাকে পার্লামেন্টের মেম্বার করে নিচ্ছে। স্বপ্ন দেখে, ইংলন্ডের লোকেরা বলছে–হিয়ার ইজ এ হিরো, হিয়ার ইজ এ কম্যান্ডার
কিন্তু স্বপ্নটা ভেঙে গেলেই আবার যে-কে-সেই। নিজের কান্ট্রির ওপর আবার ঘেন্না হয়। তার চেয়ে এরা অনেক ভাল। এই ইন্ডিয়ানরা। এরা ভয়ে ভাল করে কথা বলে না বটে, কিন্তু ইংলন্ডের লোকদের মতো নয়। বড় সরল, বড় বোকা। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বললেও মনের কথা চেপে রাখতে পারে না ওরা। সব বলে দেয়। বলে–আপনারা হুজুর বড় ভাল লোক আপনারা হুজুর আমাদের সঙ্গে বেশ ভাল করে কথা বলেন।
ক্লাইভ জিজ্ঞেস করে–কেন, নবাবের লোকরা ভাল করে কথা বলে না?
না হুজুর, তবে আর আমাদের দুঃখটা কীসের? তারা আমাদের কাফের বলে। আমাদের কলমা পড়িয়ে মুসলমান করতে চায়। আপনারা যদ্দিন কলকাতায় ছিলেন তদ্দিন লোকে কত সুখ্যাত করেছে আপনাদের! আপনারা চলে যাবার পর আবার সেখানে যে-কে-সেই!
তোমরা কি চাও আমরা আবার আসি?
লোকেরা বলে–নবাবের সঙ্গে আপনারা পারবেন কী করে আপনাদের কি আর অত ফৌজ আছে?
সে তোমাদের ভাবতে হবে না, বেশি ফৌজ থাকলেই লড়াইতে জেতা যায় না, তোমরা যদি আমাদের দিকে থাকে তা হলেই আমরা জিতব।
লোকগুলো বেশ ঘরোয়া হয়ে গিয়েছিল ক’দিনেই। ক্লাইভকে খেজুররস খাওয়াত, আসকে পিঠে-পুলি খাওয়াত। ক’দিনেই বেশ জমিয়ে নিয়েছিল গাঁয়ের লোকদের সঙ্গে। শেষকালে ঠিক যাবার আগের দিনই ওই কাণ্ডটা ঘটল। বেশ মুশকিলে পড়ল ক্লাইভ সাহেব। দু’জন লেডি, তাদের নিয়ে কী করবে!
তা এদের এখেনে ধরে নিয়ে এলি কী জন্যে? হোয়াই?
সেপাইদেরও দোষ নেই। এরকম তারা করে থাকে বরাবর। নবাবের ফৌজি সেপাইরা মেয়েছেলে পেলে ধরে নিয়ে এসে মিরবকশিকে উপহার দেয়। এইসব দিয়েই তো চাকরিতে উন্নতি হয়। এই-ই তো রেওয়াজ!
অ্যাডমিরাল ওয়াটসন বললে–এই নিগার মেয়েদের নিয়ে এখন কী করবে তুমি?
ক্লাইভ বললে–কিন্তু এদের কার কাছে ছেড়ে দেব?
ওয়াটসন বললে–সেই কথা নিয়ে এখন মাথা ঘামাবে নাকি তুমি?
কিন্তু এদের কে দেখবে? চেহারা দেখে মনে হয় খুব রেসপেক্টবল ফ্যামিলির ওয়াইফ। আর ওটা তার মেঙ-সারভেন্ট। দেখি, আমি ওদের কী করতে পারি–
বলে সেই রাত্রেই ক্লাইভ লেডি দু’জনের কাছে গেল। লেডি দু’জন তখন শীতে কাঁপছে। সঙ্গে সেই সেপাইটাও রয়েছে। সে বাংলা কথা বুঝিয়ে দিতে পারবে।
সেই যে রাত্রে ধরে এনেছে, তখন থেকে ছোট বউরানি দুর্গার কোল ঘেঁষে বসে আছে। একে গঙ্গার ঠান্ডা হাওয়া, তার ওপর ফিরিঙ্গিদের জাহাজ। ম্লেচ্ছ। জীবনে কখনও দুর্গা এমন কাণ্ডর মধ্যে পড়েনি। ছোট বউরানিও না। সেপাই হরিচরণ বারবার বুঝিয়েছে তোমাদের কিছু ভয় নেই গো, আমাদের কর্নেলসাহেব খুব ভাল লোক।
দুর্গা বলেছে তুমি তো বলছ বাছা, কিন্তু ওরা তো ম্লেচ্ছ, গোরু খায়, ওরা কী করে ভাল লোক হবে?
হরিচরণ বলেছে গোরু খেলেই কি আর খারাপ লোক হয়, দেখবে তোমাদের কোনও ক্ষেতি হবে
দুর্গা বলেছে–দেখো বাপু, তোমাদের সাহেব আমাদের যেন ছুঁয়ে দেয় না, তা হলে আমাদের জাত যাবে
কিন্তু সাহেব যখন এল তখন দুর্গা একগলা ঘোমটা দিয়ে দিলে। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে যতটা দেখা যায় চেয়ে দেখলে সাহেবের মুখের দিকে। লাল টকটকে মুখখানা। মুখময় যেন ঘামাচি ভরতি। দেখে দুর্গা যে দুর্গা, তারও বুকটা ঢিপঢিপ করে উঠল।
সাহেব বললে–আমার সেপাইরা তোমাদের ভুল করে ধরে এনেছে, ভেবেছে ফ্রেঞ্চ বোট–তা তোমরা কোথায় যাবে বলল, আমি তোমাদের সেখানেই পাঠিয়ে দিচ্ছি–বলো কোথায় যাবে?
দুর্গা বললে–আমরা কাশীধামে যাচ্ছিলাম, সেইখানেই যাব—
কাশী? কাশীধাম? সে কোথায়?
হরিচরণ বললে–সে উত্তরে, সে অনেক দূর হুজুর, ছ’মাসের পথ
সাহেব বললে–কিন্তু অত দূরে তোমরা দু’জন লেডি যাবেই বা কী করে? তোমাদের সঙ্গে কেউ নেই?
দুর্গা বললে–আমাদের সঙ্গে তো আমাদের বিশ্বাসী পাহারাদার ছিল, তার কাছে বন্দুক ছিল সে তো গুলি খেয়ে মরে গেছে, আর মাঝিরা কোথায় গেছে জানি না
সাহেব বললে–মাঝিদের আমরা ধরে রেখেছি পাছে তারা ভয় পেয়ে তোমাদের ছেড়ে পালিয়ে যায়; কিন্তু সঙ্গে তোমাদের নিজেদের কোনও পুরুষ নেই? এই লেডির হাজব্যান্ড কোথায়?
হরিচরণ সব বুঝিয়ে দিলে সাহেবকে। দুর্গার কাছে সবই শুনে নিয়েছিল সে। মহিলাটির হাজব্যান্ড হুজুর পাগলাটে মানুষ। বিয়ে হবার পর থেকেই সে নিরুদ্দেশ। সে হল পোয়েট। বাংলাদেশে তো জাতকুল মিলিয়ে বিয়ে দিতে হয়, তাই ওইরকম পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল এঁর। ইনি বড় দুঃখী সাহেব, এরা বাবা বিশ্বনাথের চরণে আশ্রয় নেবার জন্যে যাচ্ছিল, হঠাৎ পথের মধ্যে এই বিপদ!
