আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম কর্নেল ফ্রেঞ্চ বোট। আমরা বন্দুক ফায়ার করতেই ওরাও ফায়ার করলে। তখন বোটটাকে আমরা ক্যাপচার করে দেখি বোটের ভেতরে এই দু’জন লেডি!
লেডি দু’জন তখন ঘোমটা দিয়ে জাহাজের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে।
তোমরা কে? কারা তোমরা? হু আর ইউ?
একজন সেপাই ভাল করে বাংলা করে বুঝিয়ে দিলে। একজন লেডি তো তখন থরথর করে। কাঁপছে। পাশের মেয়েমানুষটার সাহস হয়তো একটু বেশি। সে বললে–হুজুর, আমরা নবাবের কেউ নই, আমরা হিন্দু
তোমরা রাত্তিরে কোথায় যাচ্ছ?
হুজুর কাশীধামে! বাবা বিশ্বনাথ দর্শন করতে!
তোমরা কাদের লোক? নাম কী তোমাদের?
হুজুর, আমার নাম দুগ্যা! আমি এঁর দাসী। ইনি হাতিয়াগড়ের জমিদার ছোটমশাইয়ের নফরের মেয়ে। নফর শোভারাম বিশ্বাস। ইনি তারই মেয়ে–শ্ৰীমতী মরালীবালা দাসি–
ঘোমটার ভেতর ছোট বউরানি তখন ভয়ে ঘেমে নেয়ে উঠে একেবারে মূৰ্ছা যাবার জোগাড়।
*
সংসারে এক-একটা মানুষ জন্মায় যারা ঠিক ইতিহাসের মতো। এক-একটা শতাব্দী পার হয়ে যায়, হঠাৎ এমনি এক-একটা মানুষের সাক্ষাৎ মেলে। ইতিহাসের মতোই তারা কাউকে পরোয়া করতে জানে না। সংসার তাদের অবহেলা করে, সমাজ তাদের তাচ্ছিল্য করে, আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধব তাদের নিরুৎসাহ করে, তবু সেই প্রতিকূল ভাগ্যকে অস্বীকার করে তারা অমোঘ ভবিতব্যের দিকে এগিয়ে চলে।
এমনি একজন মানুষ এই লেফটেন্যান্ট কর্নেল ক্লাইভ।
নিজের দেশে তাকে কেউ সম্মান দিলে না। নিজের দলের লোকও কেউ তাকে শ্রদ্ধা করলে না। অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সঙ্গে রোজই খিটিমিটি বাধতে লাগল। তবু রবার্টের গো, বাংলার। সুবাদার নবাবের অত্যাচার সে বন্ধ করবেই।
যারা দিশি সেপাই তারা নৌকো করে অনেক দূরে চলে যায়। গিয়ে লোকের সঙ্গে কথা বলে, মেলামেশা করে। তাদের মনের কথাগুলো জানবার চেষ্টা করে। তারা কি ফিরিঙ্গিদের চায়, না নবাবকে চায়! গাঁয়ের লোকের বাড়িতে গিয়ে হুঁকো নিয়ে তামাক খেতে খেতে গল্প করে।
গাঁয়ের লোকেরা বলে–আমরা হলুম উলুখড় গো, সেপাইমশাই, আমাদের কাছে ফিরিঙ্গিরাও যা, ও নবাবও তাই
সেপাইরা বলে–তা এই যে তোমরা উপোস করছ, নবাব তোমাদের খেতে দিচ্ছে? নবাব তোমাদের কথা ভাবছে? নবাব তো মতিঝিলের ভেতরে বসে বসে ফুর্তি করছে বেগমদের নিয়ে–
তা ফিরিঙ্গিরাও পয়সা হলেই ফুর্তি করবে। পয়সা হবার পর কে আর গরিবগুরবোদের কথা ভাবে বলো? আমরা বড়লোক হলে আমরাই কি আর তা ভাবব?
সেপাইরা তবু বোঝায়।
বলে–এই আমাদের দেখো না, ফিরিঙ্গিদের পল্টনে নাম লেখাবার আগে আমরাও তোমাদের মতো ভাবতুম, তারপর এখন দলে ঢুকে দেখছি অন্যরকম
কী রকম দেখছ শুনি?
আরে, এ তোমাদের নবাবের পল্টনের মতন নয়। এখানে এরা ভাল খেতে-পরতে দেয়, ভাল করে কথা বলে, ভাল মাইনে দেয়। দেখছ না, খেয়েদেয়ে কী রকম খোদার খাসি হয়েছি–
এইরকম ঘুরে ঘুরে দেখে এসে সবাই রিপোর্ট দেয় রবার্ট ক্লাইভকে, ক্লাইভ সব মন দিয়ে শোনে।
জিজ্ঞেস করে সবাই অ্যান্টিনবাব, সবাই নবাবের বিরুদ্ধে?
হ্যাঁ হুজুর, সবাই চায় ফিরিঙ্গিরা ফিরে আসুক। সবাই সেপাইয়ের দলে নাম লেখাতে চায়!
কেন চায়?
চায় এইজন্যে যে এখানে নাম লেখালে তাদের ভাল হবে। তারা পেট ভরে খেতে পাবে।
এখন খেতে পায় না?
এখন খেতে পাবে কী করে হুজুর, নবাব মারে জমিদারদের, জমিদার মারে প্রজাদের। কারও ঘরে ফসল উঠতে দেখলে ডিহিদারের নজর পড়ে, তারপর হুজুর মুসলমান প্রজা হলে সাত খুন মাফ, আর কাফের হলে তার আর রক্ষে নেই।
অ্যাডমিরাল ওয়াটসন আর রবার্ট ক্লাইভ দু’জনেই মন দিয়ে সব কথা শোনে। ওয়াটসন যুদ্ধ করতে এসেছে, এত কথা শুনে কী লাভ বুঝতে পারে না। জিজ্ঞেস করে–এসব কথা নিয়ে আমাদের কী দরকার, নবাবের ফৌজ কোথায় গেল সব খবর জানলেই তো যথেষ্ট!
কিন্তু কর্নেল ক্লাইভ বলে-না
সত্যিই, ছেলেটা সেই যুগেই বুঝে নিয়েছিল যে লড়াই করতে গেলে শুধু ফৌজের খবর নিলেই চলবে না। সেখানকার মানুষের মতিগতির খবরও নিতে হবে। সেখানকার মানুষের সুখ-দুঃখের খবর। নিতে হবে।
কর্নেল ক্লাইভ জাহাজের ওপরে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে দেশটাকে দেখে। শীতকালের দিনেরবেলায় বেশ আরাম দেয় রোদটা। বরফের দেশের লোক গায়ের জামা খুলে রোদ পোয়ায়। রাত্রে আবার কনকনে শীতের ঠান্ডা। জাহাজ থেকে নেমে হেঁটে গিয়ে গাঁয়ের মধ্যে চলে যায়। ফিরিঙ্গি দেখে ছেলে-বুড়ো সবাই পালায়। তবু সাহেব হতাশ হয় না। লোকগুলোর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন সাবধান করে দিয়েছিল খুব কেয়ারফুল রবার্ট, ওরা সাউথ-ইন্ডিয়ান নয়, ওরা বেঙ্গলি, ওরা ভেরি ডেঞ্জারাস
ভেরি ডেঞ্জারাস মানে?
মানে, ওরা ভেরি ডিজ-অনেস্ট! ওরা লায়ার, আনফেথফুল
ক্লাইভ বললে–কিন্তু ডেঞ্জারাস হোক আর আনফেথফুলই হোক, ওদের নিয়েই আমাকে চলতে হবে, ওদেরই তো কান্ট্রি এটা, আমরা তো ফরেনার!
তারপর বললে–না অ্যাডমিরাল, আমার কিন্তু খুব ভাল লাগে, আই লাইক দেম—
কী রকম, তুমি কি ওদের সঙ্গে মেশো নাকি? ওরা যে ভয়ানক পাজি!
ক্লাইভ বলে–তা আমাদের কান্ট্রির লোকেরাই কী কম পাজি! আমাদের কান্ট্রির লোকরাই কি আমার সঙ্গে কম ডিজ-অনেস্টি করেছে? আমাকে কি তারা কম হেট করেছে? তা না হলে সাধ করে কি আমি আবার পালিয়ে এসেছি ইন্ডিয়াতে?
