বললে–তোমাকে যে কী মানান মানাচ্ছে ভাই, কী বলব–এসো তুমি
সেই অন্ধকার রাত্রে চেহেল্-সুতুনের চোরা ফটক দিয়ে বেরোল বরকত আলি আর আর-একজন ওমরাহ সফিউল্লা খাঁ সাহেব। পেছনে কোন মহলে তখন গুলসন বেগমের গলায় একটা নতুন ঠুংরির সুর ভেসে আসছে–
যো হোনেকা থি, উও তো হো গয়ি
আভি উসকো ক্যা পরোয়া…
মোটা মোটা খিলেন। মুরশিদকুলি খাঁর আমলের ইটের তৈরি। পায়ের তলাতেও ইট বাঁধানো সড়ক। নতুন নাগরা জুতোর তলায় ইটগুলো যেন কথা কয়ে উঠল। তারাও যেন বলতে লাগল যে হোনেকা থি, উও তো হো গয়ি, আভি উসকো ক্যা পরোয়া
বাইরের খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়েও মরালীর মনে হলসমস্ত আকাশ বাতাস–অন্তরীক্ষ সবাই যেন একসঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইছে–যো হোনেকা থি, উও তো হো গয়ি, আভি উসকো ক্যা পরোয়া–
তাঞ্জামের ফটকটা খুলে হঠাৎ মরালী বরকত আলিকে ডাকলে।
ও গানটার মানে কী বরকত আলি?
কোন গানটার বেগমসাহেবা?
ওই যে গুলসন বেগমসাহেবা চেহেল্-সুতুনের ভেতরে গাইছিল। যো হোনেকা থি, উও তো হো গয়ি, আভি উসকো ক্যা পরোয়া
বরকত আলি বললে–ওর মতলব হচ্ছে বেগমসাহেবা, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে আর কেন ভেবে। মরছ, ও তো হয়েই গেছে, ও নিয়ে ভেবে তো কোনও লাভ নেই–
মরালীরও মনে হল–সত্যিই লাভ নেই। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে কেন ভেবে মরছি, ও তো হয়েই গেছে, ও নিয়ে ভেবে তো কোনও লাভ নেই!
তাঞ্জামটা চারটে বেহারার কাঁধে চকবাজার দিয়ে হুমহুম করে এগিয়ে চলতে লাগল।
*
এ এক বিচিত্র দেশ। এই বেঙ্গল! রবার্ট ক্লাইভ এ-দেশে আগে কখনও আসেনি। ম্যাড্রাস দেখেছে, আর্কট দেখেছে, ত্রিচনাপল্লি দেখেছে, কাঞ্চিপুরম দেখেছে। কিন্তু এ অন্যরকম। এখানকার রোগা-রোগা কালো কালো মানুষগুলো ফিরিঙ্গিদের দিকে কেমন রেসপেক্ট-মেশানো দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে দেখে। ভিলেজের লোকগুলো দিনেরবেলায় লুকিয়ে থাকে। কিন্তু সন্ধের পর তখন আর তাদের ভয় থাকে না। লুকিয়ে লুকিয়ে চাল-ডাল বিক্রি করে যায় জাহাজের কাছে এসে।
ফলতার খাঁড়ির মুখে অনেকদিন কাটল। শেষে আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে রাজি হল না কেউ। রবার্ট ক্লাইভ একদিন অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে বললে–দিস ইজ টেরিব–আমি আর ওয়েট করতে পারব না–উই মাস্ট অ্যাটাক হুগলি ফোর্ট
কটা লড়াইতে জিতে ক্লাইভ সাহেব তখন বেঙ্গলের ব্যাটল ফিল্ডে নিজের ক্ষমতা দেখাবার জন্যে ছটফট করছে।
তারপর একদিন দলবল নিয়ে ফিরিঙ্গিদের কটা জাহাজ এসে হাজির হল এই এখানে।
ক্লাইভ বাইরে মুখ বাড়িয়ে চারদিকে দেখে জিজ্ঞেস করলে–এ-জায়গাটার নাম কী?
অ্যাডমিরাল ওয়াটসন বললে–বজবজ
এখান থেকে হুগলি কতদূর আর?
তা দূরই হোক আর যাই হোক, সুপশায়ারের সেই বখাটে ছেলেটার যেন কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ নেই। বললে–আরও এগিয়ে চলো, লেট আস গো নিয়ারার
নিয়ারার মানে কোথায়? আছে, আর একটা জায়গা আছে কাছাকাছি। তার নাম মায়াপুর। মায়াপুর পর্যন্ত তো যাওয়া যাক, তার পরের কথা পরে ভাবলেই হবে।
বেশ জংলা-জংলা জায়গাটা। জাহাজগুলো এসে থামল সেখানে। দলের নৌকোগুলো হুগলি-রিভারের ভেতরে অনেক দূর দূর গিয়ে টহল দিয়ে আসে। দেখে আসে কোথায় কাছাকাছি নবাবের ফৌজ আছে। আর ওয়াটসন সেখান থেকে রাজা মানিকচাঁদের চিঠির জন্যে হাঁ করে অপেক্ষা করে বসে থাকে। চোখে দূরবিন লাগিয়ে দেখে দূরের ভিলেজগুলোর দিকে। নবাবি-ফৌজ কতদূরে!
চারদিকে বেরিয়ে যায় নৌকোগুলো।
কোনওটা পুব দিকে, কোনওটা দক্ষিণে। সারারাত টহল দেয়, আশেপাশের গাঁ থেকে প্রভিশনস কিনে আনে। না পেলে লুঠপাট করে আনে। মুরগি, ভেড়া, গোরু। ওয়ারের সময় অত নিয়ম মানতে গেলে চলে না। দ্যাট ব্ল্যাক নিগার অব এ প্রিন্স! তাকে একটা লেসন দিতে হবে। ক্লাইভের সোনালি রক্ত ভাবতে ভাবতেই গরম হয়ে ওঠে। বলে–লেট আস গো নিয়ারার
নিয়ারার মানে কোথায়? আছে, আর একটা জায়গা আছে কাছাকাছি। কিন্তু অত দূরে যাওয়া কি সেফ? রাজা মানিকচাঁদের হাতে তৈরি আছে, দু’হাজার ফুট-সোলজার আর পনেরোশো ঘোড়া। যে-কোনও মোমেন্টে রাজা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আমাদের ওপর।
নৌকোগুলো রাত্রে বেরিয়ে যায়, আর ভোররাত্রেই ফিরে আসে। খবর নিয়ে আসে কোথায় কতদূরে রাজা মানিকচাঁদ।
দিনের পর দিন যায়, রাতের পর রাত। চারখানা চিঠি দেবার পরও কোনও উত্তর আসে না নবাবের কাছ থেকে। সমস্ত ইন্ডিয়ার ইস্ট কোস্ট জয় করে এসে এই সাউথ বেঙ্গলে এসে হেরে যাবে নাকি ফোর্ট সেন্ট ডেভিডের কম্যান্ডার?
ক্লাইভ আবার বললে–লেট আস গো নিয়ারার
কিন্তু সেদিনই রাত্তিরে জাহাজের ঘরে ধাক্কা পড়ল। কে? কে? কে?
তড়াক করে লাফিয়ে উঠেছে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ক্লাইভ। বন্দুকটা পাশেই থাকে বরাবর, সেটা হাতে নিয়ে সামনে বেরিয়ে এসেছে। মেজর কিলপ্যাট্রিক, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন সবাই-ই উঠে পড়েছে। কিন্তু কোথাও তো সাড়াশব্দ নেই, ফায়ারিং হচ্ছে না কোথাও। হোয়াটস্ আপ? কী হল?
কর্নেল, দু’জন লেডিকে ধরে এনেছে সেপাইরা।
দু’জন লেডি?
হ্যাঁ কর্নেল, দু’জন লেডি!
স্পাই নাকি? ফিমেল স্পাই? স্ট্রেঞ্জ! ভেরি স্ট্রেঞ্জ! এ-দেশে ফিমেল স্পাইও আছে নাকি নবাবের আর্মিতে!
নৌকো করে নেভির যে-লোকরা টহল দিতে বেরিয়েছিল তারা তখন দু’জন মেয়েমানুষকে ধরে এনে জাহাজে তুলে ফেলেছে।
