বশির মিঞা ভাবতে ভাবতে আবার নিজের হাবেলির দিকে চলতে লাগল। এমন তো হয় না। সত্যিই বড় তাজ্জব ব্যাপার!
২.০৬ হাতিয়াগড় থেকে ফিরে
কান্ত সত্যিই জানত না বশির মিঞা এত তাড়াতাড়ি হাতিয়াগড় থেকে ফিরে আসবে। আর জানলেও কিছু করবার ক্ষমতা ছিল না তার তখন। তখন যে কোথা দিয়ে কান্তর সময় কেটে গিয়েছিল তাও জানতে পারেনি। চেহেল্-সুতুনের ভেতরে সময় বলে যেন কিছু নেই। সময় যেন চেহেল্-সুতুনের মতোই সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর নড়তে চায় না।
আর কান্তও জানত না যে আবার তাকে যেতে হবে চেহেল্-সুতুনের ভেতরে।
সমস্ত চেহেল্-সুতুন জুড়ে তখন আবার শান্তি নেমে এসেছে। নবাব মির্জা মহম্মদ নেই। পিরালি খাঁ নজর মহম্মদ, বরকত আলিরা আবার মাথা চাড়া দিয়ে নবাবি করছে। নবাব মুর্শিদাবাদে না থাকলে যেন
নানিবেগমও কেউ নয়। নানিবেগম চেহেল-সুতুনে শুধু থাকে, এই পর্যন্ত। তার বেশি কিছু নয়। আমিনা বেগম কোনওদিনই মির্জাকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি। ছেলেকে বিয়েই মা খালাস! তখন থেকেই এই চেহেল সুতুনে বড় হয়েছে মির্জা। ছোট ছেলে এক্রামুদ্দৌলা ছিল, তাকেও পুষ্যি নিয়েছিল দিদি। দিদি ঘসেটি বেগম তখন অনেক টাকার মালিক। তখন থেকেই কথা শোনাত।
বলত তুই তোর ছেলেকে শাসন করতে পারিস না?
আমিনা বলত–আমি শাসন করব? ও কি আমার ছেলে?
ন্যাকামি রাখ, শাসন করতে না পারিস তত আমার ওপর ভার দে, আমি ওকে শায়েস্তা করে দিচ্ছি
আমিনা বলত না দিদি, একটু বয়েস হোক, বয়েস হলেই সেয়ানা হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু ওর ওপর তোমার এত বিষনজর কেন বলো তো?
যখনই ঘসেটি, আমিনা, ময়মানা মুর্শিদাবাদে আসত তখনই মির্জাকে নিয়ে ঝগড়া লাগত তিন বোনে। নবাব আলিবর্দি তখন বেঁচে। তার কানে কথাটা যেতেই তিনি মির্জাকে কাছে ডাকতেন। বলতেন–দুনিয়াটাই এইরকম রে মির্জা, তোকে নবাবি দেব বলে তোর ওপরে ওদের এত রাগ–
সেই মির্জা বড় হল। সেই মির্জার বিয়ে হল। তখন মির্জার বয়েস পনেরো বছর। সেই তখনই হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই এসেছেন দ্বিতীয় পক্ষের রানিকে নিয়ে। গরিবের ঘরের মেয়ে রাসমণি। কখনও মুর্শিদাবাদ দেখেনি। বড় বউরানি বারণ করেছিলেন, কিন্তু ছোট বউরানির আবদার এড়াতে পারেননি। সেখানেই নজরে পড়ে গেল মেহেদি নেসারের।
পেশমন বেগমের ঘরে বসে মরালী এইসব গল্পই বলছিল।
পেশমন জিজ্ঞেস করলে তা তোমার সোয়ামি কিছু বললে–না?
বলবে আবার কী! আমি তো কিছুই জানতুম না। আমার স্বামীও কিছু জানতেন না।
তারপর একটু থেমে মরালী জিজ্ঞেস করলে তা তুমি এখানে কী করে এলে?
আমি ভাই বাইজির লেড়কি! আমার মা দিল্লির বাদশার দরবারে নাচগান করত, আমি সঙ্গে সঙ্গে থাকতুম। ওইসব দেখে আমিও নাচতে শিখলুম গান গাইতে শিখলুম। তারপর মুজরো নিয়ে গান গেয়ে বেড়াতুম, শেষকালে এই নবাবের বিয়ের সময় এখানে এলুম মুজররা নিয়ে, সে ভাই আজ এগারো-বারো বছরের কথা, তারপর থেকেই এখেনে–
তোমারই বুঝি অসুখ হয়েছিল?
পেশমন বললে–তোমাকে কে বললে?
প্রথম যখন এখানে এসেছিলাম তখন কান্নার শব্দ শুনতাম কিনা, তাই গুলসনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, গুলসনই বলেছিল তোমার কথা! তা এখন সেরে গেছে তো সব?
পেশমন যেন কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে গেল। বললে–এ রোগ ভাই সারে না
কেন, চিকিৎসা করলেও সারবে না?
এ কী করে সারবে। এ যে মালেখুল্লিয়া দিমাগি!
সে আবার কী রোগ?
এ এইসব জায়গাতেই বেশি হয়। নবাববাদশাদের এসব রোগ থাকে। সারারাত ধরে নাচ-গান করার পর খুব মদটদ খেলে তখন কি আর শরীরের কিছু থাকে! এ আর সারবে না
এ রোগ অন্য কারও আছে?
কত বাঁদির আছে, কত বেগমের আছে। আমি দিল্লির বাদশার হারেমের মধ্যেও তো গিয়েছি, থেকেছি, সেখানেও আছে–
সবাই তোমার মতন ভোগে?
ভোগে বই কী! ভুগে ভুগে মরে যায়। আমিও ভাই আর বেশিদিন বাঁচব না–
তা ওষুধ খাও না কেন কবিরাজের, হেকিমের।
খাই, আরক খাই। সারাফত আলির আরক খাই, তাইতেই একটু কম থাকে।
মরালী বললে–আমি সারাফত আলির নাম শুনেছি ওই নজর মহম্মদের কাছে। দেখিনি কখনও আমিই কি দেখেছি। ও এসে আমাকেও মাঝে মাঝে বলে কিনা
কী বলে?
আরক খেতে বলে। বলে, আরক খেলে তবিয়ত ভাল থাকে—
পেশমন হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে আর কিছু বলে না?
আর কী বলবে?
আরও কিছুদিন থাকো এখানে, দেখবে তোমার ঘরে বাইরের লোক এনে দেবে। বাইরের লোক এনে দিলে ওরা অনেক টাকা পায়। ওদের অনেক টাকা। ওরা খোঁজাগিরি করে, কিন্তু ওরা আমাদের কিনতে পারে–
অত টাকা নিয়ে ওরা কী করে?
টাকা থাকলে সবকিছু করা যায়। টাকাই তো সব ভাই দুনিয়ায়।
কী করে অত টাকা উপায় করে?
কারবার করে। মহাজনি কারবার করে। সোরা রেশম ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে বেচা-কেনা করে।
কিন্তু সবাই তো খেতে-পরতে পাচ্ছে এখানে, তা হলে কেন এত টাকা-টাকা করে?
পেশমন বললে–বাঃ, এখন তো খেতে-পরতে পাচ্ছি, কিন্তু চিরকাল খেতে-পরতে পাব তার কি কোনও ঠিক-ঠিকানা আছে? লড়াই করতে গিয়ে যদি নবাব মারা যায় তো তখন কী হবে?
তখন যে নবাব হবে সেই খাওয়াবে?
তা কি বলা যায়? তখন যারা জওয়ান মেয়ে তাদের না হয় রাখবে, কিন্তু বুড়োহাবড়াদের? তাদের যদি লাথি মেরে তাড়িয়ে দেয়? তোমার এখন কম বয়েস, তোমাকে এখন নানিবেগম খুব খাতির করছে, সাজাচ্ছে-গোজাচ্ছে। বুড়ো হয়ে গেলে তোমাকে আর দেখবে ভেবেছ? আমাকেও তো প্রথম প্রথম খুব সাজাত গোজাত, নবাবের সামনে এগিয়ে দিত, যাতে নবাবের মন ভোলে, কিন্তু এখন? এখন যে আমি এত ভুগছি, আমার দিকে চেয়ে দেখে কেউ?-
