এবার হাতিয়াগড়ের রাজার পালা এসেছে।
জনার্দনটা উজবুগ। শালার না আছে বুদ্ধি না আছে দিমাগ। শুধু নিজের সংসারের কথা ভাবতে ভাবতেই হয়রান হয়ে গেল। অত যদি মেয়েদের কথাই ভাববি তা হলে নোকরি করতে এসেছিলি কেন? নোকরিতে যদি উন্নতি করতে চাস তো নোকরির কথাই ভাব কেবল। কীসে ডিহিদার রেজা আলি খুশি থাকে সেই চেষ্টা কর। তা নয়, কেবল মেয়ে মেয়ে আর মেয়ে।
শেষপর্যন্ত লোক হাসিয়ে গেল জনার্দনটা। বেটা জান দিয়ে দিলে নোকরি করতে এসে। সাধে কি বেটাকে উজবুগ বলি!
শেষকালে এল বশির মিঞা। কানুনগো কাছারির মনসুর আলি মেহের সাহেবের রিস্তাদার। মুর্শিদাবাদের নিজামতি-চর। পাকা লোক। সব খবরাখবর মন দিয়ে শুনলে। তারপর বললে–কুছ পরোয়া নেই, আমি এর ফয়সালা করে দেব
রেজা আলি জিজ্ঞেস করেছিল–ঠিক পারবি তো রে? তোকেও জনার্দনটার মতো বাণ মেরে দেবে না তো আবার?
বশির মিঞা বলেছিল–কী বলছেন আপনি ডিহিদার সাহাব, এ যদি না ফয়সালা করতে পারি তো নোকরিই ছেড়ে দেব
দেখ তা হলে, কোশিস করে দেখ! ওদের বাড়িতে যে নোকরানিটা আছে, ওটাই আসলি হারামজাদি! ওকে কবজা করতে পারবি?
খুব পারব খাঁ সাহেব, খুব পারব। মেহেদি নেসার সাহেব আমাকে আচ্ছা করে গালাগালি দিয়েছে, আপনাকেও ভি গালাগালি দিয়েছে
রেজা আলি খাঁ সে কথায় বিশেষ গা করেনি। মেহেদি নেসার সাহেব গালাগালি দিলেই আর গা কিছু পচে যায় না। বললে–ঠিক আছে, তুই কাফের সেজে ওদের অতিথিশালায় গিয়ে ওঠ, কাফের নাম নিয়ে ওখানে দিন কতক থাক, হালচাল দেখ। তারপর আমাকে সব বলে যাবি।
সব ব্যবস্থা রেজা আলি সাহেবই বলে ঠিক করে দিয়েছিল। বশির মিঞাই কার্তিক পাল সেজে গিয়ে উঠেছিল রাজবাড়ির অতিথিশালায়। খেত আর ঘুমোেত। কিন্তু তালে ঠিক থাকত। কেবল ভাব করত গোকুলের সঙ্গে। রান্নাবাড়ির লোকদের সঙ্গে বসে বসে গল্প করত। বিশু পরামানিকের সঙ্গে কথা বলত, আর ছোটমশাইকে দেখলেই পালিয়ে চলে আসত!
জগা খাজাঞ্চিবাবু একদিন জিজ্ঞেস করেছিল–কী নাম তোমার?
আজ্ঞে কার্তিক পাল, আমরা কুমোর—
তোমার বাড়ি কোথায়?
আজ্ঞে মগরা। সরকার সাতগাঁ
সন্দেহ করছে নাকি? বশির মিঞা সেদিন থেকে আরও সাবধান হয়ে গেল। খেয়েদেয়ে নিয়ে ঘুমটা আরও বাড়িয়ে দিলে। যেন কোনও কিছুতেই তার মন নেই, এমনি ভাবখানা। দু-তিন দিন আরও থাকল, আরও মিশল, আরও দেখল। কিন্তু না, সব ঝুট। সব বাজে কথা। রেজা আলি খাঁ সাহেবের দফতরে এসে বললে–না খাঁ সাহেব, জনার্দনটা আপনাকে ঝুট খবর দিয়েছিল, বেটা চাকরি বাগাবার জন্য আপনাকে ওসব কথা বলেছে–
তা হলে দুসরি রানিবিবি কুঠিতে নেই?
না খাঁ সাহেব, না। তাকে চেহেল্-সুতুনে পাঠিয়ে দিয়েছে। মরিয়ম বেগম খুদ নিজে কবুল করেছে সে হাতিয়াগড়ের রানিবিবি!
তা হলে সেই হারামজাদি নোকরানিটা কোথায় গেল? তার সঙ্গে মুলাকাত হয়েছে তোর?
না খাঁ সাহেব, সে এখন নেই ওখানে।
নেই ওখানে?
রেজা আলি খাঁ সাহেব যেন খবরটা শুনে চমকে উঠল। নেই?
না, খাঁ সাহেব, আমি খুব তালাস করেছি, সে নেই। রানিবিবি চলে যাবার পর সেও ভি চলে গেছে। কোথায় চলে গেছে? এই তো সেদিন পর্যন্ত ছিল এখানে।
ছিল, লেকন এখন চলে গেছে, এখন কাশী চলে গেছে। এখন তো কোনও কাম নেই তার, কাশী গিয়ে খোদাতালার নাম করছে।
কবে গেল?
তা জানি না খাঁ সাহেব, লে রানিবিবি ও-কুঠিতে নেই, আমি হলফ করে বলছি, রানিবিবি গেছে চেহেল-সুতুনে, মিছিমিছি আপনি ভি তকলিফ পেলেন, আমার ভি তকলিফ হল–
তারপর হাতিয়াগড় থেকে একদিন ভোররাত্তিরে বেরিয়ে পড়ল বশির মিঞা। যখন মুর্শিদাবাদে এল তখন শহর ফাঁকা। নবাব নেই, জাফর আলি সাহেব নেই, কেউ নেই। মতিঝিলের দরবার-ঘরও ফাঁকা। নবাব পূর্ণিয়ায় যাবার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শহরটা যেন আবার ঝিমিয়ে পড়েছে। তবু নিজামতে গিয়ে দেখা করে সব খবর পেশ করতে হবে। এরকম অনেকবার হয়েছে। বশির মিঞা এতে মুষড়ে পড়ে না। ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই হবার আগে বশির মিঞা অনেকবার উমিচাঁদ সাহেবের বাড়ির দরোয়ান জগমন্ত সিংয়ের সঙ্গে ভাব করবার চেষ্টা করেছে। শেঠবাবুদের মুনশিবাবুর সঙ্গে কথা বলেছে, বেভারিজ সাহেবের সোরার গদির মালবাবু কান্তর সঙ্গে কাত কাটিয়েছে, তবে লড়াই ফতে হয়েছে শেষপর্যন্ত। এমন হয়। এমন হয়ে থাকে। একাজে বেকার ঘোরাঘুরি করতে হয় অনেক।
দফতর থেকে বেরিয়ে সোজা নিজের হাবেলিতে যাচ্ছিল। হঠাৎ মনে পড়ল কান্তর কথা। সে বোধহয় ভাবছে। যাবার আগে অনেক খারাপ কথা বলে গিয়েছিল কান্তকে। বেচারা বোধহয় খুব মুষড়ে পড়েছে। সারাফত আলির দোকানের দিকে চলতে লাগল বশির মিঞা।
খুশবু তেলের দোকানের পেছন দিকে থাকে কান্ত।
বাইরে থেকে বশির মিঞা ডাকতে লাগলকান্ত, এই কান্ত
ডাকাডাকিতেও কোনও সাড়া নেই। তখন বেশ ভোর-ভোর। এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি নাকি!
আবার ডাকলে–এই কান্ত, কান্ত
ভেতর থেকে বাদশা বেরিয়ে এল। বশির মিঞা বাদশার দিকে চেয়ে দেখলে। আগে বাদশাটার চেহারা ভাল ছিল। বদমায়েশি করে করে একেবারে জাহান্নমে গেছে।
বাদশা বললে–নেহি হ্যায় কান্তবাবু–ঘরমে নেহি হ্যায়—
এত ভোরে কোথায় গেল? রাত্তিরে বাড়িতে আসেনি?
বাদশা বললে–না–
অবাক হয়ে গেল বশির মিঞা। রাত্রে বাড়ি আসেনি! তা হলে কোথায় গেল! কান্তবাবু তো জাহান্নমে যাবার ছেলে নয়। কোথায় গেল তা হলে?
