নানিবেগম আর দাঁড়াতে পারলে না। তার চোখ তখন ভিজে এসেছে।
.
তারপর?
কান্ত এতক্ষণ চুপ করে গল্প শুনছিল। জিজ্ঞেস করলে–তারপর মিঞাসাহেব, তারপর কী হল?
সারাফত আলি বললে–তারপর জিন্দিগি কি খেল শুরু হোনে লাগা। নানিবেগমসাহেবা আবার তাঞ্জামে চড়ে চেহেল্-সুতুনে চলে এল। নবাব চলে গেছে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে
কখন গেল?
আজ ভোররাত্তিরে চলে গেছে। এতক্ষণে বোধহয় রাজমহলে পৌঁছে গেছে নবাবি ফৌজ। এখন মুর্শিদাবাদ একেবারে ফাঁকা, চেহেল্-সুতুন ভি ফাঁকা–আজ নজর মহম্মদ এলে তার সঙ্গে তুই চেহেল্-সুতুনে যাবি, কোনও ডর নেই, কেউ কিছু বলবে না–নবাব তো পূর্ণিয়ায় লড়াই ফতে করতে গেছে
সে রাত্রের কথা রাত্রে হবে। সে তো এখন অনেক দেরি। কান্তর মনে হল, তার আগে বশির মিঞার কোনও খবর পেলে ভাল হত। সেখানে সেই হাতিয়াগড়ের অতিথিশালায় গিয়ে যদি খবর পায় যে সত্যি সত্যি তারা রানিবিবিকে না-পাঠিয়ে শোভারাম বিশ্বাসের মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়েছে এখানে, তা হলে কী হবে!
কিন্তু সন্দেহটাই বা হল কেন? কে বলে দিলে?
এক সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাই জানে, সে-ই যদি বলে দিয়ে থাকে। তা ছাড়া আর তো কারও জানবার কথাও নয়। ইব্রাহিম খাঁ যদি কথায় কথায় বশির মিঞাকে বলে দিয়ে থাকে তা হলেই শুধু বশির মিঞার জানা সম্ভব।
কান্ত পায়ে পায়ে সোজা মতিঝিলের দিকেই চলতে লাগল।
*
দু’দিন ধরে চলেছে বজরাটা। ছোট বউরানি আবার অনেক দিন পরে বজরা করে চলেছে। বজরার জানালা দিয়ে দিনেরবেলা বাইরে চেয়ে দেখে দেখে প্রথম দিনটা কেটেছিল। কিন্তু রাত হলেই সব অন্ধকার। তখন বাইরে আর কিছু দেখা যায় না। তবু এ অনেক ভাল। সমস্ত দিন অন্ধকার চোরকুঠুরির মধ্যে আটকে থাকার চেয়ে এ অনেক ভাল।
দুর্গা পাহারা দিত। বলত–বাইরে অত মুখ বাড়িয়ে দেখোনা বউরানি, কে আবার দেখে ফেলবে, তখন আবার হেনস্থা হবে
ছোট বউরানি বলেছিল–এখানে আর কে দেখবে বল?
তা কি বলা যায় বউরানি, অমন রূপ করেছ, দেখবার লোকের কি আর অভাব হবে গো–একবার নবাবের ইয়ারবকশিরা দেখে ফেলেছিল তার জেরই এখনও সামলানো যায়নি, এখন আবার নতুন কী ঝঞ্জাট হয় কে বলতে পারে
তা কেষ্টনগরে নামবার সময় যদি কেউ দেখে ফেলে আমাকে?
সে ছোটমশাই আগের থেকে সব বন্দোবস্ত করে রেখেছে গো, তোমায় কিছু ভাবতে হবে না। কেষ্টনগরের ঘাটে পৌঁছোবার আগেই রাজার লোকজন সব তৈরি থাকবে, তারাই সব আড়াল করে নামিয়ে নেবে তোমাকে–
তা যদি তারাই কেউ দেখে ফেলে নিজামতের লোকদের জানিয়ে দেয়? টাকার লোভে সবাই এখন সবকিছু করতে পারে।
সেটি হবে না গো। সে বুদ্ধিও আমি করেছি। বড় বউরানি আমাকে বলে দিয়েছে যে—
কী বলে দিয়েছে?
বলেছে, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবি এ হচ্ছে হাতিয়াগড়ের নফর শোভারাম বিশ্বাসের মেয়ে মরালী! নিজের নাম কখনও ভুলেও যেন বলে ফেলো না বউরানি, তা হলে সব্বনাশ হয়ে যাবে!
ছোট বউরানি বললে–সে তো আমাকেও বলে দিয়েছে। কিন্তু একলা একলা থাকব কী করে বল তো দুগ্যা, রাত্তিরে কি একলা শুয়ে ঘুম আসবে। এতদিনের অভ্যেস
একলা শুতে হবে কেন তোমাকে শুনি। ছোটমশাই তো এখানে আসবে ঘন ঘন, এসে তো তোমার পাশেই শোবে–তোমাকে ছেড়ে ছোটমশায়ের কি ঘুম হবে বলতে চাও? আমি সেসব ব্যবস্থাও করে এসেছি যে! ওই বেটা বশির মিঞা এসেই তো যত গণ্ডগোল করে দিলে, নইলে তো জনার্দনটাকে আমি বাণ মেরে ঠান্ডা করে দিয়েছিলুম
বশির মিঞা? বশির মিঞাটা আবার কে রে?
ওই যে কার্তিক পাল। নিজামত থেকে ওকেই তো পাঠিয়েছিল, ও-বেটা যে নিজামতের চর। ও হাতিয়াগড়ে এসেছিল সরেজমিনে তদন্ত করে দেখতে। কদিন থেকে অতিথাশালায় এসে উঠেছে, চারদিকে নজর রাখছে। বলে কিনা মগরায় বাড়ি, কোন্নগরে যাবে আমার কাছে চালাকি পেয়েছে বাছাধন, দিতুম ওকে বাণ মেরে ঠান্ডা করে, কিন্তু বড় বউরানি বারণ করলে তাই..
তারপর একটু থেমে বললে–তোমার কিছু ভাবনা নেই গো, মহারাজা কেষ্টচন্দ্র তোমাকে লুকিয়ে রাখবে বলেছে। খুব মানী রাজা তো, দশজনে মানিগন্যি করে, কেউ সন্দেহ করতে পারবে না। এখন সু-ভালয়-ভালয় কেষ্টনগরে পৌঁছোতে পারলে হয়–
বিকেলবেলার দিকে একটু মেঘ করে এসেছিল। দেখতে দেখতে সেই মেঘ আরও কালো হয়ে আকাশ ছেয়ে ফেললে। বেশ মজবুত বজরা। ছ’খানা দাঁড়। পেছনে হাল ধরে আছে শ্রীনাথ। দুর্গা মেঘ দেখেই জানালার পাল্লা দুটো বন্ধ করে দিয়েছিল।
হঠাৎ শ্রীনাথ চিৎকার করে উঠল–দিদিমণি, সাবধান
কথাটা শুনে প্রথমে দুর্গা ভেবেছিল, বুঝি ঝড় উঠেছে তাই সাবধান করে দিচ্ছে শ্রীনাথ। কিন্তু তা নয়। খানিক পরেই বন্দুকের গুলির আওয়াজ কানে এল।
ছিন্নাথ, কী হল রে?
শ্রীনাথ উত্তর দেবার আগেই বজরাটা দুলে উঠেছে। সেই ঝাঁকুনিতেই ছোট বউরানি ভয়ে হাউমাউ করে উঠেছে। শ্রীনাথ একেবারে ছইয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। বললে–দিদিমণি গো, আর পারলাম না, সামাল নাও এখুনি
কেন, কী হয়েছে রে?
শ্রীনাথ বললে–ফিরিঙ্গি বোম্বেটের নৌকো আসছে, সঙ্গে গোরাপল্টন
শ্রীনাথের কথা আর শেষ হল না। ওদিক থেকে ফিরিঙ্গিদের নৌকো থেকেও তখন দমাদম বন্দুকের শব্দ হতে লাগল। ছোট বউরানি তখন দুর্গাকে জাপটে ধরেছে। বললে–কী হবে এখন দুগ্যা?
*
রেজা আলি রোজ দফতরে বসে থাকত অপেক্ষা করে। মুর্শিদাবাদের খবরের জন্যেও অপেক্ষা করে থাকত, আবার বশির মিঞার খবরের জন্যেও অপেক্ষা করে থাকত। জীবনে অনেক অপব্যয়-অপকর্ম করে করে খুব নিচু থেকে উঠে আজ ডিহিদার হয়েছে। মুর্শিদাবাদে অনেক মুরগি পাঠিয়েছে, অনেক ঘি পাঠিয়েছে, অনেক আম-আনারাসকাঁঠাল পাঠিয়েছে নবাবকে, অনেক মেয়েমানুষও পাঠিয়েছেনবাবকে খুশি রাখবার জন্যে। শুধু তাই নয়, নবাবকে খুশি করবার জন্যে অনেক খুন-জখমও করতে হয়েছে। হাসিমুখে বাড়িতে নেমন্তন্ন করে এনে খেতে বসিয়ে পেছন থেকে ছুরি মারতে হয়েছে। শুধু নবাব খুশি হবে বলে! এবং নবাব আলিবর্দি খাঁ বাহাদুর আলমগির খুশি হয়েছে বলেই রেজা আলি খা আজ ছোট থেকে উঠে উঠে হাতিয়াগড়ের ডিহিদার হতে পেরেছে। রেজা আলি খাঁ ভাল করেই জানে যে শুধু কাজ দেখিয়ে নোকরিতে বড় হওয়া যায় না। শুধু নবাবের হুকুম তামিল করেই জীবনে উন্নতি করা যায় না। উন্নতি করতে গেলে খোঁজ রাখতে হবে কে নবাবের দুশমন! সেই দুশমনকে হঠাতে পারলেই নির্ঘাত উন্নতি! সেই কাজই এতদিন ধরে চালিয়ে এসেছে রেজা। এবারও সেই একই কাজ।
