জগৎশেঠজি, মিরজাফর আলি সাহেব দুজনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আপনারা আমার মির্জাকে খুন করে ফেললেও আমি কিছু বলব না, কারণ সে আপনাদের মনে আঘাত দিয়েছে, আপনাদের সম্মানহানি করেছে। কিন্তু নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা! তাকে আপনারা কেমন করে অস্বীকার করেন বলুন! নবাবকে অস্বীকার করলে যে মুর্শিদাবাদের মসনদকেই অস্বীকার করা হয় জগৎশেঠজি! আপনারা কি সেই মসনদকেই অস্বীকার করতে চান? সনদ পায়নি বলেই কি সে নবাব নয়?
মির্জা আর একবার বাধা দিলে–আঃ, নানিজি!
তুমি থামো
নানিবেগমসাহেবা এবার মির্জার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললে–তুমি থামো! জানো তুমি কাদের ভরসায় নবাব হয়েছ? জগৎশেঠজি যদি তোমার বিরুদ্ধে যান তো তুমি নবাবি করতে পারবে? মিরজাফর সাহেব যদি তোমায় সাহায্য না করে তো তুমি তোমার মসনদ টিকিয়ে রাখতে পারবে? কে তোমার বল-ভরসা? কাদের ওপর নির্ভর করে তুমি ফিরিঙ্গি কোম্পানির সঙ্গে লড়াই করে এলে? কে তোমাকে টাকা জুগিয়েছে এতদিন? কে তোমার নানাকে টাকা জুগিয়ে এসেছিল এতদিন? তোমার লজ্জা করে না তাঁদের অপমান করতে? চাও, এখনই ক্ষমা চাও, এখনই মাফ চাও এঁদের কাছ! চাও
জগৎশেঠজি হঠাৎ বললেন–থাক বেগমসাহেবা থাক—
মিরজাফর আলির মুখখানাও যেন কেমন নরম হয়ে এল।
নানিবেগম বললে–না জগৎশেঠজি, আপনি মুর্শিদাবাদের মসনদের শুভাকাঙ্ক্ষী তাই ওকথা বললেন, কিন্তু মির্জার বয়েস কম, তাই এখনও কার সম্মান কীভাবে রাখতে হয় তা জানে না। সেসব ওর শেখা উচিত! ফিরিঙ্গি হলওয়েল সাহেবের বেলাতেও আমি কাল এই কথাই বলেছিলাম, আপনাদের বেলাতেও আমি আজ সেই কথাই বলছি। আমি যতদিন অন্তত বেঁচে থাকব ততদিন এই কথাই বলব, আমার সামনে কোনও অন্যায় হতে দেখলে আমি চুপ করে থাকব মনে করবেন না। এর পর যদি আমার মির্জা আপনাদের কোনও অপমান করে তো আমাকে আপনারা খবর দেবেন দয়া করে, আমি তার প্রতিকার করব। শুধু একটা কথা, দয়া করে মুর্শিদাবাদের পবিত্র মসনদের কখনও অসম্মান করবেন না আমাকে কথা দিন–
জগৎশেঠ মাথা নিচু করে কুর্নিশ করে বললেন–বেগমসাহেবার ইচ্ছেই বান্দার ইচ্ছে
আর জাফর আলি সাহেব, তুমি?
মিরজাফর আলি খাঁ-ও মাথা নিচু করে বললে–বেগমসাহেবার ইচ্ছেই বান্দার ইচ্ছে
তবে আপনারা এখন আসুন!
না
নবাব হঠাৎ বললে–না, যাবার আগে শওকত জঙকে চিঠি লেখার কথাটাও বলে যান জাফর আলি সাহেব, বলে যান, কেন আমার বিরুদ্ধে তাকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন।
আমি তো বলেছি ও-চিঠি জাল!
নবাব বললে–তা হলে শওকত জঙ আমাকে যে-চিঠি লিখেছে, সে-চিঠিও কি জাল মনে করেন?
মিরজাফর আলি বললে–জাল কি না তা শওকত জঙই জানে!
তা হলে আমি যদি শওকত জঙের সঙ্গে কাল লড়াই করতে পূর্নিয়ায় যাই তো আপনি আমার সঙ্গে যেতে প্রস্তুত? যদি প্রস্তুত থাকেন তা হলে বুঝব আপনি আমার ভাল চান, আপনি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী
নানিবেগম মিরজাফর আলির দিকে চাইলে।
বললে–বলো জাফর আলি সাহেব, মির্জার কথার জবাব দাও
তারপর আর যারা দাঁড়িয়ে ছিল সকলের দিকেই চেয়ে বললে–দুর্লভরাম, মোহনলাল, সবাই বলুন আপনারা নবাবের দলে ।
সবাই একে একে বললে–আমরা সবাই নবাবের দলে
নবাব বললে–তা হলে আজকেই তৈরি হয়ে নিন–শেষরাত্রের দিকে যাত্রা করব
সবাই একে একে কুর্নিশ করে দরবারের বাইরে চলে গেল। তখনও নানিবেগম ঘরের মধ্যে মির্জার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
মির্জা বললে–নানিজি, তুমি আর আমাকে বাধা দিয়ো না
নানিবেগম বললে–আমি তোকে বাধা দেব কে বললে?
না নানিজি, যতবার আমি যা করতে গিয়েছি ততবার তুমি বাধা দিয়েছ, তোমার মত না নিয়ে কখনও আমি কিছু করিনি। হুসেনকে খুন করবার আগেও তোমাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছি, এই মতিঝিল থেকে মাসিকে তাড়িয়ে দেবার সময়ও আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছি। কাল হলওয়েল সাহেবকে আমি ছেড়ে দিতে চাইনি, শুধু তোমার কথাতেই ছেড়ে দিলাম। আজ জগৎশেঠজিকেও আমি উচিত শিক্ষা দিতুম, কিন্তু তোমার কথাতেই আমি চুপ করে রইলুম। তুমি কি মনে করো ওদের মুখের কথাই ওদের মনের কথা? ওরা মনে মুখে এখনও এক হতে পারলে না–ওদের আমি বিশ্বাস কী করে করি বলো?
তা হোক মির্জা, ওদের নিয়েই তো তোকে চলতে হবে। ওদের চটালে চলবে কেন?
তা, কেন ওরা সত্যি কথা বলে না? সত্যি কথা বললে–তো আমি কোনও কিছু বলি না। আমার সঙ্গে যে ওরা মন-রাখা কথা বলে কেবল! ওরা কি মনে করে আমি এতই বোকা, আমি কিছু বুঝি না? আমি কি ছেলেমানুষ!
নানিবেগম বললে–কী করবি বল মির্জা, সকলে তো ভাল ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না
তুমি আর ভাগ্যের দোহাই দিয়ো না নানিজি! আমি অত দুর্বল নই যে আমি ভাগ্যের দোহাই মেনে সব অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করব, ভাগ্য যদি আমার বিপক্ষে থাকে তো ভাগ্যকে আমি জোর করে আমার বশে আনব! আমি শওকত জঙকে এবার এমন শিক্ষা দেব যে সে জীবনে কখনও তা ভুলবে না–
কিন্তু তা হলে চেহেল সুতুনে যাবি না আজ?
আজ কেমন করে যাব বলো নানিজি? আজ শেষরাত্রেই তো রওনা দেব
তা ওখান থেকে ফিরে এসে!
ফিরে এসে যাব কী করে? মানিকচাঁদ যে চিঠি লিখেছে তাতে তো খবর আরও খারাপ। ফিরিঙ্গিরা বোধহয় আর আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না।
তা হলে কবে তোর সময় হবে শুনি?
মির্জা নানিবেগমের হাত দুটো ধরলে। বললে–তুমি তো দিনরাত কোরান পড়ো নানিজি, তুমি তো রোজ জুম্মা মসজিদে গিয়ে নমাজ পড়ো, তুমি তোমার খোদাতালাকেই জিজ্ঞেস করে দেখো না, তাকে শুধু এই কথাটা জিজ্ঞেস কোরো যে তোমার মির্জা কবে সময় পাবে? কবে শান্তি পাবে সে?
