সারাফত আলি বললে–তা হলে তো তোর খুব আরাম! তা হলে আজ আরাম করে চেহেলসূতুনে যা গিয়ে রাত কাটিয়ে আয়–
কান্ত বললে–তা কী করে যাব মিঞাসাহেব, কাল নজর মহম্মদ যে বলে গেল নবাব চেহেল্-সুতুনে আসবে চেহেল্-সুতুনেই রাত কাটাবে
দুর বোকা, নবাব তো কাল চেহেল্-সুতুনে যায়নি!
যায়নি?
না রে, তুই কিছুই খবর রাখিস না, সে তো সব গোলমাল হয়ে গেছে। নবাব জগৎশেঠজিকে সব আমির-ওমরাদের সামনে বেইজ্জৎ করেছে–মিরজাফর সাহেব তাই নিয়ে হল্লা করেছে, তুই কিছুই খবর রাখিস না কান্তবাবু! নবাব তো যায়ইনি চেহে-সুতুনে
কান্ত সব শুনে অবাক হয়ে গেল। বললে–তারপর! তারপর কী হল?
তারপর নানিবেগম তাঞ্জাম নিয়ে গেল মতিঝিলে!
নানিবেগম!
সমস্ত ঘটনা শুনল কান্ত। মিঞাসাহেবের কাছে কেমন করে যেন সব খবর আসে। মুর্শিদাবাদের যেখানে যা ঘটে সব যেন টের পায় সারাফত আলি। কান্তও দেখেছিল তাঞ্জামটা। মনে আছে নজর মহম্মদ চলে যাবার অনেক পরে এমনি একা-একা চকবাজারে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ জোড়া হাতি দেখে পিছিয়ে এসেছিল সে। নানিবেগমের তাঞ্জাম যাচ্ছিল মতিঝিলের দিকে। শুধু কান্ত নয়, রাস্তার অনেকেই দেখেছিল। সরাবখানার ভেতরে বসে ইব্রাহিম খাঁ’ও দেখেছিল। আগের দিন থেকেই মতিঝিলের ভেতরে যেন নাগাড়ে ঝড় বয়ে চলছিল। কলকাতা থেকে আসার পর থেকেই এমনি চলেছে। ফিরিঙ্গি কোম্পানির সঙ্গে লড়াইতে অনেক বাজেখরচা হবার পর থেকেই নবাবের মেজাজ বিগড়ে আছে। প্রথম দিন গুলসন বেগমকে দিয়ে নাচিয়েও নবাবের মেজাজ ঠান্ডা করতে পারা যায়নি। নেহাত না-হাসলে নয় তাই হেসেছে, না ফুর্তি করলে নয় তাই ফুর্তি করেছে আর পরদিন থেকেই শুরু হয়েছে দরবার। সেই দরবারেও রাগারাগি চেঁচামেচি চলেছে। নানিবেগম এসেছিল শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়েকে নিয়ে। তারপর কথা ছিল দরবার ভেঙে দিয়ে নবাব চেহেল্-সুতুনে যাবে। সেই যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে। জগৎশেঠজিকে আটক করে রেখেছে। সেই খবরটা পেয়েই আবার নানিবেগম এসে গেছে
নবাব দরবার ভেঙে দিয়ে নিজের ঘরেই চলে যাচ্ছিল।
এমন সময় নেয়ামত খবর নিয়ে এল-নানিবেগমসাহেবা এসেছেন
নানিবেগম আসতেই যেন দরবার আবার নতুন করে বসল। এবার আর আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে কথা নয়। এবার একেবারে দরবারে মির্জার মুখোমুখি।
কিন্তু মির্জাকে কিছু বললে–না নানিবেগম। সোজা মিরজাফর আলি সাহেবের দিকে চেয়ে বললে–জাফর আলি খাঁ কি আমাকে চিনতে পারছ?
মিরজাফর মাথা নিচু করে বললে–বান্দা নিমকহারাম নয় নানিবেগমসাহেবা!
কিন্তু শুনলাম নিমকহারামের কাজই নাকি তুমি করেছ? মির্জার সঙ্গে তুমি দুশমনি করছ?
বেগমসাহেবা ভুল খবর পেয়েছেন মনে হয়!
তা হলে কি আমি মিছিমিছি মতিঝিলে এসেছি বলতে চাও?
মিরজাফর আলি বড় অনুগত সুরে তখন কথা বলছে। বললে–আপনি কেন এত কষ্ট করে এখানে আসতে গেলেন, আমার সঙ্গেই যদি আপনার কথা ছিল তো বান্দাকে ডাকলেই তো বান্দা যেত, বেগমসাহেবার চেহেল্-সুতুনে।
নানিবেগমসাহেবা এবার মির্জার দিকে চাইলে। বললে–শুনলাম জগৎশেঠজি এখানে আছেন, তাকে দেখছি না, তিনি কোথায়?
মির্জা সে কথার উত্তর না দিয়ে বললে–তুমি কেন আবার এখানে এলে নানিজি, আমি তো খবর পাঠিয়েছি যে আমি আজ চেহেলসূতুনে যেতে পারব না–
নানিবেগম বললে–আমার কথার উত্তর দাও আগে, বলো জগৎশেঠজি কোথায়?
তাকে আমি ফাটকে রেখেছি।
নিয়ে এসে তাঁকে ফাটক থেকে।
কিন্তু নানিজি, আমি যে নবাব হয়েছি বাংলা-বেহার-উড়িষ্যার, তার সনদই এখনও আনেননি তিনি। সনদ নেই অথচ আমি নবাবি করছি। সনদের কথাটাও কি আমাকে ভাবতে হবে? ওদিকে শওকত জঙ যে সনদ আনিয়েছে দিল্লির বাদশার কাছ থেকে এখন যে সে আমাকে লড়াই করবে ভয় দেখিয়ে চিঠি লিখেছে! এর পরেও আমি ক্ষমা করব জগৎশেঠজিকে? এর পরেও তুমি আমাকে ক্ষমা করতে বল তাকে?
তবু, তাকে নিয়ে এসো আমার সামনে।
জীবনে মহতাপজি এত অপমান কখনও পাননি। বোধহয় তার ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ-পুরুষও কখনও বাংলার নবাবের হাতের এ-অপমান কল্পনা করতে পারেনি। দিল্লির বাদশার দরবারেও কোনওদিন কোনও বাদশাও এমন করে অপমান করতে সাহস পায়নি জগৎশেঠজিদের। মুখখানা তাই হয়তো কালো হয়ে উঠেছিল।
জগৎশেঠজি!
জগৎশেঠজি নানিবেগমসাহেবাকে দেখে নিচু হয়ে কুর্নিশ করলেন।
আমি আমার মির্জার হয়ে আপনার কাছে মাফ চাইছি জগৎশেঠজি। মির্জা ছোট ছেলে, এখনও ছেলেমানুষ, কিন্তু আপনার বয়েস হয়েছে, আপনি অনেক দেখেছেন, অনেক ভুগেছেন, আপনি এমন ভুল করবেন এ আমি ভাবতে পারিনি! আপনি জানেন মির্জার জন্ম থেকেই চারদিকে তার শত্রু। মানুষ যখন ছোট থাকে তখন তার শত্রু থাকে না। শত্রু হয় বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু যখন ও সবে জন্মেছে তখন থেকেই চারদিকে ওর দুশমন–আমি ওকে বুকে করে মানুষ করেছি-নইলে কবে ও খুন হয়ে যেত! আসলে মুর্শিদাবাদের মসনদই ওর শত্ৰু, সেই মসনদের জন্যেই ওর এত কষ্ট–তা তো আপনি জানেন
নানিজি!
মির্জা নানিবেগমের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্যে একবার ডাকলে। কিন্তু নানিবেগম তখনও বলেই চলেছে জগৎশেঠজির দিকে চেয়ে চেয়ে আমি আপনাকেও বলছি, আর মিরজাফর সাহেবকেও বলছি, আপনারা দুজনেই বুকে হাত দিয়ে বলুন যে, আপনাদের কাছে স্বার্থ বড় না নবাব বড়! আপনাদের দুজনেই আমার কাছে কবুল করুন আজ যে, নবাব যত অন্যায়ই করুক, তবু সে নবাবই! আপনারা আমার মির্জাকে না মানতে পারেন, কিন্তু কবুল করুন, নবাবকে আপনারা মানবেন! করুন কবুল! কবুল করুন!
