ভোরবেলা সেদিনও ছোট বউরানি এসেছে। কিন্তু এসেই অবাক হয়ে গেছে। তালা খোলা কেন?
ভেতরে দুর্গা তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছিল।
ছোট বউরানি ডাকতেই ধড়মড় করে উঠে পড়েছে। বললে–আজ তালা খোলা কেন রে দুগ্যা?
দুর্গাও যেন অবাক হয়ে গেছে।
তালা খোলা? তবে বোধহয় তুমিও তালা দিতে ভুলে গেছ, আমিও ভুলে গেছি চাবি নিতে
সেদিন এই নিয়ে আর কিছু বলেনি দুর্গা। হয়তো তাড়াতাড়িতে চাবি নিতেই ভুলে গিয়েছিল ছোট বউরানি। এত বড় বাড়ির মধ্যে কোথায় ছোট বউরানি আছে, কোথায় নেই, তা কারও জানবার কথাই নয়। চুপি চুপি কখন চোরকুঠুরি থেকে বেরোয় মাঝরাত্রে, কখন ঢোকে তা কেউ জানতে পারেনি। তাই হাতিয়াগড়ের রাজবাড়িতে এ নিয়ে কোনও চাঞ্চল্যই সৃষ্টি হয়নি। যথারীতি তরঙ্গিনীর সঙ্গে দুর্গার ঝগড়া হয়েছে, কথা-কাটাকাটি রয়েছে, তারপর আবার তা মিটেও গেছে।
কিন্তু হঠাৎ একদিন খবর পাওয়া গেল ভোররাত্রে।
ভোররাত্রের দিকেই কে যেন ওদিক পানে গিয়েছিল। গিয়ে দেখেছে জনার্দন ছাতিমতলার ঢিবির ওপর মরে পড়ে আছে। তারপরেই খবরটা রটে গেল চারদিকে। বিশু পরামানিকের কানেও গেল, গোকুলের কানেও গেল। যে-যেখানে ছিল সকলের কানেই গেল–জনার্দনকে সাপে কামড়ে মেরে ফেলেছে–
তা সাপের কামড় এমন কিছু নতুন নয়। এমন হাতিয়াগড়ে হামেশা ঘটে।
ছোট বউরানি শুধু জানত যে আসলে সাপটাপ কিছু নয়। আসলে দুর্গাই বাণ মেরে, মেরে ফেলেছে জনার্দনকে।
তা বাণ মারতে গেলি কেন তুই ওকে?
বাণ মারব না? ও যে তোমার পেছনে লেগেছিল গো! যে তোমার পেছনে লাগবে তাকেই বাণ মেরে, মেরে ফেলব অমনি করে!
তা আর কতদিন এমনি করে থাকব বল তো লুকিয়ে লুকিয়ে? আমি যে আর পারছিনে?
দুর্গা বলত–সে বড় বউরানিকে জিজ্ঞেস করো গে তুমি! তার হুকুম, আমি কী জানি!
কিন্তু বড় বউরানিকে জিজ্ঞেস করবার সাহস নেই কারও। সে বড় কঠিন ঠাই। বড় বউরানি এমন আবদার শুনলে শেষকালে মাধব ঢালিকে দিয়ে কেটে ফেলবার হুকুম দেবে। তার চেয়ে এ যেমন চলছে। চলুক। যেমন চুপি চুপি রাত্রে গিয়ে ছোটমশাইয়ের ঘরে ঢুকত ছোট বউরানি, তেমনি না-হয় চিরকালই ঢুকবে। কষ্ট যখন কপালে আছে তখন কে আর খণ্ডাবে।
কিন্তু ছোট বউরানির কপালে বুঝি সেটুকু শান্তিও নেই।
হঠাৎ একদিন একটা লোক এসে হাজির হল রাজবাড়ির অতিথিশালায়। নিরীহ গোবেচারা মানুষটা। গরিবগুরবো চেহারা। দুটো ভাত খেয়ে চুপ করে শুয়ে রইল।
জগা খাজাঞ্চিবাবু জিজ্ঞেস করলে তুমি কে? বাড়ি কোথায় তোমার?
লোকটা বললে–আজ্ঞে কর্তা, আমার নাম কার্তিক পাল, কুমোরের ছেলে, আমাদের জল চল, আমার দেশ মগরা, সরকার সাতগাঁয়
তুমি এখানে কী করতে এয়েছ?
আজ্ঞে কর্তা, আমি যাব কোন্নগর, বর্ষাকালে গাঁ-গঞ্জ সব ডুবে গেছে, তাই হাঁটা-পথে চলেছি–
তা থাকুক। দু-চার দিনের বিশ্রামের জন্যেই তো এই অতিথিশালা তৈরি করে দিয়েছিলেন বড়মশাই। এইরকম গরিবগুরবো লোকেদের সুবিধের জন্যে। তা লোকটা রইল। দু-তিন দিন খেলেদেলে পেট ভরে, ঘুমোতেও লাগল। আর কাজ না-থাকলেই এর-ওর সঙ্গে গল্প করতে লাগল। এদের নিয়ে মাথা ঘামায় না কেউ হাতিয়াগড়ের অতিথিশালায়।
কিন্তু মাথা ঘামাতে হল একদিন। একদিন ছোটমশাই হন্তদন্ত হয়ে জগা খাজাঞ্চিবাবুকে ডেকে পাঠালেন।
বললেন–অতিথিশালায় কেউ আছে এখন?
আজ্ঞে হ্যাঁ, একজন আছে
কে সে? কোত্থেকে আসছে?
তার নাম কার্তিক পাল। দেশ মগরা, সরকার সাতগাঁয়
কোথায় যাবে?
বললে–তো কোন্নগরে।
আচ্ছা, যাও তুমি এখন!
সেই দিন মাঝরাত্রেই নদীর ঘাটে এসে ছোটমশাইয়ের বজরাটা লাগল। ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। কিন্তু তারই মধ্যে রাজবাড়ির খিড়কির দরজা দিয়ে দু-চারজন মানুষ বেরিয়ে এল। কোথাও একটা জনপ্রাণী নেই। ঝাঁ ঝাঁ ঝিঁঝি-ডাকা রাত। শুধু কয়েকটা গেঁয়ো কুকুর একবার হল্লা করে উঠেছিল, কিন্তু চেনা-মুখ দেখে তখনই আবার পায়ের কাছে এসে ল্যাজ নাড়তে লাগল। তারপর বজরার ভেতরে গিয়ে ঢুকল দুটি ঘোমটা দেওয়া প্রাণী। বাইরে লাঠি-সড়কি নিয়ে পাহারা দিতে লাগল একজন জোয়ান পুরুষ। পুরনো সাতপুরুষের মাঝি। তারা বজরার কাছি খুলে দিলে। আর ইতিহাসের পালে পশ্চিমের ঝোড়ো। বাতাস লেগে বজরাটা সোঁ সোঁ করে ছুটে চলল স্রোতের মুখে তির বেগে! বদর বদর!
*
কান্ত আবার সারাফত আলির দোকানে ফিরে এল। বশির মিঞার কথা শোনবার পর থেকেই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বশির মিঞা কী করে জানতে পারলে! কী করে জানতে পারলে শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ে এসেছে চেহেল্-সুতুনে। একথা তো কেউ জানে না। একমাত্র জানে ইব্রাহিম খাঁ–ওই সচ্চরিত্র পুরকায়স্থমশাই! সে-ই কি বলে দিলে। তাকে এত করে বলে দেওয়ার পরও কি শেষপর্যন্ত বলে দিলে!
সারাফত আলি দেখতে পেয়েছে। বললে–কী রে কান্তবাবু, হাজরে হল দফতরে?
কান্ত বললে–হ্যাঁ
বেশি কথা বলতে ভাল লাগছিল না তার। মাথার মধ্যে তখন কেবল ঘুরছিল রানিবিবির কথা, মরালীর কথা। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভাবনা যেন মাথার মধ্যে এসে ঢুকেছিল। যদি বশির মিঞা হাতিয়াগড়ে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে যে ছোটমশাই নিজের বউকে না-পাঠিয়ে নফরের মেয়েকে পাঠিয়েছে, তা হলে কী হবে! কী হবে তা যেন ভাবতেই ভয় হল।
কোথায় যাবার হুকুম হল তোর?
কোথাও হুকুম হয়নি, শুধু হাজরে দিয়ে এলাম
