রানিবিবি একবার একটু গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর আর-একটা পান মুখে পুরে দিয়ে বললে–এ কথার উত্তর যদি দিই, তা হলে তোমার চাকরিটাই চলে যেতে পারে। আমার কিছু হলে তোমার কিছু যাবে-আসবে না, কিন্তু তোমার চাকরি চলে গেলে তখন কী করবে?
কান্ত এবার রানিবিবির মুখের দিকে সোজাসুজি চেয়ে দেখলে। যেন কথাগুলোর মানে খোঁজবার চেষ্টা করলে রানিবিবির মুখ-চোখ-ঠোঁটের মধ্যে।
রানিবিবি আবার বলতে লাগল–দিনকাল খারাপ, এসময়ে দুটো টাকা যেখান থেকে পায়রা জোগাড় করে জমাতে চেষ্টা করো। টাকাটাই এখন সব আখেরে টাকাই কাজ দেবে!
কেন? ওকথা বলছেন কেন?
দেখছ না, নবাব থেকে শুরু করে সেপাই পর্যন্ত সবাই টাকা টাকা করে মরছে। টাকার জন্যেই তো ফিরিঙ্গিরা সাত-সমুদ্র পেরিয়ে এখানে এসেছে। বর্গিরাও তো টাকার জন্যে আসত এখানে
আপনি বুঝি আমাকে ঠাট্টা করছেন?
ঠাট্টা করব কেন? তুমি নিজেই তো টাকার জন্যে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করলে। টাকাটাই কি সব নয়?
কান্ত অবাক হয়ে গেল।–আর আপনি? আপনিও কি তাই টাকার জন্যে মুর্শিদাবাদ যাচ্ছেন?
আমি কী জন্যে যাচ্ছি, তা তোমাকে বলতে যাব কেন? আর যার জন্যেই যাই, টাকার জন্যে নিশ্চয়ই। নয়। তা ছাড়া, মেয়েমানুষরা অত টাকা-টাকা করে না। বিয়ে হলে তুমি বুঝতে পারতে–
কান্ত বললে–কিন্তু আপনি বিশ্বাস করুন, আমার বিয়ে করবার খুব ইচ্ছে ছিল, ভেবেছিলাম বিয়ে করে বড়চাতরায় নিয়ে যাব আমার বউকে, সেখানকার বাড়িটা সারিয়ে সুরিয়ে সেখানেই সংসার করব, ভেবেছিলাম বর্গি আসা যখন বন্ধ হয়েছে তখন আবার দেশে গিয়ে চাষবাস করব। সত্যি আমার এসব ভাল লাগছে না।
তারপর রানিবিবির দিকে চেয়ে হঠাৎ কথা বলতে বলতে থেমে গেল। বললে–আপনাকে আমার নিজের এত কথা বলছি বলে আপনি বিরক্ত হচ্ছেন না তো?
বিরক্ত হব কেন, বলো না।
বলে হাসলেন রানিবিবি।
সত্যি, কান্ত জীবনে এই প্রথম যেন একজন শ্রোতা পেয়েছে। তার অনেক কথা অনেকদিন ধরে বুকের মধ্যে জমে ছিল, শোনবার লোকই কেউ ছিল না। বেভারিজ সাহেবের সোরার গুদামে কেবল মালের হিসেবই রেখেছে সারাদিন ধরে। তারপর গঙ্গার ধারে খড়ের চালাটায় শুতে-না-শুতে এক ঘুমে। রাত কাটিয়ে দিয়েছে। কোনও কিছু ভাববার সময়ই ছিল না তখন। কিন্তু এক-একদিন যখন কালবোশেখীর ঝড় উঠত, ঝড়ে সোরার নৌকোগুলো, কোম্পানির জাহাজগুলো জলের ঢেউ লেগে ওলোটপালোট করত, সেইসব রাত্রে নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হত তার। এক-একদিন বেভারিজ সাহেবও মদ খেয়ে বেসামাল হয়ে পড়ত। তখন সাহেবের মালী কোথা থেকে সাহেবকে মেয়েমানুষ এনে জুগিয়ে দিত। কোথা থেকে তাদের আনত সে কে জানে! চাকরি বজায় রাখার জন্যে সব কাজই করতে হত তাকে। তখন মনে হত তারও পাশে একজন কেউ থাকলে ভাল হত। তার মুখে গালে চুলে ঠোঁটে হাত দিয়ে আদর করত সে। তাকে নিয়ে বড়চাতরার সেই ঘরখানার তলায় সংসার পাতত। কিন্তু তারপর আবার কখন রাত পুইয়ে যেত। গঙ্গার ঘাটে আবার নৌকোয় পাল খাটানো হত। ভোরবেলাই নৌকোগুলো ছেড়ে দিত বদর-বদর বলে। তখন আর ওসব কিছু মাথায় আসত না। তখন আবার সোরা, তখন আবার হিসেবের খাতা, তখন আবার মোহর-টাকা-কড়া-ক্রান্তির গোলকধাঁধার মধ্যে ডুবে যেত।
তা সেই সময়েই একদিন এক ঘটকমশাই এসে হাজির। হাতে খেরো বাঁধানো খাতা। সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ তার নাম। বেশ ভাল করে কান্তর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে, কুলজিবংশ সবকিছু জেনে নিয়ে বলেছিল–তুমি বিয়ে করবে বাবাজীবন?
আসলে ওইভাবেই শুরু হয়েছিল সম্বন্ধটা। হাতিয়াগড়ের সৎকায়স্থ শোভারাম বিশ্বাস। তার একমাত্র সন্তান। মেয়েটিকে পাত্রস্থ করতে চায় তার বাপ। জমিদারি-সেরেস্তায় কাজ করে সে নিজে। নিজের বাস্তুভিটে আছে হাতিয়াগড়ে। দেবেথোবে ভাল। পৈতৃক সোনাদানা কিছু আছে। জামাই-ই সরকিছু পাবে।
কথা বলতে বলতে কান্ত থামল। বললে–এসব কথা আপনার শুনতে হয়তো ভাল লাগছে না—
না না, বলো! তারপর? পাত্রী কেমন দেখতে?
কান্ত বললে–সে কথাও জিজ্ঞেস করেছিলুম—
ঘটকমশাই কী বলেছিলেন? দেখতে খারাপ?
না, ঘটকমশাই বলেছিলেন পাত্রী খুব সুন্দরী।
খুব সুন্দরী?
কান্ত বললে–হ্যাঁ, খুব নাকি সুন্দরী, অমন সুন্দরী নাকি দেখা যায় না—
কার মতন সুন্দরী?
কান্ত বললে–তা জানিনে, আমি তো নিজের চোখে পাত্রী দেখিনি—
তবু শুনে কেমন মনে হয়েছিল? আমার চেয়েও সুন্দরী?
রানিবিবি যে কতখানি সুন্দরী তা যেন এতক্ষণ দেখবার সুযোগ পায়নি। তাই ভাল করে আর একবার রানিবিবির মুখখানা দেখলে সত্যিই এমন সুন্দরী হয় নাকি কেউ!
কান্ত বললে–আপনি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন—
ওমা, ঠাট্টা করব কেন? আমার চেয়ে সুন্দরী কেউ হয় না?
কান্ত বললে–আপনার চেয়ে সুন্দরী আবার হয় নাকি? আমি তো জীবনে দেখিনি—
রানিবিবি এবার আবার একটা পান মুখে পুরল। বলল–বেশি সুন্দরী হলে কপালে সুখ হয় না, তা জানো তো?
কেন? আপনার কি সুখ হয়নি?
রানিবিবি কী একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই হঠাৎ বাইরে যেন কার গানের আওয়াজ হল। বাইরের গাছতলায় যেখানে সেপাইরা বসে ছিল, সেইখান থেকেই গানের শব্দটা আসছিল। রানিবিবি মন দিয়ে সেই গানটা শুনতে লাগল। কান্তও শুনতে লাগল। গানটা নতুন।
কোথায় শিবে, রাখো জীবে, ত্রৈলক্য-তারিণী।
তোমার চরণ নিলাম শরণ বিপদ-হারিণী ॥
আমি মা অতি দীন।
আমি মা অতি দীন তনু ক্ষীণ, হলো দশার শেষ
কোন দিন মা রবি সুতে ধরবে এসে কেশ ॥
