ছোট বউরানি জিজ্ঞেস করে–ডিহিদারের সে-লোকটা কোথায় গেল রে? আছে, না গেছে?
কোন লোকটা? সেই জনার্দন হারামজাদাটা? তাকে বাণ মেরে দিইছি
বাণ মেরেছিস? বলছিস কী তুই?
তা সত্যিই জনার্দন একদিন মুখে রক্ত উঠে মারা গিয়েছিল। সে এক কাণ্ড! রাজবাড়িতে কাজ করতে আসার পর থেকেই দুর্গার কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল লোকটার ওপর। কোথাও কিছু নেই, কারণে-অকারণে অমন ভেতরবাড়ির দিকে ছোঁক ছোঁক করে বেড়ায় কেন! তারপর যেদিন পেছন-পেছন গিয়ে দেখলে জনার্দন ডিহিদারের দফতরে গিয়ে ঢুকল, সেদিন আর সন্দেহ রইল না তার। তক্কে তক্কে রইল কখন জনার্দন আসে।
বহুদিন ধরে লোকটা খেতে পায়নি। বহুদিন ধরে রেজা আলিকে চাকরির জন্যে ধরেছিল। তিনটে মেয়ে নিয়ে এসে জনাইতে রেখে এসেছিল শ্বশুরবাড়িতে। যা-হোক করে দুটো টাকা হাতে পেলেই মেয়ে তিনটেকে নিয়ে আসবে হাতিয়াগড়ে, এই ছিল ইচ্ছে। কিন্তু কাজ কি অত সহজে মেলে। কোথায় জনাই আর কোথায় হাতিয়াগড়। মাঝে মাঝে বড় দেখতে ইচ্ছে করত মেয়েদের। মা-মরা মেয়ে তিনটের জন্যে মনটা ছটফট করত কেবল।
রেজা আলি বলেছিল–যদি রানিবিবির খবরটা কবুল করতে পারিস কাউকে দিয়ে তো তোর নোকরি মিলবে তার আগে নয়
কিন্তু কে কবুল করবে? কে জানে আসল ব্যাপারটা? কারওই তো জানবার কথা নয়। শেষকালে মরিয়া হয়ে উঠল জনার্দন। চোরকুঠুরির সন্ধানটা যখন একবার পেয়েছে তখন ভাবনা নেই। মাঝরাত্তিরে একদিন উঠল জনার্দন। জয় বাবা বুড়োশিবের জয়! জয় মা মঙ্গলচণ্ডীর জয়! যা থাকে কপালে বলে একদিন উঠল জনার্দন। ঘুমই আসেনি। কতদিন থেকেই ঘুম আসছে না ভেবে ভেবে। ভাবনাটা তিনটে মেয়ের জন্যেও বটে, আবার হাতিয়াগড়ের রানিবিবির জন্যেও বটে!
তখন সবাই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছ। বর্ষার রাত। পুকুরঘাটের ওদিকে বেশ শব্দ করে ব্যাঙ ডাকছে। উঠোনের কোণের দিরে রেড়ির তেলের আলো টিমটিম করে জ্বলছে। দেখতেই হবে চোরকুঠুরির ভেতরে কে আছে।
আস্তে আস্তে জনার্দন অতিথিশালা থেকে উত্তর-পূর্ব কোণের দরজাটা দিয়ে ভেতরের রান্নাবাড়ির দরদালানে ঢুকল। তারপর টিপটিপ পায়ে একেবারে ভেতরবাড়ির খিড়কি পেরিয়ে সোজা ভেতরবাড়ির অন্দরমহলে ঢুকল। তারপর সরু একটা গলি। গলির ভেতর পর পর খিলেন করা থাম। তারপর শেষ দিকটায় দোতলায় ওঠবার আলাদা একটা সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির নীচের ঘরখানাই চোরকুঠুরি। চোরকুঠুরির সামনে জনার্দন দেখলে দরজার ওপর তালা ঝুলছে। এরই ভেতরে নিশ্চয়ই আছে ছোট বউরানি। একটা মতলব বার করল জনার্দন। আস্তে আস্তে দরজায় টোকা দিতে লাগল।
কে? দুগ্যা?
ভেতর থেকে মেয়েলি গলায় প্রশ্নটা এল। ছোট বউরানির গলা। জনার্দন যদি কোনও উত্তর দেয় তো তখনই ধরে ফেলবে। হঠাৎ দরজার পাল্লা দুটো যেন একটু ফাঁক হয়ে গেল। সেই ফাঁকের ভেতর দিয়ে একটা গলার আওয়াজ বেরিয়ে এল–এই যে দুগ্যা, তুই এত দেরি করে এলি? এই চাবিটা নে দরজা খোল
জনার্দন অন্ধকারে নিঃশব্দে চাবিটা বউরানির হাত থেকে নিয়ে তালাটা খুলতেই একেবারে অন্ধকারের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল। একেবারে নিজের ভবিষ্যতের মতো নিচ্ছিদ্র অন্ধকার।
তুমি?
আমি! আমি ছোট বউরানি!
আর ‘আমি’ বলবার সঙ্গে সঙ্গে কে যেন একেবারে মারমুখী হয়ে জনার্দনের ওপর জোরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জনার্দন দু-একবার চিৎকার করবার চেষ্টা যে করেনি তা নয়। কিন্তু তার আগেই তার মুখ-কাননাক সব যেন কে কাপড় দিয়ে চেপে ধরলে। একটুখানি বাতাসের জন্যে হাঁসফাস করতে লাগল জনার্দন। একটুখানি কথা বলতে পারার জন্যে ছটফট করতে লাগল। তারপর যখন দম একেবারে বন্ধ হয়ে আসতে লাগল, তখন আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে এল সে।
.
পরদিন সকালে হাতিয়াগড়ের কেউ কিছু জানতেও পারলে না। যথারীতি বিশু পরামানিক এল ছোটমশাইকে খেউরি করতে। অতিথিশালার ঝি-ঝিউড়ি-চাকরনফর সবাই কাজকর্ম শুরু করে দিলে। তখনও জনার্দনের দেখা নেই। জনার্দন এমনিতে দেরি করেই কাজে আসত। শোভারামের মতো নিয়ম করে না-এলেও বেশি কামাই তার থাকে না। জগা খাজাঞ্চিবাবু বারবার করে বলে দিয়েছিল–এমন হাজরে দিতে দেরি করলে বাপু তোমায় দিয়ে আমাদের কাজ চলবে না–
কিন্তু জনার্দনের ওই এক কথা ছিল–মেয়ে! তিনটে মেয়ের দোহাই দিয়ে সে এমন অনেক কামাই করেছে।
সেদিন সবাই ভাবল, হয়তো জনার্দন মেয়েদের দেখতে গেছে, এসে পড়ল বলে। কিন্তু, যখন ছোটমশাই নেমে নীচেয় এলেন, তেল-গামছা নিয়ে গোকুল এসে হাজির, তবু জনার্দনের দেখা নেই।
জনার্দন কোথায় গেল?
ছোটমশাইয়ের কথার উত্তর কে আর দেবে। গোকুলই নিজে ছোটমশাইকে তেল মাখিয়ে দিলে। চান করিয়ে দিলে। ভিজে কাপড় নিয়ে শুকোতে দিলে উঠোনের দড়িতে। তারপর যথারীতি সংসার চলতে লাগল। কাক-পক্ষীতেও জানতে পারলে না কী ঘটনা ঘটে গেল হাতিয়াগড়ের বাড়ির চোরকুঠুরিতে।
আসলে ছোট বউরানিও কিছু জানতে পারেনি, বড় বউরানিও না। রোজ যেমন অনেক রাত্রে দুর্গা এসে চোরকুঠুরির দরজা খুলে দেয়, সেদিনও তাই দিয়েছে। তারপর ছোট বউরানি দুর্গাকে চোরকুইরির ভেতর রেখে বাইরে থেকে চাবি-তালা দিয়ে ওপরে ছোটমশাইয়ের ঘরে চুপি চুপি চলে গেছে। যাবার আগে দরজার পাল্লার ফাঁক দিয়ে চাবিটা দুর্গাকে দিয়ে গেছে। এমনি রোজই করে। তারপর যখন ভোররাত হয়, তখন কাক-চিল ওঠবার আগেই আবার ছোট বউরানি নীচের চোরকুঠুরির সামনে এসে দরজায় তিনবার টোকা দেয়। টোকার শব্দ পেলেই দুর্গা বলে–কে? দুগ্যা? কথাটা বললেই বুঝতে পারে ছোট বউরানি এসেছে। চাবিটা ফাঁক দিয়ে বাইরে বাড়িয়ে দেয়। সেই চাবি নিয়ে ছোট বউরানি তালা খুলে ভেতরে ঢোকে। তখন দুর্গা বাইরে তালা-চাবি দিয়ে আবার রোজকার সংসারের কাজ করে। এমনি রোজ।
