সবে ফটকের কাছে এসেছে, হঠাৎ বশির মিঞার সঙ্গে দেখা। একেবারে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে। কান্তকে দেখতেই পায়নি। তারপর কান্তই ধরলে গিয়ে কী রে, কোথায় যাচ্ছিস?
বশির বিরক্ত হয়ে উঠল–আরে তোর জন্যেই তো যত গণ্ডগোল, তুই একেবারে সকলকে বিপদে ফেলেছিস।
আমি? বিপদে ফেলেছি? কাকে?
আবার কাকে? সক্কলকে। মেহেদি নেসার সাহেব ভীষণ গোঁসা করেছে আমার ওপর। যাকে-তাকে নোকরি দিয়েছি বলে আমাকে মুখখিস্তি করে গালমন্দ করলে। আমার ফুপা মনসুর আলি সাহেব পর্যন্ত আমাকে খামোখা যা-তা বললে–তোর জন্যে আমার পর্যন্ত বদনাম হয়ে গেল। আমি এত তকলিফ করে জাফর আলি সাহেবের চিঠি বেহাত করে নিয়ে এলুম, তবু সাবাস পেলুম না কারও কাছ থেকে। তুই আমার কী সব্বনাশ করলি বল তো!
তবু কান্ত কিছু বুঝতে পারলে না কী তার অপরাধ।
বশির বললে–এখন তোর জন্যে আমাকে আবার হাতিয়াগড় যেতে হচ্ছে—
হাতিয়াগড়? কেন?
আরে রেজা আলি যে ধরে ফেলেছে সব।
কী রকম?
আরে হাতিয়াগড়ের জমিদারসাহেব বিলকুল সব ঠকিয়ে দিয়েছে মেহেদি নেসার সাহেবকে। রানিবিবি বলে যাকে চেহেল্-সুতুনে পাঠিয়েছে, ও তো আসলি রানিবিবি নয়! আসলি রানিবিবিকে তো নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছে। আর নিজের একটা নফর ছিল, তার লেড়কিকে রানিবিবি বলে চালিয়ে দিয়েছে। রেজা আলির চর সব খোঁজখবর নিয়ে জানিয়ে দিয়েছে নিজামতে। শালা মেহেদি নেসার সাহেব আমার ফুপাকে তলব দিয়েছিল, আমাকেও তলব দিয়েছিল। দু’জনকেই আচ্ছা করে গালাগালি দিলে, আমাকে জিজ্ঞেস করলে কে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, আমি বললুম তোর নাম
আমার নাম বলে দিলি?
বশির মিঞা বললে–হ্যাঁ, বলে দিলুম, শুনে তোকেও খুব আচ্ছা করে গালাগাল দিলে। এখন আমি যাচ্ছি হাতিয়াগড়ে, দেখি কী হয়–
বলে আর দাঁড়াল না। হনহন করে সোজা বাইরে বেরিয়ে গেল বশির মিঞা। আর ফিরেও একবার তাকাল না, দাঁড়াল না, থামল না।
*
রেজা আলির কাছে সব খবরই পৌঁছোয়। হাতিয়াগড়ের ডিহিদার বটে, কিন্তু খবর রাখতে হয় মুর্শিদাবাদের। মাঝে মাঝে মুর্শিদাবাদের কানুনগো কাছারি থেকে চিঠি আসে। তার ফয়সালা করতে হয়। ডিহিদারের দায়-ই কি কিছু কম? এক-এক সময় চাকরি রাখাই দায় হয়ে ওঠে রেজা আলির। বিটকেল সব হুকুম আসে নিজামতকাছারি থেকে। কখনও হুকুম আসে নানিবেগমের জন্যে পঞ্চাশ হুঁড়ি ঘি পাঠাও, ভাল আম তিন হাজার, কিংবা দশ কুড়ি মুরগি! বেশ ভালরকম জানে রেজা আলি, এ-জিনিস নানিবেগম চেয়েও দেখবে না, সমস্ত ভোগ করবে মেহেদি নেসার সাহেব। রাগে গরগর করে রেজা আলি, কিন্তু কিছু বলতেও পারে না। হুকুমমতো সব জিনিসই পাঠিয়ে দিয়ে হয় নৌকো বোঝাই করে।
আর মেহেদি নেসার সাহেবও জানে, রেজা আলি নিজের ঘর থেকে কিছু পাঠাবে না। পাঠাবে হাতিয়াগড়ের জমিদারের ঘর থেকে, কিংবা গাঁয়ের প্রজা-পাঠকদের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে।
সেদিনও তেমনি হুকুম এসেছে নিজামতকাছারি থেকে।
যথারীতি ডিহিদারের লোক গেছে ছোটমশাইয়ের কাছারিতে। জগা খাজাঞ্চিবাবু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে। নবাবের জ্বালায় কি মানুষ পাগল হয়ে যাবে? এই সেদিন ক’টা পাঁটি চাইতে এলে, দিলাম। তারপর আবার সেদিন গাছের গুড় চাইতে এলে, তাও দিলাম। তা আমরা কি নবাবের খাস প্ৰজা হে বাপু! যে যা চাইবে একেবারে দানছত্তর খুলে বসেছি? আমরা আবওয়াব দিইনে? আমরা মাথ পিলখানা দিইনে?
হঠাৎ যে জগা খাজাঞ্চিবাবু কেন এমন রেগে উঠল কে জানে। ডিহিদারের লোক বললে–তা হলে ডিহিদার সাহেবকে গিয়ে সেই কথা বলি গে?
জগা খাজাঞ্চিবাবুও বলে ফেললে–হ্যাঁ যাও, বলো গিয়ে ভয় করিনে আমরা
ঘটনাটা এমন কিছু নয়। যখন বড়মশাই এখানে ছিলেন তখন এমন অনেকবার কথা কাটাকাটি হয়েছে। যখন-তখন যা-তা আবদার করতে সাহস করেনি ডিহিদারের লোক। তখনকার ডিহিদারের সঙ্গে বড়মশাইয়ের বেশ ভাবসাব ছিল। একসঙ্গে ওঠা-বসা ছিল। এখন সে বড়মশাইও নেই, সেই ডিহিদারও নেই। এখন যেন আবদার দিনের-পর-দিন বেড়েই চলেছে। এমন করলে আর কদিন চালাতে পারবে জগা খাজাঞ্চিবাবু।
সব শুনে বড় বউরানি বললেন–তুমি ঠিক করেছ খাজাঞ্চিমশাই, কোনও অন্যায় করোনি—
আবার যদি আসে তো আবার আমি ওই কথাই বলব তো?
বড় বউরানি বললেন–হ্যাঁ, তাই বোলো
জগা খাজাঞ্চিবাবু কথাটা বলে চলেই যাচ্ছিল। কিন্তু বড় বউরানি আবার ডাকলেন। বললেন–আর একটা কথা শোনো, আমি যে চিঠি পাঠিয়েছিলাম নানিবেগমের কাছে, তার কোনও উত্তর আসেনি?
আজ্ঞে না, বড় বউরানি!
চিঠিটা বেগমসাহেবার হাতে ঠিক পৌঁছেছিল তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ, নিজামতের উঁকি মশাইয়ের হাত দিয়ে খোজাদের ঘুষ দিয়ে একেবারে চেহেল্-সুতুনে নানিবেগমসাহেবার হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল।
সে-চিঠির উত্তর আসেনি তাতে এমন কিছু ক্ষতি হয়নি হাতিয়াগড়ের। এখন দু’কূল বজায় আছে এইটেই শুভলক্ষণ! বউ বউরানি রোজ বুড়োশিবের মন্দিরে পুজো দিতে গিয়ে আরও অনেকক্ষণ ধরে জপতপ করেন। আর দুর্গা অনেক রাত্রে এসে চোরকুঠুরির ঘরের শেকলটা খুলে চুপিচুপি ঘরে ঢোকে। ছোট বউরানি জিজ্ঞেস করে–হা রে দুগ্যা এলি?
দুর্গা এসে ছোট বউরানির গা-গতর টিপে দেয়, পায়ে তেল মাখিয়ে দেয়। চুল আঁচড়ে দিয়ে চুড়ো করে খোঁপা বেঁধে দেয়। মিষ্টিমিষ্টি কথা শোনায়। বলে–আর দুটো দিন সবুর করো না ছোট বউরানি, আর দুটো তো মাত্তোর দিন
