নানিবেগম দেখেশুনে বললে–এবার পাঁয়জোড় পরিয়ে দে বেগমসাহেবাকে
বাঁদিটা তাই-ই পরাতে যাচ্ছিল।
মরিয়ম বেগম বললে–আবার পাঁয়জোড় পরে কী হবে নানিজি, আমার অভ্যেস নেই, পড়ে যাব শেষকালে
নানিবেগম বললে–তা হোক মা, পরো, মির্জা এখনই এসে যাবে সারা দিন-রাত ধরে দরবার করে খেটেখুটে মেজাজ গরম করে আসছে, তোমাকে খুবসুরত দেখালে তবু মনটা জুড়োবে বাছার। মির্জাকে তুমি ভয় কোরো না মা, তোমার মনে যা আছে সব খুলে বলবে। তোমার সোয়ামির কথা বলবে, তোমার সতিনের কথা বলবে, কেমন করে ডিহিদার পরওয়ানা পাঠিয়েছিল, তাও বলবে। কোনও কথা লুকোবে না। দেখবে, বাছা তোমার কথা সমস্ত মন দিয়ে শুনবে
কিন্তু যদি রেগে যান?
রাগবে কেন মা? লোকে অন্যায় করলেই মির্জা রেগে যায়, নইলে কেন মিছিমিছি রাগ করতে যাবে তোমার ওপর? তুমি কী অপরাধ করেছ? তোমার তো কোনও দোষই নেই! লোকের মুখে মির্জার বিরুদ্ধে যা-কিছু শানো সেসব তো বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলা!
তা সবাই ওঁর নামেই বা বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলে কেন?
তা বলবে না? বড় হলেই যে লোকের নজরে পড়ে। যাকে-তাকে গালাগাল দিয়ে তো আরাম হয় না মা! বড়কে গালাগাল দিতেও যেমন ভাল লাগে, বড়র গালাগাল শুনতেও যে তেমনি ভাল লাগে!
তারপর একটু থেমে বললে–তুমি যদি মা হাতিয়াগড়ে ফিরে যেতে চাও, তাও বলবে, আবার যদি তা না-চাও তো তাও বলবে মির্জাকে। আর যদি তুমি চাও যে কোনও জায়গায় গিয়ে নিরিবিলি বসবাস করবে, তাও বলবে। সে-ব্যবস্থাও করে দেবে আমার মির্জা। বাছার বড় দয়ার শরীর। তোমার জীবনটা যখন মির্জার জন্যে একবার নষ্ট হয়ে গেছে, তখন তো মির্জারই সব দায়িত্ব। জমি-জায়গা ইজারা দিয়ে তোমাকে কুঠি বানিয়ে দেবে, তুমি সেখানেই তোমার নিজের সংসার পাতবে, সেই-ই তো ভাল। তোমাকে এ চেহেল্-সুতুনেও থাকতে হল না, সোয়ামির সংসারেও যেতে হল না–আর একটা কথা…
কিন্তু কথা শেষ হবার আগেই নেয়ামত দৌড়োত দৌড়োতে এসেছে।
বন্দেগি নানিবেগমসাহেবা।
কী রে নেয়ামত? মির্জা আসছে?
না বেগমসাহেবা! নবাব খবর ভেজিয়েছে আজ চেহেল-সুতুনে আসতে পারবেন না।
কেন? কী হল? আবার কী খবর এল?
জগৎশেঠজিকে নবাব চড় মেরেছেন গোঁসা করে।
সেকী রে? কেন? কী করলে জগৎশেঠজি? নানিবেগম ভয়ে-আতঙ্কে শিউরে উঠল।
জগৎশেঠজি নবাবের মুখের ওপর জবাব করেছিল। তাই জগৎশেঠজিকে নবাব গ্রেফতার করে রেখে দিয়েছেন মতিঝিলে। তাকে ফাটকে পাঠানো হবে।
নানিবেগম দাঁড়িয়ে উঠলে। যেন মাথায় বজ্রাঘাত হল তার।
সেখানে আর কে কে আছে?
সবাই আছেন বেগমসাহেবা। মিরজাফর সাহেব, রাজা দুর্লভরাম, মিরবকশি, মোহনলাল, মিরমদন সাহেব, মেহেদি নেসার সাহেব, সবাই আছে–
মির্জা কী বলছে?
বেগমসাহেবা, মিরজাফর সাহেব নবাবকে বলেছে বাদশাহির সনদ না-পেলে নবাবের তরফে আর। কেউ থাকবে না–
নানিবেগম আর শুনতে পারলে না। তাড়াতাড়ি বললে–আমার তাঞ্জাম সাজাতে বল, আমি মির্জার সঙ্গে দেখা করতে যাব মতিবিলে। মিজার কপালে কি একটা দিনের জন্যেও শান্তি থাকতে নেই
বলে মরিয়ম বেগমের দিকে চেয়ে বললে–তুই একটু অপেক্ষা কর মা, আবার এক গণ্ডগোল বাধিয়ে বসেছে মির্জা, একটা দিনের জন্যে ওকে শান্তি দেবে না কেউ। কী কাণ্ড করে বস! জগৎশেঠজিকে চড় মেরে বসেছে, রেগে গেলে ওর জ্ঞান থাকে না ছোটবেলা থেকে কী যে করি ওকে নিয়ে–
বলে বাইরে গেল ছুটে গিয়ে আমিনা বেগমের ঘরে ঢুকলো বললে–শুনেছিস, জগৎশেঠজিকে চড় মেরেছে মির্জা, মেরে ফাটকে পুরে রেখেছে–মির্জা আজ চেহেল সুতুনে আসছে না–
আমিনা বেগম তখন বোধহয় নিজের কারবারের হিসেবপত্র দেখছিল। মুখ তুলে বললে–তুমিই দেখো, আমার ওসব দেখা আছে, তোমরাই আদর দিয়ে ওকে ছোটবেলা থেকে নষ্ট করে দিয়েছ–এখন বললে–কী হবে?
বলে আবার আফিঙের হিসেবের কাগজপত্রের মধ্যে মাথা গুঁজে দিলে।
নানিবেগম তখন গেল লুৎফুন্নিসার ঘরে।
সর্বনাশ হয়েছে বহু, জগৎশেঠজিকে চড় মেরেছে মির্জা, ফাটকে আটকে রেখেছে তাকে, জাফরসাহেব বলেছে মির্জার দলে আর থাকবে না! মির্জা খবর পাঠিয়েছে সে আজ চেহেল্-সুতুনে আসছে না। এখন যাবি? যাবি মা তুই মতিঝিলে? তা তুই গিয়েই বা কী হবে? তোর কথা তো ভারী শোনে সে! আমি একলাই যাই, দেখি জাফরসাহেবকে বলে-কয়ে ঠান্ডা করতে পারি কি না–আমার হয়েছে বুড়ো বয়েসে এক জ্বালা
বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নানিবেগম। লুৎফুন্নিসা বেগম একটা কথারও উত্তর দিলে না। শুধু পাথরের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। আর মরালীর ঘরে মরালীও তখন আস্তে আস্তে গয়নাগুলো সব খুলে ফেলতে লাগল একে একে। হঠাৎ তার যেন কাঁদতে ইচ্ছে করল প্রাণ ভরে।
*
মনসুর আলি মেহের সাহেবের দফতরে যথারীতি কান্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। কাজ না থাকলে নিজামতি কাছারিতে একবার করে হাজরে দিতে হয়। যদি কোথাও কাজ থাকে তো জেনে নিতে হয়, আর নয় তো হাজরে দিয়েই বাড়ি। সেই মোল্লাহাটি থেকে আসার পর আর কোনও কাজ পড়েনি তার ভাগে।
চলেই আসছিল কাছারি থেকে এসে সেই সারাফত আলির দোকানে ঢোকা। কিন্তু সারাফত আলিকেও যেন আর ভাল লাগত না। বাদশার কাছে সেই কথাগুলো শোনবার পর থেকেই যেন মনটা বিরস হয়ে গেছে মিঞাসাহেবের ওপর।
নিজামত কাছারির সবারই সেদিন যেন একটু ব্যস্ত ব্যস্ত ভাব। যেন অন্যদিনের চেয়ে বেশি তাড়াহুড়ো। কারও কথা বলবার সময় নেই।
