শেষে লিখেছে–সঙ্গে ওয়াটসন নামক আরও একজন ফিরিঙ্গি যোদ্ধা আসছে। সত্য-মিথ্যা জানি না। চরের মুখের সংবাদ। কিন্তু সত্য হোক বা না হোক, ফিরিঙ্গি কোম্পানি যে বসে নেই এ তাহারই প্রমাণ। তাহারা আট-নয়শত ফিরিঙ্গি পল্টন এবং এক হাজার সিপাহি সংগ্রহ করতে মনস্থ করেছে। আমি তাহাদের অগ্রগমনে বাধা দিতে মনস্থ করেছি। এখন যা কর্তব্য হয় জানাতে আজ্ঞা হয়। ইতিবশংবদ…
ইব্রাহিম খাঁ তখনও হাঁফাচ্ছিল। বুড়ো মানুষ। কান্তকে বললে–তুমি চলে যাও বাবাজি, ও যা হবার তা হবে যে-যার কপাল নিয়ে এসেছে সংসারে। তুমিই বা কী করবে, আর আমিই বা কী করব–
কান্ত যাবার আগে বলে গেল আপনি যেন কাউকে বলবেন না পুরকায়স্থমশাই–
পুরকায়স্থমশাই বললে–না, না, আমি কেন বলতে যাব বাবাজি! আমার কী? যার চরিত্র খারাপ হবে তার চরিত্র খারাপ হবে। ভালই হয়েছে বাবাজি, ও কন্যার সঙ্গে তোমার বিবাহ হয়নি, নষ্ট-চরিত্রা কন্যার পাণিগ্রহণ পাপ। সে-পাপেও নিজেও মরে, অপরকেও মারে তুমি কিছু ভেবো না, ভগবান যা। করেন মঙ্গলের জন্য
কান্ত চলে যাবার পর ইব্রাহিম খাঁ সরাবখানার মধ্যেই বসে ছিল নাকে কাপড় চাপা দিয়ে। হঠাৎ যেন অনেকগুলো লোকের পায়ের শব্দ শোনা গেল। দরবার শেষ হয়ে গেল নাকি তবে! সবাই যাচ্ছে। কোথায়?
কিন্তু না। পায়ের শব্দটা আসছে বাইরের দিক থেকে। একটু উঁকি মেরেই দেখতে পেলে। জগৎশেঠজির তাঞ্জাম এসে চবুতরে নামল। সঙ্গে পাইক-পেয়াদাবরকন্দাজ। জগৎশেঠজি তাঞ্জাম। থেকে নেমে সোজা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলেন।
মতিঝলের দরবারে কতবার এসেছেন জগৎশেঠজি। তার আসা এই প্রথম নয়। কিন্তু এবার যেন জরুরি তলব দিয়েছে নবাব। নবাব-বাদশার ব্যাপার। তার মধ্যে চুনোপুঁটি সচ্চরিত্র পুরকায়স্থর সমস্যা নিয়ে কে মাথা ঘামাবে। বড় আরামে আছে সব! খাচ্ছেদাচ্ছে ফুর্তি করছে, আর বেগমদের নাচ দেখছে গানা শুনছে। টাকার কথাও ভাবতে হয় না, কেমন করে পেট চলবে তাও ভাবতে হয় না।
হঠাৎ নেয়ামত খা-কে যেতে দেখে ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলে–খিদমদগারজি, আজ যে দারু খাচ্ছে। কেউ, কী হল? কেউ মদ খাবে না?
আরে দুর বুঢঢা! এখন সব মাথা গরম হয়ে রয়েছে, এখন দারু খাবে কে!
কেন? মাথা-গরম কীসের? নবাব-বাদশাদের আবার মাথা-গরম কীসে হল?
নেয়ামত সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলে গেল–তুই বুঝবিনে বুড়ো, জগৎশেঠজি এসেছে, নবাব রেগে একেবারে সব ভুলক্লাম করে দিচ্ছে, এখন চুপ কর
বলতে বলতে সোজা ওপরে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দরবারের ভেতরে তখন নবাব চিৎকার করছে মহতাপচাঁদ জগৎশেঠের দিকে চেয়ে তা হলে আপনি কী করতে আছেন? বাদশার সনদ এনে দেওয়া তো আপনার কাজ! এতদিন আপনি আমাকে বাদশার সনদ এনে দেননি কেন?
সত্যিই এতদিন এ-জিনিসটার দিকে কারও নজর পড়েনি। পূর্ণিয়ার শওকত জঙ দিল্লির বাদশার কাছ থেকে উজির-এ-আজম-এর শিলমোহর করা সনদ এনে ফেলেছে। সেই সনদের জোরে শওকত জঙ কড়া চিঠি লিখেছে নবাবকে। সে-চিঠি তখনও নবাবের হাতে। সেই চিঠি পেয়েই নবাব অপমানে ছটফট করতে করতে মহতাপ জগৎশেঠকে ডেকে পাঠিয়েছিল।
এতদিন নবাব হয়েছি, সনদ আনতে এত দেরি হচ্ছে কেন? এই দেখুন শওকত কী লিখেছে আমাকে লিখেছে আমি স্বনামে বঙ্গ-বেহার-উড়িষ্যার সুবাদারি-পদের বাদশাহি সনদ পাইয়াছি। কিন্তু তুমি আমার ভ্রাতা, তোমার প্রাণ-বধের ইচ্ছা করি না। তুমি তোমার ভরণপোষণ-জন্য ঢাকা প্রদেশের যেখানে ইচ্ছা যাইতে পারো, তোমার প্রার্থনা-মতো ইহার জন্য সনদ প্রদত্ত হইবে। ইতিমধ্যে রাজকোষ ও অন্যান্য দ্রব্যাদি আমার কর্মচারীগণকে বুঝাইয়া দিয়া ওই অঞ্চলে চলিয়া যাইবে। অতি শীঘ্র এই পত্রের উত্তর পাঠাইবে। আমি রেকাবে পা তুলিয়া উত্তরের অপেক্ষা করিতেছি।’ এরপর বলুন আপনার কী বলার আছে?
মহতাপ জগৎশেঠ বললেন–জাঁহাপনার যা-অভিরুচি তাই-ই করবেন।
কিন্তু নবাব সুবাদার আমি, না শওকত জঙ!
আপনি জাঁহাপনা, আপনি। আপনিই বাংলা-বেহার-উড়িষ্যার নবাব-সুবাদার।
কিন্তু তা হলে এতদিন আমি কীসের জোরে নবাবিআনা করছি? আমার সনদ কোথায়? সনদের কথাটাও কি আপনাকে আমায় মনে করিয়ে দিতে হবে? আপনারা কি আমাকে এটুকু সাহায্যও করবেন না? আপনারাই তো আমার বলভরসা। আপনারা যদি সহায় না হন তো আমি কার ভরসায় দেশ শাসন করব?
জগৎশেঠ বললেন–সনদ আনতে তো মোহর লাগবে-নজরানা লাগবে!
তা লাগবে লাগবে। যা লাগে তা তো আপনারই দেওয়া কাজ। কত মোহর লাগবে, কী কী নজরানা দিতে হবে, সে তত আপনিই জানেন। আপনারাই তো বরাবর সনদ আদায় করে এনে দিয়েছেন। তেমনি
আমার বেলাতেও দেবেন। আমি কি সেসব কথা নিয়েও মাথা ঘামাব?
কিন্তু সে যে অনেক টাকা।
অনেক টাকা লাগলে অনেক টাকাই দেবেন।
মহতাপ জগৎশেঠ উত্তরে অনেক কথাই বলতে পারতেন, কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে বললে–তাতে প্রজাদের ওপর অত্যাচার হবে
সঙ্গে সঙ্গে নবাবের রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠল। সামনে তেড়ে এগিয়ে গিয়ে বললে–কী…?
ইব্রাহিম শুধু দেখেছিল সিঁড়ি দিয়ে কে যেন দুমদুম করে নেমে গিয়েছিল। তারপর ভাল করে চেয়ে দেখেছিল, নেয়ামত! আর কিছু জানতে পারেনি সে!
*
চেহেল্-সুতুনে তখন মরিয়ম বেগমকে মনের মতন করে সাজিয়ে তুলেছে নানিবেগম। কত রকমের গয়না পরিয়েছে। হিরে-মুক্তোর ছড়াছড়ি। চোখে সুর্মা দিয়েছে, কানে আতর। কোনও গয়নাটারই নাম জানে না মরালী। বাপের জন্মেও কখনও এসব দামি শৌখিন জিনিস দেখেনি। হাতির দাঁতের আয়নাটা নিয়ে বাঁদি মুখের সামনে ধরেছে। নিজেকে যেন তার সুন্দরী মনে হল বড়। ভালবাসতে ইচ্ছে করল তার।
