*
মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা জন্মেছিল ১৭৩০ সালে। আর এক দেশে, আর এক ভূখণ্ডে জন্মেছিল আর একটি ছেলে। তার জন্মের তারিখ ১৭২৫। শুধু পাঁচটা বছরের তফাত। তার নাম রবার্ট ক্লাইভ। ইংলন্ডে সুপশায়ারের বাজারের সেই ছেলেটাই যে একদিন কুড়ি বছর বয়েসে মাদ্রাজে এসে জাহাজ থেকে নামবে, তা তার বাপও জানত না, তার গর্ভধারিণীও জানত না। দু’বার পিস্তল নিয়ে নিজের বুক তাগ করে ঘোড়া টিপেছিল সেই ছেলে, কিন্তু গুলি বেরোয়নি। সেদিন সে-গুলি বেরিয়ে ক্লাইভের বুকে বিঁধলে উদ্ধব দাসকে বেগম মেরী বিশ্বাস’ লিখতে হয় না। মাসকাবারি ছটাকা মাইনের চাকরি। বিদেশ-বিভুইতে এসে এর চেয়ে ভাল চাকরি করবার বিদ্যেও নেই তার, বুদ্ধিও নেই। অন্তত বাপ-মায়ের তাই মনে হয়েছিল। বখাটে হয়ে যে জন্মেছে, তার কপালে ভবিষ্যতে এই ছাই-ই থাকে। তার চেয়ে এই-ই ভাল। এই ছটাকা মাইনে আর এই জল-জঙ্গল-মশা-মাছির দেশ। সারাদিন কোম্পানির আপিসে কলম পেযো, হিসেবপত্তর রাখো, আর রাত্তির হলে কুঠিবাড়ির এক কোণে নাক ডাকিয়ে ঘুমোও। কিন্তু শান্তি যার কপালে নেই, তার কোথাও গিয়েই শান্তি নেই। নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশে এসেও তার যেন ঝগড়া করা স্বভাব গেল না। আশেপাশের সবাই যেন তার শত্রু। কেউ দেখতে পারে না ছেলেটাকে। ওপরওয়ালা কর্তারা সবাই বলে–ওয়ার্থলেস
ছেলেটা শোনে, শুনে রেগে যায়, রেগে গিয়ে ঝগড়া করে। হোম-বোর্ডে তার নামে কর্তারা কমপ্লেন করে। সে-চিঠি এখান থেকে বিলেতের কর্তাদের হাতে পৌঁছোতে ছ’মাস লাগে, উত্তর আসতেও আবার, ছ’মাস। কিন্তু ততদিনে ছেলেটা বুঝে নিয়েছে ইন্ডিয়ার মানুষদের হালচাল। বুঝে নিয়েছে ইন্ডিয়ার ক্লাইমেট। বুঝে নিয়েছে যে এদেশে চাকরি করা তার চলবে না। এখানে এসে ভুল করেছে সে। এখানে এসে একদিন চিঠি লিখেছিল দেশে–I have not enjoyed a happy day since 1 left my native country!
শেষকালে ইতিহাসের ভাগ্যবিধাতা ইন্ডিয়ার এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করলে, যার পর ছেলেটা আর চুপ করে থাকতে পারলে না, আগুনের কুণ্ডলীর মধ্যে সশরীরে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল।
তা সে আগুনই বটে। ১৭০৭ সালে বাদশা আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে সারা দেশে বলতে গেলে আগুনই জ্বলে উঠল। সে আগুন আর নিভল না। তারপর যখন ১৭৩৯ সালে নাদির শা দিল্লির বুকে ছুরি বসিয়ে দিলে, মোগল বংশের নাভিশ্বাস শুরু হল বলতে গেলে সেই তখনই। বলতে গেলে মোগল-সাম্রাজ্য তখনই চিরকালের মতো খতম হয়ে গেল। দক্ষিণে দুটো বড় ভূখণ্ড, কর্ণাটক আর দাক্ষিণাত্য। দুটোতেই তখন থেকে শুরু হল বংশানুক্রমিক সুবাদারগিরি। নিজাম-উল-মুলক আর কর্ণাটের নবাবের মতো বাংলাদেশেও সেই নিয়ম চালু হয়ে গিয়েছে ততদিনে। অর্থাৎ জোর যার মুলুক তার। সুবাদার, নবাব, জায়গিরদার, ডিহিদার থেকে পাহারাদার পর্যন্ত সবাই লুটেপুটে খাবার জন্যে মারমুখী হয়ে বসে আছে আর তরোয়াল শানাচ্ছে। খেতে ধান থাকতেও নিশ্চিন্ত থাকবার উপায় নেই। ঘরে সুন্দরী বউ রেখেও নির্লিপ্ত থাকবার অবস্থা নেই কারও।
ছেলেটা কিন্তু ততদিনে বেশ কেষ্ট-বিধু হয়ে উঠেছে। লড়াই করে অদ্ভুত সাহস দেখিয়ে নাম কিনেছে বেশ। হইচই পড়ে গেছে পার্লামেন্ট। কে এই রবার্ট ক্লাইভ? না, এ সেই ছ’ টাকা মাইনের রাইটার। পল্টনের দলে নাম লিখিয়ে রাতারাতি একেবারে সকলের নজরে এসে গেছে। এক-একটা লড়াই করে আর জয়জয়কার পড়ে যায় তার। ডাকো, ডাকো এখেনে, ডেকে পাঠাও ওকে। সেই ছেলেকে দেশে ডাকিয়ে নিয়ে গিয়ে একেবারে সবাই বাহবা দিয়ে উঠল। হিপ হিপ হুররে। হিপ হিপ হুররে।
নাম-ধাম তো হল। টাকাও হয়েছে বেশ। কিন্তু মানুষের কি লোভের শেষ আছে?
ইতিহাসের অমোঘ বিধানে যাকে একদিন চিরস্মরণীয় হতে হবে, তার কপালে বুঝি অত সহজে শান্তি আসে না। তাকে সুখ শান্তি ঘুম আরাম কিছুই পেতে নেই। সে-সব সাধারণ মানুষের জন্যে। বাংলার নবাবের চেয়ে যে পাঁচ বছর আগে পৃথিবীতে এসেছে, তাকেই এখানে এসে মুখোমুখি মুলাকাত কতে হবে আবার তারই সঙ্গে, এই-ই যদি বিধান হয়ে থাকে তো হোক। ঈশ্বরের ইচ্ছাই পূর্ণ হোক। নিজের দেশে যার সম্মান নেই, তার বিদেশে যাওয়াই ভাল। যে-দেশে সে এতদিন কাটিয়ে গেছে, যে জল-হাওয়ায় সে এত লড়াই করে গেছে, যেখানকার মাটিতে সে নিজের প্রতিষ্ঠা করেছে নিজের হাতে, সেখানেই তার গতি হোক।
যেদিন আবার ছেলেটা করমণ্ডল উপকূলে জাহাজ থেকে নামল, ঠিক সেইদিনই কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছে ফিরিঙ্গিরা। ঠিক সেই একই দিনে। সেই ২০ জুন ১৭৫৬ সালে। এ এক অদ্ভুত যোগাযোগ ইতিহাসের।
ভাল করে নবাবের গায়ের ঘাম তখনও শুকোয়নি। একটু যে জিরিয়ে নেবে নবাব, একটু যে ফুর্তি করবে, একটু বিশ্রাম করবে চেহেল্-সুতুনে গিয়ে, তারও সময় দিলে না নবাবের খোদাতালা।
নবাব আবার দরবারে গিয়ে বসলে। দেওয়ান মানিকচাঁদের চিঠিটা নিয়ে পড়লে
দেওয়ানজি লিখেছে–আমাদের চরের মুখে খবর পেয়েছি, ফিরিঙ্গিরা ফলতার কাছে গিয়ে জাহাজ নোঙর করে ছিল এতদিন। এবার খবর পেলাম মাদ্রাজের সেন্ট ডেভিড কেল্লা থেকে কোম্পানি মেজর কিলপ্যাট্রিক বলে এক ফিরিঙ্গিকে পাঠিয়েছে আমাদের সঙ্গে লড়াই করবার জন্যে। আর একজন ফিরিঙ্গি আসছে, তার নাম রবার্ট ক্লাইভ। আমার মনে হয়, যুদ্ধের জন্যে আমাদের তৈরি থাকতে হবে।
