তারপর হঠাৎ গলাটা নিচু করে বললে–বললে–তো অনেক কথাই বলতে হয় ভাই, বলি না বলে তাই। কিন্তু জানি তো সব! আমার ওপর চোখ টাটালে আমিও একদিন রাগের মাথায় সব বলে দেব
কী বলবে?
তবে তোমাকে চুপি চুপি বলি। কাউকে যেন বোলো না ভাই। এখেনে চকবাজারে সারাফত আলি বলে একজন পাঠানের দোকান আছে। সে তো বলেছি তোমাকে। বাইরে খুশবু তেলের দোকান। কিন্তু তার মতলব খুব খারাপ ভাই, জানো। সে তো আরক বেচে। সে-আরক আমরা খাইও, কিন্তু আসল। ব্যপারটা আলাদা।
কী রকম?
এখন বুড়ো থুত্থুড়ো হয়ে গেছে। কিন্তু শুনেছি যখন জোয়ান বয়েস ছিল তখন থাকত দিল্লিতে। সেখেনে নবাব আলিবর্দির দাদা হাজি আহম্মদ ওর বউকে ফুসলে নিয়ে আসে। খুব সুন্দরী বউ। সেই বউ ফুসলে নিয়ে আসার পর থেকেই হাজি আহম্মদের ভাগ্য ফিরল। তার আপন ভাই আলিবর্দি খাঁ, নিজের অন্নদাতা সুজাউদ্দিনের ছেলে নবাব সরফরাজ খাঁ-কে খুন করে এই মুর্শিদাবাদের নবাব হল, আর সারাফত আলির অবস্থা তার পর থেকেই খারাপ হতে শুরু করল। সেই সময় থেকে বুড়ো এইখেনে এসে দোকান খুলেছে, আর কেবল হাজি আহম্মদের বংশ ধ্বংস করবার চেষ্টা করছে–
হাজি আহম্মদের বংশ মানে?
সেটা আর বুঝলে না! নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা তোতা হাজি আহম্মদেরই নাতি হল। নবাব আলিবর্দি খাঁ’র তো নিজের ছেলে হয়নি। তিন মেয়ের সঙ্গে দাদার তিন ছেলের বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। আমাদের নবাব তো হাজি আহম্মদেরই ছোট ছেলের ছেলে তাকেই তো আলিবদি খাঁ পুষ্যিপুত্তর নিয়েছিল–
তারপর গুলসন কথা বলতে বলতে যেন একটু দম নিতে লাগল।
মরালী বললে–তারপর?
তারপর এখেনে এসে বুড়ো সারাফত আলি ওই দোকান করেছে। আর খোজাদের ঘুষ দিয়ে দিয়ে আরক বেচছে! আর শুধু কি আরক? খোজাদের ঘুষ দিয়ে দিয়ে আর কী করে জানো ভাই?
মরালী জিজ্ঞেস করলে–কী?
নজর মহম্মদ তোমার কাছে এসে কিছু বলে না?
কী বলবে?
বাইরে থেকে জোয়ান জোয়ান ছোকরা আনবার কথা? তা আর কিছুদিন থাকে না, তখন দেখবে তোমাকেও ঠিক বলবে? আগে সারাফত আলি এখেনে একটা ছেলেকে পাঠাত, সে ভাই কী চমৎকার দেখতে তোমাকে কী বলব। তার নাম রশিদ। যেমন স্বাস্থ্য, তেমনি গড়ন। একেবারে কন্দর্পের মতো চেহারা ভাই, কিন্তু স্বাস্থ্য ভাল হলে কী হবে, এতগুলো তাগড়া তাগড়া বেগম, এদের সকলের সঙ্গে সে। একলা যুঝতে পারবে কেন? তা এখেনে এলেই সবাই মিলে তাকে ছেকে ধরত। সন্ধেবেলা আসত আর। ভোর হবার আগে কেউ ছাড়ত না। একেবারে ছিঁড়ে খেত তাকে। অমন স্বাস্থ্য ভাই, দু’দিনে শুকিয়ে। হাড়-সার হয়ে গেল! তারপর আর সে আসত না। তখন পাঠাত আর একটা ছেলেকে, তার নাম কেশর। সেও যেন ভাই একেবারে রাজপুত্তুরের মতন দেখতে! কোত্থেকে যে ভাই সারাফত আলি অমন বাছা বাছা ছেলেদের আমদানি করত কে জানে! এমনি করে এক-একজনকে সারাফত আলি চেহেলসূতুনে পাঠিয়েছে আর দুদিন পরেই তারা শুকিয়ে একেবারে আমসি হয়ে গেছে। এদানি একটা পাঠান ছেলে আসত, তার নাম বাদশা। ক’দিন ধরে খুব এল, সব বেগমদের ঘরে রাত কাটাতে লাগল পালা করে। কিন্তু একদিন সে-ও আর এল না, তার আসা বন্ধ হয়ে গেল। এখন আবার অন্য একজনকে ধরেছে
আবার আর একজন? এখানে রোজ রাত্তিরে আসে?
আমি এখনও দেখিনি তাকে। নজর মহম্মদ তো আমাকে কদিন ধরে খুব খোশামোদ করছে। রোজই বলে–গুলসন বিবি, একজন খুবসুরত জোয়ান লেড়কা আছে, তাকে আনব?
মরালী জিজ্ঞেস করলে সে কে?
ওই সারাফত মিনসের লোক, আর কে! এবার নাকি হিন্দু, আর মুসলমান নয়–রোজ খোশামোদ করছে। আনতে পারলে তো সারাফত আলির কাছ থেকে মোহর পাবে কিনা–
কেন?
সারাফত আলি তো ওই লোভ দেখিয়েই ছেলেগুলোকে এখেনে পাঠায়। বেটা হাজি আহম্মদের বংশ ধ্বংস করতে চায়। আর খোজারাও সেই টাকায় সোরা, আফিং, রেশম, এইসবের কারবার করে। খোঁজাগুলোর কি কম টাকা আছে নাকি, ভেবেছ? তা এবার আমি জিজ্ঞেস করলাম–এ কে? একে কেমন দেখতে? নজর মহম্মদ বললে–খুব খুবসুরত দেখতে গুলসন বিবি। একেবারে তাজা জোয়ান। এ হিন্দুবাচ্চা। এর নাম কান্তবাবু
মরালী আকাশ থেকে পড়ল–কান্তবাবু? কান্ত কী? পদবি কী?
কান্ত সরকার…
কিন্তু কথাটা পুরো শেষ হবার আগেই আরও কয়েকজন এসে হাজির। বব্বু বেগম, তক্কি বেগম, পেশমন বেগম, সবাই এসে ঢুকে পড়েছে মরালীর ঘরে। সবাই খবর পেয়ে গেছে নবাব চেহেল্-সুতুনে আসছে মরিয়ম বেগমের সঙ্গে দেখা করতে। সবাই হিংসে করছে আজ তাকে। সবাই দেখতে এসেছে নবাব চেহেসতুনে আসবে বলে কী সাজ করেছে মরিয়ম বেগম, কী পোশাক পরেছে। আজ যদি নবাবের ভাল লেগে যায় মরিয়ম বেগমকে তো আজ অনেক মোহর পাবে সে। অনেক টাকার মালিক হয়ে যাবে। মরালীও আজকে সবাইকে মুখোমুখি প্রথম দেখলে।
কিন্তু নানিবেগমই বাদ সাধল। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়েছে। ঢুকেই বললে–তুম সব ইহা কিউ? তুম যাও ইহাসে, সব নিকলোনিকলো–
সকলকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিলে নানিবেগম। দিয়ে বাঁদিকে ডাকলে। জুবেদাকে বাতিল করে দেবার পর মরিয়ম বেগমের জন্যে নতুন বাদি এসেছে, তাকে ডাকলে। ডেকে মরালীকে সাজাতে বসল। মির্জা আসবে চেহেল্-সুতুনে এতদিন পরে, তবু যদি তার মন ভোলে। তবু যদি মরিয়ম বেগমের দিকে ফিরে চায়। তবু যদি মরিয়ম বেগমকে দেখে মনে শান্তি পায়। সুখ পায়। দিদিমার প্রাণ। মির্জার একটুকু সুখ শান্তি দেখলে তবু দিদিমার প্রাণটা জুড়োবে। সেইখানে বসে বসে মরালীকে প্রাণভরে সাজাতে বসল।
