মরালী জিজ্ঞেস করত–কেন গো। আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলে কেন তুমি?
সাহেব বলত–এখনও মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে আমার তা জানো মেরী?
কেন? তোমার এত কষ্ট কীসের?
তখন সাহেবের প্রচুর টাকা। তখন রবার্ট ক্লাইভও যা, দিল্লির বাদশাও তাই। মরালীর অবাক লাগত সাহেবের কথা শুনে। মনে পড়ত মুর্শিদাবাদের নবাবের কথা। মুর্শিদাবাদের নবাবেরও ঘুম আসত না। রাত্রে। ক্লাইভ সাহেবও ঘুমোত না।
মরালী জিজ্ঞেস করত–সত্যি বলো না সাহেব, তোমার কীসের কষ্ট?
সাহেব বলত–সে কি তুমি বুঝতে পারবে? সবাই আমার শত্রু–এমন কেউ নেই যে আমার ভাল চায়, যে আমার ওয়েল-উইশার, এমন কেউ নেই আমার ভাল হলে যে আনন্দ পায়।
মরালী বলত–কেন, মেজর কিলপ্যাট্রিক সাহেব, ওয়াটসন সাহেব, তোমার কোম্পানির বড় সাহেবরা
সাহেব বলত–কেউ না, কেউ না, কেউ না
সাহেব ‘না’ বলত আর মাথা নাড়ত। যেন যন্ত্রণায় সাহেবের বুক ভেঙে যেত কথা বলতে বলতে। যে-মানুষটা দু’বার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল, দু’বারই বেঁচে গিয়েছিল। সাহেবের কথাগুলো শুনতে শুনতে মরালীর নানিবেগমের কথা মনে পড়ত। নানিবেগম বলেছিল–দুশমনির কি কোনও কারণ থাকে মা, ও এক-একজনের কপালে লেখা থাকে। তারা দুশমন নিয়েই জন্মায়। তারা ভালই করুক আর মন্দই করুক, তাদের দুশমন থাকবেই
কিন্তু এসব কথা এখন থাক।
উদ্ধব দাস তার কাব্যে এসব কথা অনেক পরে লিখেছে, আমি আগে থেকেই শেষের কথাগুলো বলে ফেলছি। মরালী কি তখন নবাবকে ভাল করে চিনেছে না ক্লাইভ সাহেবকেই চিনেছে! একজনের বয়েস ছিল তখন মাত্র ছাব্বিশ বছর। ছাব্বিশ বছরেই নবাবি পেয়ে সে-মানুষটা যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আর একজনের বয়েস ছিল তখন মাত্র একত্রিশ। সেই একত্রিশ বছর বয়সেই দেশ-ঘর-সমাজ ছেড়ে এসে হাজির হয়েছিল এই জলকাদা-মশা-মাছির দেশে।
নানিবেগম বলত–আমি তো সেই জন্যেই কোরান নিয়ে থাকি মা দিনরাত, খোদার কাছে দিনরাত দোয়া চাই, খোদাতালাকে কেবল বলি, মির্জা যেন আমার শান্তি পায় খোদা, মির্জা যেন আমার দুদণ্ড ঘুমোত পারে, মির্জা যেন ভাল থাকে।
সেদিন সকাল থেকেই তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছিল চেহেল্-সুতুনের ভেতরে। নবাব মতিঝিল থেকে চেহেল্-সুতুনে আসবে। সব বেগমই আতর-কুম-পেশোয়াজ-পায়জোড় নিয়ে ব্যস্ত। গুলসন সেদিন আর লুকিয়ে লুকিয়ে এল না। একেবারে সোজা দিনের আলোতেই এসে ঘরে ঢুকল।
বললে–তুমি নাকি ভাই মতিঝিলে গিয়েছিলে?
মরালী বললে–তুমি কোত্থেকে শুনলে?
এমনি শুনলাম। নবাব তোমাকে কী বললে? তোমাকে দেখে হেসেছে?
মরালী বললে–হ্যাঁ।
তবে আর কী, ভাই। তবে তো তুমি মেরে দিয়েছ!
মরালী বললে–কেন, তুমিও তো কাল মতিঝিলে গিয়ে নেচে অনেক মোহর পেয়েছ শুনলাম, তোমারও তো ভাগ্য ভাল!
গুলসন বললে–কিন্তু তার জন্যে কত খরচ করতে হয়েছে, তা জানো! ওই নজর মহম্মদকে কত ঘুষ দিয়েছি, কত খোশামোদ করেছি, কিন্তু শেষপর্যন্ত মজুরি পোষাবে কি না কে জানে ভাই!
কেন?
সকলের চক্ষুশূল হয়ে গেছি যে ভাই! সবাই আমার দিকে টেরিয়ে টেরিয়ে চাইছে। যেন আমি সকলের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি। অথচ, তুমি তো ভাই জানো, আমি কারও মন্দ চাইনে। আমি চাই সকলের ভাল হোক! অথচ তোমরা যে ভাই কত টাকা রোজগার করছ, তার জন্য তো আমি কিচ্ছু বলি না
মরালী অবাক হয়ে গেল। বললে–টাকা? বেগমরা টাকা রোজগার করছে? সেকী?
ওমা, টাকা রোজগার করছে না? সবাই তো কারবার করে। তুমি কি ভাবছ কেবল সবাই চুপ করে বসে থাকে?
কীসের কারবার করে সবাই?
কত রকমের কারবার করে। কারবার কি একটা? সোরা কেনা-বেচা করে, আফিং কেনা-বেচা করে, রেশম কেনা-বেচা করে। ওই যে নবাবের মা, আমিনা বেগম, ওর কি কম টাকা মনে করেছ? বিধবা হয়ে এস্তোক এখেনে এসেছে, সেই থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করেছে কলকাতার ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে কারবার করে। আর ওই বব্বু বেগম! ওরা সবাই লাখলাখ টাকার মালিক! আমি তো তাতে কিছু বলিনি কোনওদিন। আমি ভাবতুম যদি কোনওদিন কিছু টাকা পাই তো আমিও কারবারে খাটাব সে টাকা। কিছু সোরা কিনে ফিরিঙ্গিদের বেচব। এই ধরো পাঁচকুড়ি টাকার মাল বেচলে নকুড়ি টাকা ঘরে আসে, তা মন্দ কী। সেই জন্যেই তো ভাই নজর মহম্মদকে অত খোশামোদ করে মতিঝিলে গিয়েছিলাম–
তা এবার কারবার করবে তো?
ওমা, সে গুড়ে বালি ভাই। সেই যে কথায় আছে না, অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়। আমার হয়েছে তাই। ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই হবার পর থেকে তো সকলের কারবার বন্ধ।
কেন?
তা মাল কে নিবে যে কারবার করবে? ফিরিঙ্গিরাই তো মাল নিত। তারা যখন নেই তখন কে আর কিনবে? কাশিমবাজার কুঠি তো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে নবাব। কলকাতায় উমিচাঁদ সাহেব বলে। একজন মহাজন ছিল, তাকেও তো নবাব শায়েস্তা করে দিয়েছে। বেভারিজ সাহেব বলে একজন। ফিরিঙ্গি ছিল, সেও তো গদিটদি গুটিয়ে পগারপারে চলে গেছে। কিনবেটা কে?
তারপর একটু থেমে বললে–সেই জন্যেই তো সবাই নবাবের ওপর চটে গেছে! নবাবের মা পইপই করে ছেলেকে বারণ করেছিল লড়াই করতে। লড়াইতে নবাব জিতলে কী হবে, বেগমদের খুব লোকসান হল তো। টাকা আমদানি বন্ধ হল তো। ছেলের ওপর রাগ হবে না মায়ের? এখানে একজন বড় শেঠ আছে তার নাম ভাই জগৎশেঠ, সেও তো শুনেছি রেগে গেছে ওই জন্যে। তা রাগ হবে না, তুমিই বলো।
