সারাফত আলি বললে–তা আজ বাবুজিকে চেহেল্-সুতুনে নিয়ে যাচ্ছিস তো তুই?
নজর মহম্মদ ভয়ে আঁতকে উঠলইয়া আল্লা, আজ তো জান নিকলে যাবে আমাদের।
কেন?
নবাব খুদ নিজে চেহেল সুতুনে আসবে রাত্তিরে, রাত্তিরে চেহেল্-সুতুনে ঘুমোবে। হাতিয়াড়ের রানিবিবির সঙ্গে মুলাকাত করে সব বাঁচিত্ শুনবে, মেহেদি নেসার সাহেব যত ঝুট বাত বলেছে, তার সব ফয়সালা হবে, আজ বাবুজিকে চেহেল্-সুতুনে নিয়ে গেলে আমাদের জান চলে যাবে মিঞাসাহেব
কান্ত চুপ করে সব শুনছিল। বললে–রানিবিবির সঙ্গে নবাব দেখা করবে!
হাঁ জনাব, হাঁ। সব ফয়সালা হবে যে আজ। হুকুম হয়ে গেছে চেহেলসূতুনে। এই তো আজ জলদি লৌট যাচ্ছি, আজ কাজে গাফিলি করলে আমার জান চলে যাবে।
বলে আর দাঁড়াল না নজর মহম্মদ।
কান্ত অধীর হয়ে উঠেছিল। বললে–রানিবিবি দেখা করতে রাজি হয়েছে? রানিবিবি আপত্তি করেনি?
কিন্তু নজর মহম্মদের কানে সেকথা পৌঁছুল না। নজর মহম্মদ তখন হনহন করে বরাবর সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে চকবাজারের রাস্তা দিয়ে।
*
মতিঝিলের নবাব শুধু মতিঝিলের নবাবই না, বাংলা বিহার ওড়িষ্যার নবাব। যার একটা হুকুমে মুর্শিদাবাদের চেহেলসূতুনের ইটগুলো পর্যন্ত ভয়ে থরথর করে কাঁপে, যার একটা কথায় হাতিয়াগড়ের রাজা দ্বিতীয় পক্ষের বউকে সুড়সুড় করে চেহেল্-সুতুনে পাঠিয়ে দেয়, সে মানুষটাকে সেই-ই প্রথম দেখল মরালী। যেমন আর পাঁচজন মানুষ ঠিক তেমনি। তেমনি মুখ-চোখ কান কপাল সবকিছু। গলার আওয়াজটাও আর পাঁচজন মানুষের মতন। এই মানুষটাই ইচ্ছে করলে নাকি যে-কোনও লোকের ভাগ্য ফিরিয়ে দিতে পারে। এই মানুষটার কাছে যাবার জন্যেই গুলসন বেগম থেকে শুরু করে সব বেগম উদগ্রীব হয়ে থাকে। এই মানুষটাই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সকলের ভাগ্যবিধাতা। ভাবতেও অবাক লাগে।
নবাবের সব কথা কানে যায়নি ভাল করে। কিন্তু যেটুকু গিয়েছিল সেইটুকুতেই বড় মায়া হয়েছিল মরালীর মানুষটার জন্যে! সত্যি, কেউ কি নেই যে নবাবের ভাল দেখে! এমন কেউ কি নেই যেনবাবের ভাল চায়?
নানিবেগম আসবার সময় জিজ্ঞেস করেছিল–তুই অত ভয় পেয়েছিলি কেন বেটি? অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলি কেন? কী হয়েছিল তোর? মির্জাকে তোর এত ভয়?
মরালী সে কথার উত্তর না দিয়ে বলেছিল–নবাবের বুঝি অনেক শত্রু নানিজি?
নানিবেগম বলেছিল–বেচারাকে সবাই মিলে বড় নাজেহাল করে দিচ্ছে মা, সাধে কি আর দুঃখ হয় আমার মির্জার জন্যে! সবাই ওর দুশমন মা, সবাই ওর দুশমন!
কেন? কীসের জন্যে শত্রুতা করে তারা? কী করেছে নবাব,
দুশমনির কি কোনও কারণ থাকে মা। ও এক-একজনের কপালে লেখা থাকে। তারা দুশমন নিয়েই জন্মায়, তারা লোকের ভাল করুক মন্দ করুক, তাদের দুশমন থাকবেই
কারণ না থাকলেও শত্রুতা করবে?
তা করে না? মির্জা তো আমার কোনও দোষ করেনি, তবু কেন আমার নিজের পেটের মেয়ে তাকে দেখতে পারে না? ওর নানারও ওইরকম ছিল মা, সারা জীবন তাকে জ্বলতে হয়েছে। তাই তো বলি, বড় হওয়াই পাপ। কারও বড় হওয়া লোকে ভাল চোখে দেখে না। তাই তো তোকে বলেছিলাম, নবাবের চেয়ে নবাবের প্রজারা অনেক সুখে আছে। তারা তবু রাত্তিরে আরাম করে ঘুমোতে পারে, শাক-ভাত যা হোক দুটো পেট ভরে খেয়ে শান্তি পায়। মির্জার আমার খেয়েও সুখ নেই, ঘুমিয়েও সুখ নেই। এই যে আমার সঙ্গে আজ কতদিন পরে দেখা হল, কত কথা বলবার ছিল, কিন্তু কোথা থেকে হঠাৎ মানিকচাঁদের চিঠি এল আর সব বন্ধ হয়ে গেল। এখন দেখি, আজ রাত্তিরে যদি আসে তো তোর একটা হিল্লে করে দেব মির্জাকে বলে
আমার আবার কী হিল্লে করবে নানিজি?
তোকে যদি হাতিয়াগড়ে ফেরত পাঠাবার জন্যে মির্জার মত করাতে পারি।
আমাকে ফেরত পাঠাবেন?
মরালী চমকে উঠল।
কেন? ফেরত পাঠালে তুই যাবি না? তোর কি চেহেল্-সুতুনে থাকতে ভাল লাগছে? ফেরত পাঠালে তোর সোয়ামি তোকে নেবে না?
মরালী বললে–না।
নানিবেগম আবার জিজ্ঞেস করলে–সত্যিই নেবে না?
মরালী আবার বললে–না। আমি মুসলমানের হাতে খেয়েছি, আমার জাত গেছে, এর পর কেউ কাউকে ঘরে নেয় না।
তা কী করবি বল? মির্জাকে আমি কী বলব?
মরালী বললে–আমি এখানেই থাকব।
নানিবেগম আরও অবাক হয়ে গেল। বললে–তুই থাকতে পারবি? কষ্ট হবে না থাকতে? তুই তো নজর মহম্মদ, পিরালি খাঁ, বরকত আলি ওদের দেখেছিস, ওদের মন জুগিয়ে চলতে পারবি?
মরালী হঠাৎ বলল–আমি আপনার কাছে থাকব নানিজি!
নানিবেগম হেসে ফেললে। বললে–দুর পাগলি, আমি আর ক’দিন! আমি তো আর বেশি দিন বাঁচব না। আমি মরে গেলে তুই কী করবি! কে তখন দেখবে তোকে?
মরালী বললে–ছোটবেলায় তো আমার মা-ও মারা গিয়েছিল, তখন কে আমায় দেখেছিল?
এরপর নানিবেগম আর কোনও কথা বলেনি। মরালীও আর কোনও কথা বলেনি। কেমন যেন সেইদিনই দু’জনের মন জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। সেদিন থেকে আর কোথাও যেতে মরালীতে কেউ বাধা দেয়নি। সেই দিন থেকেই মরালী চেহেল্-সুতুনের ভেতরে এ-মহল থেকে ও-মহলে ঘুরে বেড়িয়েছে। সেই তখন থেকেই মনে হয়েছিল, যে-লোকটার এত শত্রু তাকে একটু শান্তি দিতে হবে। আর তারপরে যখন সেই ক্লাইভ সাহেব এসেছিল জীবনে, তখনও সেই মানুষটার কথা ভুলতে পারেনি।
ক্লাইভ সাহেব মরালীকে মেরী বলে ডাকত। কোথাকার কোন সাত সাগর তেরো নদীর পারের দেশ। সেখান থেকে এসেছিল এখানে চাকরি করতে। সামান্য চাকরি। সাহেব এক একদিন চুপ করে বসে থাকত বাগানে। আবার এক একদিন প্রাণ ভরে গল্প করে যেত। ফরসা টকটক করছে গায়ের রং। কত লড়াই করেছে কত জায়গায়। কতবার আত্মহত্যা করতে গেছে।
