তুই যদি কিছুই না-জানিস মির্জা, তা হলে কেন এদের কষ্ট দিতে চেহেল সুতুনে আনিস? কোথা থেকে সব ধরে ধরে আনিস এদের আর এদিকে আমার যে প্রাণ বেরিয়ে যায়।
মির্জা বললে–কিন্তু আমি কদিক দেখবনানিজি, আমি আমার চেহেল-সুকুন দেখব,না মুর্শিদাবাদ দেখব, না তামাম বাংলা মুলুক দেখব! চারদিকে যে আমার শক্ত ঘিরে রয়েছে। কেউ যে আমায় এক দণ্ডের জন্যে শান্তি দিচ্ছে না। কাকে বিশ্বাস করব আমি? কাকে বিশ্বাস করে সব কাজের ভার দেব বলতে পারো? যেদিন থেকে মসনদে বসেছি সেদিন থেকেই তোমার মেয়েরা, তোমার আত্মীয়রা আমাকে বিপদে ফেলতে চাইছে। তার ওপরে আছে ফিরিঙ্গিরা, তার ওপরে আছে শওকত জঙ
নানিবেগম মুখ তুললেন।
কেন? সে বেচারি তোর কী করেছে?
তুমি তো কারও দোষ দেখতে পাও না। কিন্তু তাকে খেপিয়ে তোলবার লোকের তো অভাব নেই।
কে খেপাচ্ছে তাকে? কারা তারা?
তোমাকে সব কথা বলা যায় না নানিজি, সব কথা তুমি বিশ্বাসও করবে না। কিন্তু তুমি বলতে পারো কে শত্রু নয় আমার? তোমার জাফর আলি থেকে শুরু করে জগৎশেঠ পর্যন্ত কে শত্রুতা করছে না? কার নাম করব তোমার কাছে। আমি একদিনের জন্যেও একটু শান্তি পাব না? আমি কার কাছে কী এমন অপরাধ করেছি যে সবাই আমার শত্রুতা করবে? তুমি একজনের নাম করো যে আমার ভাল চায়, যে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী, আমার ভাল হলে যে আনন্দ পায়
কেউ পায় না?
কে, তার নাম করো!
কেন, আমি তোর ভাল চাই না?
মির্জা হঠাৎ নানিবেগমকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলে। বললে–নানিজি, তুমি তো আমাকে মানুষ করেছ নানিজি! তুমি কেন একথা বলছ?
বলে দুই হাত জড়িয়ে ধরে রইল নানিজিকে। কিছুতেই আর ছাড়তে চায় না মির্জা।
নানিবেগম বললে–ওরে, ছাড় ছাড় আমাকে ছেড়ে দে
বলো আগে, তুমি ওকথা আর বলবে না?
হঠাৎ নেয়ামত ঘরের ভেতরে ঢুকে কুর্নিশ করে দাঁড়াল।
কী খবর?
জাঁহাপনা, কলকাতার রাজা মানিকচাঁদের কাছ থেকে তোক এসেছে খত্ নিয়ে, জাঁহাপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
জাঁহাপনা, জাঁহাপনা, জাঁহাপনা! শুনতে শুনতে মির্জার কান যেন পচে যাবার অবস্থা হয়েছে।
নানিবেগম মির্জার মুখের দিকে চেয়ে দেখলে। মুখখানা যেন হঠাৎ অন্যরকম হয়ে গেল। এ যেন অন্য মির্জা। বহুদিন আগে যখন নানিবেগম বালেশ্বরে ছিলেন তখন নবাব আলিবর্দি খাঁ-কেও এক-একদিন তিনি এইরকম চিনতে পারতেন না। রাত্রে কতদিন ঘুম ভেঙে গিয়ে দেখেছেন, নবাব ঘরের মধ্যে পায়চারি করছেন আর মুখে বিড়বিড় করছেন। আজ মির্জারও যেন সেই অবস্থা।
নানিবেগম বললে–তুই ভেতরে যা মির্জা, তোর অনেক কাজ, আমি আসি
মরালীর তখন বোধহয় একটু জ্ঞান ফিরে এসেছে। চোখের পাতা একটু খুলেছে।
এই বেগমসাহেবাকে কী করে নিয়ে যাবে তুমি?
সে তোকে ভাবতে হবে না। তুই নিজের কাজ করগে যা
তা হলে তুমি খবর দিয়ে দিয়ো নানিজি, আজ রাত্তিরে আমি চেহেল্-সুতুনে যাব।
বলে মির্জা চলে গেল। নানিবেগম মরালীকে জিজ্ঞেস করল–এখন তৰিয়ত কেমন লাগছে বেটি?
মরালী কোনও কথা বলতে পারল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শুধু।
নানিবেগম জিজ্ঞেস করলে হঠাৎ কী হয়েছিল? অত চেঁচিয়ে উঠেছিলি কেন মা? কী হয়েছিল বল তো?
মরালী বললে–আমার মনে হল কারা যেন ঘরের ভেতর ঢুকে আমাকে ধরতে আসছিল যেন আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দাঁত বার করে হাসছিল
দুর পাগলি মেয়ে! এই মতিঝিলে কে তোকে ধরতে আসবে? এখানে কার এত সাহস হবে? নিশ্চয়ই ভুল দেখেছিস তুই! স্বপ্ন দেখেছিস জেগে জেগে
তারপর একজন বাঁদিকে ডেকে মরালীকে ধরতে বললেন। মরালীর দিকে চেয়ে বললেন–চল, চেহেল্-সুতুনে গিয়ে হেকিমসাহেবকে ডেকে পাঠাব, সব ঠিক হয়ে যাবে, চল, মির্জাকে তোর কথা সব বলেছি, এখন দরবার চলছে, আজ রাত্তিরে মির্জা চেহেল সুতুনে আসবে, চল–
তাঞ্জাম তৈরিই ছিল। নানিবেগম আর বাঁদিটা দুজনে মিলে মরালীকে ধরে তাঞ্জামের ভেতর তুলে দিলে। তাঞ্জামটা আবার মতিঝিল পেরিয়ে রাস্তায় এসে পড়ল। আবার আগেকার মতন একজোড়া ঝালর-ঢাকা হাতি আগে আগে চলতে লাগল।
*
সন্ধেবেলা নজর মহম্মদ দোকানে আসতেই সারাফত আলি বললে–কী রে নজর, কাল এলি না তুই, বাবুজি তোর জন্যে রাত পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরেশান হয়ে গেল
নজর মহম্মদ বললে–কাল মিঞাসাহেব, চেহেল্-সুতুনে গোলমাল হয়ে গিয়েছিল সব
কী রকম?
ভেবেছিলুম আমি সব ফঁস করে দেব মিঞাসাহেব, মেহেদি নেসার সাহেব আমার নামে কাছারিতে নালিশ পেশ করেছে, ও হারামির বাচ্চাকে আমি এবার দেখে নেব। কিন্তু আমাকে শালা কিছুই করতে হল না। মরিয়ম বেগমসাহেবা খুদ নিজেই সব ফঁস করে দিয়েছে নানিবেগমসাহেবার কাছে। নানিবেগম আজ রানিবিবিকে নিয়ে মতিঝিলে গিয়েছিল।
কান্তও কথাটা কানে যেতেই ভেতর থেকে বাইরে এসে দাঁড়াল।
নানিবেগম নবাবকে সব ফাঁস করে দিয়েছে!
কান্ত আর থাকতে পারলে না, বললে–তারপর?
নজর মহম্মদ সারাফত আলির দিকে চেয়েই বলতে লাগল–মিঞাসাহেব নবাবের কি ফুরসুত আছে সব কথা শোনবার। দরবার আছে, লড়াই আছে, জেনানা আছে, একলা কত কাম করবে নবাব! হলওয়েল সাহেবকে পাকড়ে এনেছিল কলকাতা থেকে, তাকে ভি ছেড়ে দিল
কাহে?
নানিবেগম নবাবকে বললে–ছেড়ে দিতে। জাফর আলি সাহেবকে খুব ধমক দিয়েছে নবাব। ভাইতে-ভাইতে লড়াই লাগিয়ে দেবার মতলব করছে তো? নানিবেগম জাফর আলি সাহেবকেও খুব ধমক দিয়েছে। নবাবের নোকরি হারামের নোকরি মিঞাসাহেব। চারদিকে কেবল দুশমনি। শালা দুশমন তাড়াতে-তাড়াতে রাতে নিদ ভি নেই নবাবের চোখে। অত ফুর্তিবাজ নবাব একেবারে হয়রান হয়ে গেছে মসনদে বসে।
