আরে বাজি, তুমি?
একেবারে সচ্চরিত্র পুরকায়স্থর মুখোমুখি দাঁড়াতেই কান্ত যেন আবার পৃথিবীতে ফিরে এল। সিঁড়ির নীচেয় অন্ধকার একটা ঘর। চারদিকে কড়ির জালা। সারাফত আলির দোকানে যেমন খুশবু তেল থাকে, তেমনি থরে থরে সাজানো। বেশ মিষ্টি-মিষ্টি কড়া-কড়া গন্ধ ঘরটার মধ্যে। যে-লোকটা কান্তকে পৌঁছিয়ে দিয়ে গিয়েছিল সে তখন চলে গেছে।
কান্ত বললে–এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই আপনার কথা মনে পড়ল। কেমন আছেন এখন?
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ কান্তকে দেখেই উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠেছে এই তোমার কথাই ভাবছিলাম বাবাজি, তোমাকে সেই বলেছিলাম না শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের কন্যার কথা? সেই যার সঙ্গে তোমার বিবাহের প্রস্তাব করেছিলাম?
কান্ত উদগ্রীব হয়ে বলে উঠল–হ্যাঁ, হাঁ, সে তো বলেছিলেন, তা তার কী হয়েছে?
সে তো নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল বিবাহের রাত্রে, সে তো তোমাকে বলেছি–হঠাৎ সেই কন্যাকে আজ এখানে দেখলাম।
এখানে?
হ্যাঁ এখানে। এই এখুনি নানিবেগমসাহেবার সঙ্গে এই মতিঝিলে তাঞ্জাম থেকে নামল। এই এখুনি। নেমে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল তুমি আসবার একটু আগে। সেই কথাই বসে বসে ভাবছিলাম, ভাবছিলাম শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের কন্যা এখানে এল কেমন করে, এমন সময়ে বাবাজি
কান্ত জিজ্ঞেস করলে আপনি ঠিক দেখেছেন?
তা বাবাজি, আমি এই সত্তর বছর বয়েস পর্যন্ত এত কন্যার বিবাহ দিয়েছি, আমার ভুল হবে?
কিন্তু এখানে কী করতে এল সে?
তা কে জানে বাবাজি, আমিও তো তাই অবাক হয়ে ভাবছি, এখানে এই মতিঝিলে সেকন্যা এল কেমন করে!
কিন্তু আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না ঘটকমশাই।
না বাবাজি, তোমাকে আমি দেখাতে পারি। এই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলেই দেখা যায়। আমি তোমাকে প্রমাণ দিতে পারি! অথচ শোভারাম বিশ্বাস মশাই ওদিকে পাগলের মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মেয়ে-মেয়ে করে! খবরটা তাঁকে একবার দেব ভাবছি!
কান্ত বললে–না, ঘটকমশাই, বাপকে আর একথাটা বলবেন না, বড় মনোকষ্ট পাবেন। আপনি কাউকে বলবেন না। আমি শুধু ভাবছি আপনি ভুল দেখেননি তো? অন্য কাউকে দেখেননি তো?
তবে তুমি আমার সঙ্গে ওপরে চলো, আমি তোমায় চাক্ষুষ দেখিয়ে দিচ্ছি। চলো চলো আমার সঙ্গে
জোর করে পুরকায়স্থমশাই কান্তকে ওপরে নিয়ে চলল। বললে–একটু আস্তে আস্তে এসো বাবাজি, ওপরে আবার নবাবের দরবার বসেছে-কলকাতা থেকে সব ফিরিঙ্গি ধরে এনে বিচার করছে নবাব। সেই জন্যেই তো এই দিককার সিঁড়ি দিয়ে নিয়ে এলাম তোমাকে চুপি চুপি তোমায় দেখিয়ে দিয়ে আবার নেমে যাব, কেউ দেখতে পাবে না, এসো, পা টিপে টিপে এসো–
এই-ই প্রথম ভেতরে ঢুকল কান্ত। এই মতিঝিলের ভেতরে। এলাহি ব্যাপার দেখে অবাক হয়ে গেল। চেহে সুতুন দেখেছে খানিকটা, কিন্তু এ যেন অন্যরকম। এ যেন সত্যিই রাজপ্রাসাদ। দিল্লি কখনও দেখেনি কান্ত, শুধু দিল্লির বাদশার কেল্লার গল্প শুনেছে। এ সত্যিই দেখবার মতো। কিন্তু এখানেই বা এল কেন মরালী। কেউ নিয়ে এল। না নিজে থেকে এল?
ওই দেখো বাবাজি! ওই দেখো
একটা বিরাট ঘর! চারদিকের জাফরি-ঢাকা বাইরের সিঁড়ির কোণ থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা। খুব ভাল স্পষ্ট দেখা যায় না। তবু কান্ত পুরকাস্থ মশাইয়ের পেছন থেকে দেখতে চেষ্টা করলে।
কই? কোথায়?
ওই যে, ওই ঘুলঘুলিটার দিকে মুখ করে বাইরের দিকে চেয়ে আছে। মুখটা এদিকে ফেরালেই চিনতে পারবে বাবাজি আর চিনতেই বা পারবে কী করে তুমি? তুমি তো বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়েকে দেখোনি। শুভদৃষ্টি হবার আগেই তো সব ভন্ডুল হয়ে গেল–ওই ওইটিই হচ্ছে বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ে, ওরই সঙ্গে তোমার বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলাম বাবাজি, তা তোমারও কপালে নেই, আমারও দুঃসময় পড়ল তখন থেকে
হঠাৎ মরালী এই দিকে মুখটা ফিরিয়েছে। আর পুরকায়স্থমশাইকে দেখতে পেয়েছে। যেন ভয় পেয়েছে দেখে। পুরকায়স্থমশাই বোধহয় একটু সাহস করে এগিয়ে যেতে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে মরালী আর্তনাদ করে উঠেছে সারা মতিঝিল কাঁপিয়ে।
আর ওদিক থেকে যেন কাদের দৌড়ে আসার শব্দ শোনা গেল। দুমদাম করে শব্দ হচ্ছে। কান্ত ভয় পেয়ে গেল। যদি এখন কেউ তাদের এখানে দেখে ফেলে!
পুরকায়হমশাইও ভয় পেয়ে গেছে। বলল–শিগগির নেমে এসো বাবাজি, কী সব্বনাশ
বলে নিজেই আগে আগে সিঁড়ি দিয়ে নীচেয় নেমে গেল।
নানিবেগম পাশের ঘর থেকে দৌড়ে এসেছে। পেছনে পেছনে নবাব।
নানিবেগম মরালীর মুখের কাছে মুখ নামিয়ে জিজ্ঞেস করলে ক্যা হুয়া বিটি? ক্যা হুয়া?
মরালীর তখন আর কথা বলবার মতো অবস্থা নয়। নবাবওঁ মরালীকে দেখলে ভাল করে। জিজ্ঞেস করলে এ কৌন নানিজি?
নানিবেগম বললে–এই তো হাতিয়াগড়ের রানিবিবি!
হাতিয়াগড়ের রানিবিবি? এখানে কেন? এখানে কী করতে এসেছে?
নানিবেগম বললে–আমি চেহেল্-সুতুন থেকে সঙ্গে করে এনেছি
চেহেল্-সুতুনে রানিবিবি কেন এসেছে? কী করতে?
নানিবেগম বললে–সে-জবাব কি আমি দেব? চেহেল্-সুতুনের মালিক কি আমি? যে-দিন থেকে তোর নানাজি মারা গেছে, সে-দিন থেকেই তো আমি সব দেখা-শোনা করা ছেড়ে দিয়েছি। আমি তো সেদিন থেকে আমার কোরান নিয়েই থাকতুম, কিন্তু হঠাৎ নজরে পড়ল এই বেটিকে। সবাই একে মরিয়ম বেগম বলে জানত এতদিন
মরিয়ম বেগম? সে কে?
