কান্ত দেখে, ক্লাইভ সাহেব পাশে দাঁড়ানো মিরজাফর আলিকে জিজ্ঞেস করলেওরা কী বলছে? ওরা কারা? ও কীসের সাউন্ড?
মিরজাফর বললে–ও কিছু না কর্নেল, ওরা সবাই হিন্দু, আপনারা আসছেন শুনে ওদের খুবই আনন্দ হয়েছে, আনন্দ হলেই ওরা ওইরকম চিল্লাচিল্লি করে–
তখন সবাই আরও সামনে এগিয়ে এল। আরও জোরে শাঁখ বেজে উঠল। আরও জোরে উলু দিতে লাগল মুর্শিদাবাদের মানুষেরা। উ-লু-লু-লু-লু-লু—
.
সেইখানে সেই নিজামত-হারেমের সামনে দাঁড়িয়েই কান্ত যেন আর এক পৃথিবীতে পৌঁছে গেছে। ছোটবেলা থেকে বড় হওয়ার বৈচিত্র্য দেখতে দেখতে আর অনুভব করতে করতে বিচিত্ৰতর এক জগতের মধ্যে যেন সে ঢুকে পড়েছে। সেই বড়চাতরা, সেই চৌধুরীদের চকমিলানো বাড়ি আর সেই বগি। সে যেন তার অতীত। সেই অতীতটার ভিতের ওপর তার ভবিষ্যতের সৌধ গড়তে গিয়ে দেখেছিল, কলকাতার বেভারিজ সাহেবের সোরার গদিবাড়িটা বেশ মজবুত করে গেঁথে তুলেছে সে। সেটা যখন ভেঙে গেল, তখন আর নতুন করে গড়বার কিছু ছিল না তার। সেও ওই হাতিয়াগড়। হাতিয়াগড়ের একটা বাড়িতে গিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসবার স্বপ্নও দেখেছিল সে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই কি সবকিছু হয় না সবকিছু থাকলেই ইচ্ছে হয়। আসল ইচ্ছের সঙ্গে ইচ্ছেপূরণের কোনও সম্পর্কই নেই।
হাতিয়াগড়ের রানিবিবি সেই কথাই জিজ্ঞেস করছিল কাটোয়াতে।
.
সবই যদি ঠিক ছিল তো বিয়ে হল না কেন?
কান্ত বলেছিল–আমার যে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল যেতে
রানিবিবি অবাক হয়ে বলেছিল–সেকী? মানুষের খেতে দেরি হতে পারে, ঘুমোতে যেতেও দেরি হতে পারে, কিন্তু তা বলে তুমি বিয়ে করতে যেতেই দেরি করে ফেললে? ঘুমিয়ে পড়েছিলে বুঝি?
কান্ত লজ্জায় পড়ল। রানিবিবি যে তার সঙ্গে এমন কথা বলবেন, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। রানিবিবির মুখখানা একেবারে খোলা। মানে তার মতো অচেনা পুরুষমানুষের সঙ্গে দেখা করতে এতটুকু সংকোচও নেই। আর তা ছাড়া রানিবিবির বয়েসটা যে এত কম হবে, তাও তো ভাবতে পারেনি সে। বেশ জ্বলজ্বলে টাটকা সিঁদুর রয়েছে মাথার সিথিতে। সকালবেলা স্নান করে চুল এলো করে দিয়েছে পিঠের দিকে। বাঁদিটা বোধহয় তাম্বুলাবহার দিয়ে পান সেজে দিয়েছিল, তাই চিবোচ্ছে।
আপনার খাওয়ার কোনও অসুবিধে হয়নি তো? আমি কোতোয়ালিতে আপনার খাওয়ার কথা বলতে গিয়েছিলাম। শেষকালে হয়তো গোস্তটোত খাইয়ে দেবে, এই ভয় করছিলুম–
আমি গোস্ত খাই তো!
সেকী, আপনি গোরুর মাংস খান?
হেসে উঠল রানিবিবি–মোগলের হাতে যখন পড়েছি, তখন গোরুর মাংস খাওয়ালেই বা কী, আর শুয়োরের মাংস খাওয়ালেই বা কী! ওকথা থাক, তোমার বিয়ের কথাটা বলো—
কান্ত লজ্জায় পড়ল। বললে–কপালে আমার বিয়ে না থাকলে কী হবে!
দোষটা করলে তুমি নিজে আর নিন্দে করছ কপালের!
কিন্তু আপনি তো জানেন না, ফিরিঙ্গি কোম্পানির চাকরি কী জিনিস। কোথায় সেই সুতোনুটি আর কোথায় সেই হাতিয়াগড়। বেভারিজ সাহেবের সোরার নৌকো এল দেরি করে, সেই নৌকোর সব মাল খালাস করে গুদামে পুরে হিসেব না করলে তো ছুটি নেই। তারপরে যে-নৌকোয় করে হাতিয়াগড়ে যাবার বন্দোবস্ত করেছিলাম, তা মাঝপথে চড়ায় আটকে গেল আর বিয়ের লগ্ন ছিল রাত দু’প্রহরের সময়–
শেষপর্যন্ত কী হল?
কান্ত বলল–ভেবেছিলাম আমার জন্যে পাত্রীপক্ষ অপেক্ষা করবে, কিন্তু গাঁয়ের লোক তাড়াহুড়া করলে বলে আর একজনকে ধরে এনে তার সঙ্গে সেই লগেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল পাত্রীর বাপ–
কোথায় বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল?
হাতিয়াগড়ে। আপনাদেরই জমিদারিতে। আপনি হয়তো তাদের চিনবেন। পাত্রীর বাবার নাম শোভারাম বিশ্বাস–
রানিবিবি তাদের চিনলেন কিনা কে জানে। সে-সম্বন্ধে আর কিছু বললেন না। একটু পরে জিজ্ঞেস করলেন–সেই দুঃখেই বুঝি ফিরিঙ্গি কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে নবাব সরকারে চাকরি নিলে?
না, ঠিক তা নয়, ওখানে তিন টাকা তলব পেতাম, এখানে পাব ছ’ টাকা।
শুধু টাকার লোভেই এই চাকরি নিলে না আর কোনও লোভও ছিল?
আর কী লোভ থাকতে পারে বলুন! জিনিসপত্তরের যা দাম বাড়ছে, তাতে তিন টাকা মাইনেতে আর কুলোচ্ছে না। সেই শায়েস্তা খাঁর আমল কি আর এখন আছে!
সংসারে তোমার কে কে আছেন?
কেউ নেই। শুধু আপনি আর কোপনি।
বলে কান্তও হাসল, আর তার সেই হাসিতে রানিবিবিও হাসল। একবার কান্তর ইচ্ছে হল জিজ্ঞেস করে, মুর্শিদাবাদের নবাব-হারেমে কেন যাচ্ছেন রানিবিবি। কিন্তু কথাটা কেমন করে পাড়বে, সেই ভাবতে গিয়েই আর বলা হল না। তারপর নিজেই একটা কারণ অনুমান করে নিয়ে বললে–আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি এর মধ্যে আছি–
কীসের মধ্যে?
এই আপনাকে নবাব-হারেমে নিয়ে যাবার মধ্যে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি এর কিছুই জানিনে। বরং আমি বশিরকে জিজ্ঞেস করেছিলুম–
বশির কে?
নিজামত কাছারিতে মোহরার মনসুর আলি মেহের খাঁ সাহেব আছেন, তার সম্বন্ধীর ছেলে। সে আমার বন্ধু। তাকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছিলুম, কিন্তু সে কিছু বললে–না। আমি শুধু হুকুম তামিল করছি। এই পাঞ্জা দিয়েছে আমাকে ওরা। বলেছে, এটা দেখালে রাস্তার সেপাই কি ফৌজদারের লোক কেউ কিছু বলবে না–আপনি হয়তো মনে মনে আমাকে দুষছেন।
কেন, তোমাকে দুষতে যাব কেন?
জানি না, হয়তো আপনাকে এইরকম করে নিয়ে গিয়ে আপনার কোনও ক্ষতি করছি। সত্যি বলুন তো, আপনি একা একা সেখানে যাচ্ছেন কেন? আপনার কি কিছু কাজ আছে?
