কান্ত তবু ছাড়েনি, জিজ্ঞেস করছিল–সত্যি, বলল না, তুমি যেতে কী করতে?
বাদশা কুড়িবাইশ বছরের জোয়ান ছেলে। বললে–বেগমরা সব তাগড়া তাগড়া, আমি ওদের সঙ্গে লড়তে পারব কেন বাবুজি? রাতের পর রাত গিয়ে গিয়ে আমার তবিয়ত খারাপ হয়ে গেল, আমার তাগদ চলে গেল–
কেন, তাগদ চলে গেল কেন?
সে আপনাকে কবুল করতে পারব না জনাব, জোয়ান লেড়কা চেহেল্-সুতুনে গেলে তার তাগদ ফুরিয়ে যায়, তাগড়া তাগড়া বেগম লোগ তাকে বরবাদ করে দেয়
বলে মিটিমিটি হাসতে লাগল বাদশা।
এর পরে বাদশার কথার মানে বুঝতে আর দেরি হয়নি। সেখান থেকে চলে গিয়েছিল কান্ত! কেমন যেন সন্দেহ হতে লাগল তার। তবে কি সারাফত আলি সেই জন্যেই তাকে পাঠাচ্ছে চেহেল সুতুনে!
যখন রাত আরও গম্ভীর হল তখনও নজর মহম্মদের দেখা নেই। আর দেখা হল না মরালীর সঙ্গে। তখন সারাফত আলির আর কথা বলবার ক্ষমতা থাকে না। আফিমের মৌতাত তখন তার মাথার ঘিলুতে গিয়ে ঠেকে। তখন আর ভাল-মন্দ জ্ঞান থাকে না তার। তখন চেহেল্-সুতুনের ওপরেও রাগ থাকে না। তখন সারাফত আলি নিজেকে নিয়েই ঝুঁদ হয়ে থাকে। ভাবনা-চিন্তা করবার ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত তার লোপ পেয়ে যায়।
অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল কান্ত। নিজের ঘুপচি ঘরের মধ্যে শুয়ে শুয়েও নজর মহম্মদের কথা ভেবেছিল। তারপর ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই মনে পড়ল বশির মিঞার কথা। বশির মিঞার সঙ্গে তার পর থেকে আর দেখা হয়নি, হয়তো সে ব্যও আছে খুব। নবাব ফিরে এসেছে মুর্শিবাবাদে। চারদিকে সব থমথমে ভাব। নবাব ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মুর্শিদাবাদের চেহারা যেন আবার বদলে গিয়েছে।
ভোরবেলা বিছানা থেকে উঠেই সে বশির মিঞার বাড়ির দিকে যাবার জন্যে বেরিয়েছিল। যদি বশির মিঞা তাকে আবার কোনও একটা কাজ দেয় তো আবার তাকে এই অবস্থাতেই বাইরে যেতে হবে। হয় মোল্লাহাটি, নয়তো কেষ্টনগর, নয়তো অন্য কোথাও। সারা বাংলাদেশময় বশির মিঞার জাল পাতা আছে।
রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে বশির মিঞার বাড়ির সামনেও এসে দাঁড়াল। একবার ডাকতেও ইচ্ছে হল তার। কিন্তু আবার মনে হল তাকে ডেকেই বা কী হবে। তারপর আবার সেই রাস্তা দিয়েই সোজা চলতে লাগল। একেবারে সোজা মহিমাপুরের দিকে। ওদিকে জগৎশেঠ সাহেবের বাড়ি। বিরাট বাড়ি। সামনে বিরাট বাগান। ফটকের সামনে পাঠান পাহারাদার ভিখু শেখ দাঁড়িয়ে থাকে যমদূতের মতো। ভিখু শেখকে দেখলেই কান্তর ভয় করে।
তারপর এক জায়গায় গিয়ে কান্ত আবার ফিরল।
আবার কোথায় যাবে! কী করে সময়টা কাটাবে? সময় কাটাতেই অনেক সময় কান্ত বিব্রত হয়ে পড়ে। সন্ধের আগে আর নজর মহম্মদ আসছে না। যখন সারাফত আলি আবার আগরবাতি জ্বালিয়ে গড়গড়ার নল মুখে দিয়ে তামাকের ধোঁয়া টানবে, সেই-ই নজর মহম্মদের আসার সময়। হঠাৎ কোতোয়ালের লোক তাড়া করতে লাগল-হটো হটো, হট যাও
রাস্তার একপাশে সরে এল কান্ত। একটা রুপোলি ঝালরদার পালকি চলেছে রাস্তা দিয়ে। সামনে পথ করতে করতে চলেছে নবাবের এক জোড়া হাতি। হাতি দুটোর শুড়ের মাথায় ঝালর ঢাকা। ওপর থেকে শুড়ের ডগা পর্যন্ত নকশাকাটা।
হটো হটো, হট যাও
পাশের একটা লোককে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল–নানিবেগমের পালকি। কান্ত আরও ভাল করে পালকিটার দিকে চেয়ে দেখলে। মরালীকে যে-পালকিটা করে সে এখানে নিয়ে এসেছিল সেটাতে এমন ঝালর দেওয়া ছিল না। এটা আরও দামি। পালকিটার গায়ে কাঠের ওপর নকশা আঁকা।
সকালবেলা নানিবেগম কোথায় যাচ্ছে?
মতিঝিলে। বোধহয় নবাবের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে।
মতিঝিলের কথাটা শুনেই সেই ইব্রাহিম খাঁ’র কথা মনে পড়ল। সেই সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ। কী অদ্ভুত নাম রেখেছিল তার বাপ-মা। কান্ত মতিঝিলের দিকেই পা বাড়াল। তার সঙ্গে দেখা করলে হয়। পালকিটা হুহু করে সামনের দিকে এগিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেল। কান্তও সেই দিকে পা বাড়াল।
যখন মতিঝিলের ফটকের সামনে গিয়ে পঁড়িয়েছে তখন পালকিটার আর দেখা পাওয়া গেল না সেখানা কোথায় ভেতরে চলে গেছে। হাতি দুটো শুধু ঝিলের ধারে ঘাসের ওপর চরে বেড়াচ্ছে।
ইব্রাহিম খাঁ ভেতরে আছে ভাই?
ইব্রাহিম খাঁ?
হ্যাঁ, তোমাদের এই মতিঝিলের সরাবখানার খিদমদগার। এই খুব বুড়োমতন, প্রায় সত্তর বছর বয়েস, মুখময় কাঁচা-পাকা দাড়ি। তার সঙ্গে একবার দরকার ছিল আমার, দেখা হবে এখন?
পাহারাদার লোকটা বোধহয় ভাল। সংসারে যেমন এক-একজন ভাল মানুষ থাকে, তেমনি।
কান্ত আবার বললে–আমার বিশেষ জানাশোনা মানুষ, ভেতরে যাবার নিয়ম হয়তো নেই, না গো!
তারপর একটু থেমে নিজেই আবার বললে–তা আমাকে যদি ভেতরে যেতে দিতে আপত্তি থাকে তো তাকেই একবার ডেকে দাও না, দেখাটা করে কথা বলে চলে যাই
পাহারাদার লোকটা বললে–যাইয়ে, অন্দর মে যাইয়ে লেকন…
বলে যে কথাটা বললে–তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে নানিবেগম ভেতরে গেছে, নবাবেরও দরবার চলেছি সময়ে যেন বেশিক্ষণ ভেতরে না থাকে। দেখা করেই যেন বাবুজি চলে আসে।
কান্ত বললে–না না, আমি বেশিক্ষণ থাকব না, আমার কাজ এক দণ্ডেই মিটে যাবে, সামান্য একটুখানি শুধু দেখা করা
তারপর জিজ্ঞেস করলে কিন্তু কোন দিক দিয়ে আমি যাব? আমি তো সরাবখানাটা ঠিক চিনি –
লোকটা নিজেই একজনকে ডেকে শেষপর্যন্ত সুব্যবস্থা করে দিলে। সত্যি, নিজামতের লোকরা সবাই-ই কিছু খারাপ নয়। কিছু কিছু ভাল লোক এখানে আছে বই কী! ভাল লোক না থাকলে কবে একদিন এদের নিজামতি চলে যেত। ভাল লোক আছে বলেই তো নবাবিআনা চলছে এতকাল ধরে। লোকটার ভাল থোক। কান্ত নিজের মনে মনেই বললে, লোকটার ভাল হোক। ভাল লোকদের ভাল হলেই তো আনন্দ হয়। পৃথিবীর খারাপ লোকদের ভাল হতে দেখলেই কাত্তর বড় মন খারাপ হয়ে যায়। ষষ্ঠীপদ ভাল লোক, তার ভাল থোক। বশির মিঞা ভাল লোক, তার ভাল হোক। আসলে সারাফত আলিও ভাল লোক, তারও ভাল হোক। আর মরালী। মরালীও তত ভাল। মরালীও তো কোনও দোষ করেনি, তারও ভাল হোক। বর পছন্দ না-হওয়াতে পালিয়ে গিয়েছিল বলে কি আর সে রাতারাতি খারাপ মেয়ে হয়ে গেল? তা নয়। আসলে খারাপ-ভাল বিচার করাই শক্ত। মরালী যদি জোর-জরদস্তিতে আরক খেতে বাধ্য হয়, কেউ যদি সাপের বিষ জোর করে তার গলার ঢুকিয়ে দেয়, তাতেই কি সে খারাপ হয়ে যাবে? আর, বাদশা যা বলছিল, তাও যদি মরালীর ভাগ্যে ঘটে, তাতেই বা কী দোষ মরালীর! কী আশ্চর্য, বাদশা বলে কিনা সে রাত কাটাত চেহেল্-সুতুনের ভেতরে। রাত কাটিয়ে চেহারা খারাপ হয়ে গেল বলেই আর যায় না। তা হলে কান্তকেও কি সেই জন্যেই চেহেসূতুনে পাঠাচ্ছে সারাফত আলি। যাতে নেশা লাগে, লেগে শরীর খারাপ হয়?
