*
সারাফত আলির দোকানে আগের দিন সন্ধেবেলা কান্ত কেবল ছটফট করেছে। নজর মহম্মদের মুখখানাই কেবল দেখবার চেষ্টা করেছে। সন্ধেবেলা মুর্শিদাবাদের চকবাজারে কোথা থেকে এত লোক জমা হয় কে জানে। কাজই বা কীসের তাও কান্ত বুঝতে পারে না। হয়তো সারাদিন কাজকর্ম করে সন্ধেবেলা ফুর্তি করতে বেরোয়। তখন গণতকাররা ছক পেতে বসে রাস্তার মোড়ে। বসে মানুষের ভাগ্যকে কখনও আকাশে ওঠায়, কখনও পাতালে নামায়। বেলফুলের মালা নিয়ে ফিরি করতে বেরোয় মালিরা। ওদিক থেকে হাতির দল গঙ্গায় চান করে সার সার ফেরে পিলখানার দিকে। তখনই ইব্রাহিম খ মদের হাঁড়া মাথায় নিয়ে মতিঝিলের দিকে যায়।
সেদিনও হাতিগুলো যাচ্ছিল। ইব্রাহিম খাঁ কিন্তু গেল না। আগের দিন হাতির ধাক্কায় পড়ে গিয়ে হয়তো গায়ে-গতরে ব্যথা হয়ে পড়ে আছে ঘরে। বেলফুলের ফেরিওয়ালাও চলেছে। দোকানের ভেতরে সারাফত আলি তখন আগরবাতি জ্বেলে দিয়ে আফিমের নেশায় জোরে জোরে গড়গড়ার ধোঁয়া টেনে দোকানঘর অন্ধকার করে দিয়েছে। ঠিক এই সময়েই রোজ নজর মহম্মদ আসে। এসে গল্প করে। মিঞা সাহেবের সঙ্গে দাঁড়িয়ে চেহেল-সুতুনের বেগম মহলের খবরাখবর দেয়। তারপর এক ফাঁকে আরকের পাত্রটা কাপড়ের খুঁটের ভেতরে লুকিয়ে নিয়ে চলে যায়। সেদিনও যথাসময়ে আসার কথা। গরজটা নজর মহম্মদেরও যেমন, কান্তরও তেমনি। নজর মহম্মদ বিনা-নজরানাতে চেহেলসূতুনে নিয়ে যাবে না, সুতরাং কান্তকে নিয়ে গেলে তার লাভ কম নয়।
সারাফত আলি নেশার ঝোঁকেও কান্তকে দেখতে পেয়েই কী রে কান্তবাবু, নজর এল?
কান্ত বললেনা মিঞাসাহেব, এখনও তো তার পাত্তা নেই
আসবে, আসবে, আনেই পড়েগা, না এসে যাবে কোথায়?
কারও মনে হয়েছিল নজর মহম্মদ আসতে দেরি করছে কেন? আজ যে কান্তর একটু তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার। মরালী কেন তার পরিচয়টা দিতে গেল! কেন অমন সর্বনাশ করতে গেল নিজের। নিজেরও সর্বনাশ, পরেরও সর্বনাশ! এখনই যদি কোনওরকমে একবার চেহেল্-সুতুন থেকে বার করে নিয়ে আসা যায় তা হলেই হয়তো সব দিক থেকেই রক্ষে পাবে মরালী।
আচ্ছা মিঞাসাহেব, আজ যদি নজর মহম্মদ আর না আসে?
সারাফত বললে–না আসে তো না আসবে! লেকন উসকে অনেই পড়েগা!
কিন্তু আজ আসবে না? আজ যে আমার জরুরি দরকার ছিল।
আজ না এলে কাল আসবে। মেরে পাস আনেই পড়েগা উসকো!
কিন্তু আজই যে আমার দরকার!
কেন? আজই তোর দরকার কেন?
কান্ত বললে–ওই যে ইব্রাহিম খাঁ, কালকে যে-লোকটা হাতির ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়েছিল, তার কাছে যে চেহেল্-সুতুনের ভেতরের কাণ্ড শুনলুম কিনা, এলাহি কাণ্ড নাকি ঘটে গেছে চেহেলসূতুনে–
দুর, ওরকম কাণ্ড চেহেল্-সুতুনে হামেশা হচ্ছে! ও চেহেল্-সুতুনকা মামুলি বাত!
না, মিঞাসাহেব, রানিবিবি একটা দারুণ কাণ্ড করে বসেছে নাকি।
কী কাণ্ড?
নিজের আসল পরিচয়টা সক্কলকে বলে দিয়েছে রানিবিবি। এতদিন মরিয়ম বেগম বলে সবাই জানত রানিবিবিকে, এখন জেনে ফেলেছে, ও হচ্ছে হাতিয়াগড়ের জমিদারের দ্বিতীয় পক্ষের বউ! সেই জন্যেই তো আমার ভয় হচ্ছে খুব।
কেন, তোর ভয় কীসের? মরিয়ম বেগম হলেও যা, রানিবিবি হলেও তাই। ও একই বাহ্! বাদি ভি বাঁদি, বেগম ভি বাঁদি। বেগমরাও আমার আরক খায়, তোর রানিবিবিও আমার আরক খায়—
কান্ত রেগে গেল। বললে–না মিঞাসাহেব, রানিবিবি কিছুতেই তোমার আরক খায় না।
আজ খায় না কাল খাবে। পহেলে তো কেউ খায় না, পরে খায়। আমার আরক খেলে পহেলে তো আরাম মালুম দেয়, তারপর নেশা পড়ে যায়, তখন মরিয়ম বেগম,বু বেগম, গুলসন বেগম, তক্কি বেগম, ঘসেটি বেগম, আমিনা বেগম, সব গোলমাল হয়ে এককাট্টা হয়ে যায়
সারাফত আলি যখন কথা বলে তখন আর থামতে চায় না। তখন হাজি আহম্মদের একেবারে কুলুজি ধরে টান দেয়। কোথায় যেন একটা বোব অভিযোগের অশান্তি মনের মধ্যে দিনরাত ঘুরপাক খায়, তাই একটু ফুটো পেলেই একেবারে হুড়হড় করে বেরিয়ে পড়ে।
বলে মরিয়ম বেগমই হোক আর হাতিয়াগড়ের রানিবিবিই হোক, আমার আরক ওদের পিলিয়ে দে, ওসব বিলকুল সাফ হয়ে যাক
এসব কথা কাত্তর অনেক শোনা আছে। বুড়োর বকবকানি বেশি ভাল লাগে না। অথচ না-শুনলেও চলে না। বুড়ো বড় ভাল মানুষ। থাকতে দেয়, খেতে দেয়, ঘরভাড়া নেয় না। এত হিন্দু আছে। মুর্শিদাবাদের, তাদের ক’জন এমন করে করবে তার জন্যে। আবার লজ্জাও করে। মাগনা তার জন্যে এ কেন করে সারাফত আলি! নিশ্চয় কোনও ঘা খেয়েছে। এমন ঘা যা বুড়োবয়েস পর্যন্ত ভুলতে পারে না। বাদশাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল কান্ত আচ্ছা বাদশা, মিঞাসাহেবের এত রাগ কেন বলো। তো চেহেলসূতুনের ওপর? তুমি কিছু জানো?
বাদশা বলেছিল-না জনাব, আমি সে বলতে পারব না–
কান্ত বলেছিল আমার জন্যে এত মোহর কেন খরচ করছে? চেহেল্-সুন থাকল কি গেল তাতে মিঞাসাহেবের কী আসে যায়?
ও জনাব আমার জন্যে ভি খরচা করেছিল মিঞাসাহেব! আমি ভি চেহেল্-সুতুনে গিয়েছি কতবার। আমাকে ভি মিঞাসাহেব চেহেলসুতুন ভেঙে গুঁড়িয়ে গোরস্থান বানিয়ে দিতে বলেছিল। আমি পারিনি
নজর মহম্মদই তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল?
জি জনাব!
তুমি গিয়ে কার সঙ্গে দেখা করতে?
বাদশার চোখ কান-মুখ লাল হয়ে উঠেছিল কথা বলতে বলতে। চেহেল্-সুতুনের কথা মনে পড়তেই যেন অনেক লজ্জাকর স্মৃতি মনে উদয় হয়েছিল।
