তুই যাবি আমার সঙ্গে?
আমিনা বেগম বললে–আমি যাব না মা, মিছিমিছি অপমান করে তাড়িয়ে দেবে। তাকে তুমি চেনো না
–নানিবেগম বললে–অবাক করলি তুই আমাকে, মির্জাকে আমি চিনব না তো তুই চিনবি? তাকে তুই মানুষ করেছিস না আমি করেছি?
আমিনা জ্বলে উঠল–মানুষ করলেই বা, আমাকে কি মির্জা মা বলে মনে করে? তা যদি করত তা হলে সেবারই আমার কথা শুনত
কোনবার?
কেন? আমি বারণ করিনি ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করতে? আমার কথা শুনেছে সে? সে তো তুমি জানো। আমি নিজে মতিঝিলে গিয়ে ওকে বললাম তুমি হলে নবাব, বাংলার নবাব, তুমি কেন ওদের সঙ্গে লড়াই করে নিজেকে ছোট করবে? ওরা বেনের জাত, ওদের সঙ্গে লড়াই করলে ওদেরই সম্মান দেওয়া হবে! তা শুনেছে মির্জা আমার কথা? আমাকে উত্তরে কী বললে–জানো? আমি ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে আফিমের কারবার করি বলে নাকি আমি তাদের দিকে টেনে কথা বলছি শোনো কথা!
তারপর একটু থেমে বললে–তা কারবার করলেই আমার দোষ হয়ে গেল? আমার সঙ্গে তো তাদের কেবল টাকার সম্পর্ক! আমি আফিম বেচি সোরা বেচি, তারা কেনে; আমি টাকা পেলেই সম্পর্ক চুকে গেল–
মরালীর মনে হল যার মা এমন, তাকে কেমন দেখতে কে জানে। অথচ তাকে সবাই ভয় করে কেন? বাইরে থেকে যা-কিছু সে শুনেছিল কিছুই তো সে রকম নয়।
আমি যদি গিয়ে বলি, এই বেগমকে এর বাড়ি পাঠিয়ে দাও তো আমাকেই হয়তো শাসাবে, বলবে আমি হয়তো কিছু টাকা নিয়েছি এর কাছ থেকে, নইলে এর জন্যে এত টেনে বলছি কেন? আর আমার কথা না শুনে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কী লাভটা হল? কত টাকা পেলে ও? কিছু তো টাকা পায়নি। টাকা পায়নি বলেই তো ফিরিঙ্গি সাহেব হলওয়েলকে ধরে নিয়ে এসেছে–যদি তাকে…
কাকে ধরে নিয়ে এসেছে?
তুমি শোনোনি কিছু? হলওয়েল সাহেবকে। এখানে মতিঝিলে হাতকড়া দিয়ে বেঁধে এনে যাচ্ছেতাই করে অপমান করছে। ইয়ারবকশিরা বলেছে ওকে চাপ দিলেই নাকি লাখ লাখ টাকা বেরোবে। ফিরিঙ্গিদের খাজাঞ্চিখানা থেকে
নানিবেগম আর দাঁড়াল না। বললে–তা হলে আমি একলাই এই মেয়েকে নিয়ে যাই
তারপর ঘরের বাইরে এসে কোন রাস্তা দিয়ে বেঁকে কোন রাস্তায় বেরোল তার কিছুই বোঝা গেল না। চবুতরের কাছে নানিবেগমের তাঞ্জাম দাঁড়িয়ে ছিল। তাতেই গিয়ে বসল। মরালীকেও নিয়ে সামনে বসাল। তারপর চলতে চলতে একেবারে চেহেল্-সুতুনের বাইরে এসে পড়ল তাঞ্জাম। চেহেল সুতুনের ভেতরে আসার পর, আবার এই প্রথম বাইরে যাওয়া। সমস্ত রাস্তা দু’জনেই চুপচাপ। নানিবেগমের মুখের দিকে চেয়ে দেখলে মরালী। যেন খুব ভাবছে একমনে। যেন বড় উদ্বিগ্ন।
সকালবেলা চকবাজারের রাস্তায় তেমন ভিড় থাকে না। তবু তাঞ্জাম দেখে যেক’জন লোক ছিল তাদের সরিয়ে দিলে কোতোয়ালের লোক। তাঞ্জাম যাতা হ্যায় খেয়াল নেহি? নানিবেগমকা তাঞ্জাম। মুর্শিদাবাদের নোক রাস্তা করে দিলে তাঞ্জামের। তারপর দেখলে সে তাঞ্জামটা গিয়ে ঢুকল মতিঝিলের ভেতরে।
মরালীও পেছন পেছন চলছিল। মতিঝিলের শ্বেতপাথরের চবুতরে নেমে নানিবেগম আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। এবার মরালী চলতে লাগল পাশাপাশি। দূর থেকে কানে গেল যেন কার ভারী গলার আওয়াজ। যেন ভারী গলায় কে কাকে বকছে। নবাব নাকি! নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা। নানিবেগমের মির্জা মহম্মদ!
মাথার ওপরে ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে। সারা দেয়ালে পঙ্খের কাজ। পায়ের তলায় শ্বেতপাথর। যদি বকে তাকে নবাব! নবাবের হুকুম না-মানার জন্যে যদি নানিবেগমকেও বকুনি দেয়, কেন মরিয়ম বেগমকে পাঠাওনি তুমি?
হঠাৎ নানিবেগম বললে–তুই এই ঘরে দাঁড়া বেটি, আমি পাশের ঘরে গিয়ে মির্জাকে ডেকে পাঠাচ্ছি, মির্জা এখন দরবারে বসেছে
মরালী একলাই দাঁড়িয়ে রইল। মতিঝিলের নামই মরালী শুনে এসেছে এতদিন, দেখলে এই প্রথম। এখানেই গুলসন এসেছিল। এখানে আসবার জন্যেই সব বেগমরা পাগল। এখানে একবার এলে এক রাত্রেই ভাগ্য ফিরিয়ে নেওয়া যায়। সেই মতিঝিলের মধ্যে এসেই আজ দাঁড়িয়েছে সে। দেয়ালে দেয়ালে পাখাওয়ালা পরিদের মূর্তি। তাদের হাত বাড়িয়ে দিয়ে ধরতে চাইছে পুরুষমানুষরা। এরাও ছাড়বে না, ওরাও ধরা দেবে না। কোথাও আবার দুটো হাঁস গলা জড়াজড়ি করে জলের ওপর ভাসছে। পাশের ঘরে চলে গেছে নানিবেগমসাহেবা। অলিন্দের দিকে পা বাড়াল মরালী। কাঠের জাফরি দিয়ে ঢাকা অলিন্দ। জাফরির ফাঁক দিয়ে বাইরে দেখা যায়। মরালী বাইরের দিতে চাইলে বিরাট ঝিল। ঝিলের ওপর হাজার হাজার পদ্ম ফুটে রয়েছে। ক’টা বক একমনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে জলের দিকে চেয়ে। টিপ করছে মাছ ধরবে বলে।
হঠাৎ পাশের দিকে নজর পড়তেই মনে হল কে যেন উঁকি দিয়ে তাকে দেখছে। একটা বীভৎস মুখ, একমুখ দাড়ি।
মরালী চোখ ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করলে। কিন্তু খানিক পরে আবার চোখ দুটো ফেরাতেই সমস্ত শরীর যেন আতঙ্কে শিউরে উঠল। মুখটা যেন দাঁত বার করে হাসল। তার দিকে এগিয়ে আসতে চেষ্টা করলে। আর মরালীর মনে হল বীভৎস মূর্তিটা যেন গ্রাস করতে আসছে। মরালী তার চেপে রাখতে পারলে না। হঠাৎ ভয় পেয়ে আর্তনাদ করে উঠল–আঁ-আঁ-আঁ আঁ আঁ–
সঙ্গে সঙ্গে মনে হল কারা যেন পাশের ঘর থেকে দৌড়ে আসছে। অনেকগুলো পায়ের আওয়াজ। সিঁড়ি দিয়ে দুমদাম শব্দ করে যেন কারা দৌড়ে দৌড়ে নীচে নামতে লাগল। তারপরে আর তার জ্ঞান নেই।
