মরালী এক দণ্ড চুপ করে ভেবে নিলে। তারপর বললে–এখান থেকে পরোয়ানা গিয়েছিল হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের নামে–
নানিবেগম বললে–সে আমি জানি, তোমার বড় সতিন আমাকে চিঠি লিখেছিল
চিঠিতে কী লিখেছিল?
নানিবেগম বললে–তুমি যা বললে–মা, সে-ও ওই কথাই লিখেছিল, আমি মেহেদি নেসারকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম চিঠিটার কথা সত্যি কি না।
কী বললে–মেহেদি নেসার সাহেব?
নানিবেগম বললে–ওসব কথা তোমার শুনে দরকার নেই মা! এই মুর্শিদাবাদে কেউ সত্যি কথা বলে না, কাকে বিশ্বাস করব? মির্জা, আমার নাতি, তারও সময় নেই আমার সঙ্গে কথা বলার, সেও নানান হাঙ্গামায় জড়িয়ে পড়েছে তাকেই বা দোষ দিই কী করে, সবাই মিলে তাকে নাজেহাল করে দিচ্ছে
কেন? মরালী উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলে–কেন মা? কে নাজেহাল করছে?
নানিবেগম বললে–সে তুমি বুঝবে না মা, না বোঝাই ভাল লোমাদের! আমি কিছু কিছু বুঝি, এক এক সময় আমিই তো ভাবতাম, নবাবের বেগম হওয়ার চাইতে গরিবের ঘরের বউ হওয়া এর চেয়ে অনেক ভাল। তা সে-সব কথা থাক, আমার সঙ্গে তুমি এক জায়গায় যাবে?
নিশ্চয়ই যাব। কোথায় মা?
মতিঝিলে। মির্জার কাছে।
নামটা শুনেই মরালী ভয় পেয়ে গিয়েছিল প্রথমে। নবাব! নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা! যার মহফিলের আসরে গুলসন নাচতে গিয়েছিল। যেখানে গেলে ভাগ্য ফিরে যায় এক রাত্রের মধ্যে। যেখানে যেতে পারার জন্যে নজর মহম্মদকে ঘুষ দেয় বেগমরা। সেই মির্জা মহম্মদ! মরালীর সমস্ত গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। সেই মতিঝিলে নানিবেগমসাহেবা তাকে নিজে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে!
ভয় পেয়ো না মা, ভয় কীসের? আমি তো তোমার সঙ্গে থাকব! আর লোকে মির্জার সম্বন্ধে নানান কথা বলে বটে, কিন্তু আমি তো মা আমার মির্জাকে চিনি। এই এতটুকু বেলা থেকে মা, ওই নাতি আমার কাছে মানুষ হয়েছে। আমিনা, ওর মা তো দেখতও না। শুধু কি এখানে, আমি যেখানে গিয়েছি সেখানেই সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছি, ওর নানা যেদিন নবাবি পেয়েছিল সেইদিনই ও জন্মায়। ও আমায় খুব পয়া নাতি মা! ওর কত বুদ্ধি, ওর কত বিদ্যে, তা তোমরা কেউ জানো না। ওর ইয়ারবকশিরা ওকে খারাপ পরামর্শ দিয়ে দিয়ে ওইরকম করে দিয়েছে, নইলে ও ভয় করবার মতো ছেলেই নয়–তোমরা ওকে ভুল বুঝো না মা। আর তা ছাড়া আমি তো থাকছি সঙ্গে
তারপর মরালীকে নিয়ে সোজা লুৎফুন্নিসার ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল।
ক’দিন আগেই মরালী এই ঘরে একলা একলা এসেছিল। এই সেই নবাবের ঘর। মরালী আবার চেয়ে দেখলে চারদিকে। সেই বাঁদিটা আবার দরজা খুলে দিয়ে নানিবেগমকে কুর্নিশ করলে। কী চমৎকার দেখতে! তাকে দেখে একটু হাসল লুৎফুন্নিসা বেগম। যেন আত্মীয়তা পাতিয়ে ফেলেছে একদিনেই।
নানিবেগম বললে–আমি যাচ্ছি আমার এই বেটিকে নিয়ে মির্জার কাছে–
লুৎফুন্নিসা বললে–কিন্তু কেন যাচ্ছ তুমি নানিজি! যদি এখন তার মেজাজ খারাপ থাকে? যদি তোমার সঙ্গে দেখা না করে?
আমার সঙ্গে দেখা করবে না মির্জা? আমার মির্জাকে আমি চিনি না?
লুৎফুন্নিসা বললে–না নানিজি, আমি শুনেছি তার মেজাজ ভাল নেই, কলকাতা থেকে ফিরিঙ্গিদের ধরে নিয়ে এসেছে, তার দরবার হচ্ছে সেখানে–
তা হলই বা। তা বলে সে তার নানির সঙ্গে দেখা করবে না?
কিন্তু নানিজি, তুমি কী বলবে সেখানে গিয়ে?
আমি বলব, এই রানিবিবিকে হাতিয়াগড় থেকে কেন নিয়ে আসা হয়েছে, তার কৈফিয়ত চাইব মির্জার কাছে।
কিন্তু নানিজি, এ কি এই প্রথম? এর আগেও তো কতবার এরকম হয়েছে, কত লেড়কি এখানে এসেছে, তার বেলায় তো তুমি কিছু বলেনি। তারাও তো এই বহেনজির মতো কষ্ট পেয়েছে।
তাদের কথা আলাদা।
কেন? আলাদা কেন? তারা কি মানুষ নয়? তাদেরও কি স্বামী, বাপ, মা কেউ নেই? তারা কি এখানে এসে কেঁদে কেঁদে রাত কাটায়নি? তুমি তাদের জন্যে কী করেছ?
নানিবেগম কী যেন ভাবল একবার। তারপর বললে, তুই যা বলেছিস সব সত্যি বহু, কিন্তু তখন তো আমি একলা ছিলাম না মা। তখন যে নানানবাব ছিলেন মাথার ওপর, তাঁর কথার ওপর তো আমি কথা বলতে পারতাম না। এখন যত দিন যাচ্ছে, তত যে বাড়ছে–এর তো একটা বিহিত করা দরকার–
দেখো, তুমি যদি পারো, আমি কিছু জানি না।
নানিবেগম বললে–আমিনা কোথায় রে? আমিনাকে একবার বলে যাই
বলে মরালীকে নিয়ে আবার বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তারপর চলতে চলতে অন্য এক মহলে চলে। গেল। মরালীও সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছিল। চারদিকে চেয়ে চেয়ে অবাক হয়ে যাচ্ছিল মরালী। এও যেন একটা শহর। শহরের রাস্তার দুপাশে বাড়ি ঘর-দোর। সামনে পেছনে যারা আসছে যাচ্ছে তারা নানিবেগমকে দেখে সবাই ভয়ে-ভক্তিতে নিচু হয়ে কুর্নিশ করছে। আর মরালীর মুখখানাকে দেখছে। মরিয়ম বেগমকে সবাই চিনতে পারছে। কাল যে কাণ্ড করে বসেছে মরালী, তারপর তাকে চিনতে আর কারও বাকি নেই।
আমিনা?
নানিবেগম ঘরের মধ্যে ঢুকল। এই আমিনা বেগম! নবাব-বেগমদের অনেক কথা বাইরের লোক জানে। মরালীও জানত। যেন সব স্বপ্নের জগৎ। হাতিয়াগড়ের মানুষেরা এই আমিনা, ঘসেটি, সবাইকার কাহিনী জানত। হোসেনকুলি খাঁ’র কথা জানত। নবাব আলিবর্দি খাঁ’র বড় আদরের মেয়ে এই আমিনা। মরালীর চোখ দুটো জুড়িয়ে গেল!
আমিনা বেগমও অনেকক্ষণ ধরে দেখলে মরালীকে। তারই পেটের ছেলে মির্জা মহম্মদ এই মেয়েকে হাতিয়াগড় থেকে এখানে নিয়ে এসেছে।
