মিরজাফর আলি সাহেব যেন বিব্রত বোধ করতে লাগল।
পাঙ্খাওয়ালা আরও জোরে জোরে পাখা নাড়ছে। মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, সফিউল্লা, রাজা দুর্লভরাম সবাই পাথরের মূর্তির মতো নবাবের রায় শোনবার জন্যে কান পেতে রয়েছে।
উত্তর দিন, কেন আপনি এ-চিঠি লিখতে গেলেন?
ওদিকে একটা তাঞ্জাম দুলতে দুলতে এসে ঢুকল মতিঝিলের ফটকে। ঝালরদার, সোনা-চাদির ঝকমকে তাঞ্জাম। এ-তাঞ্জাম দেখলেই চিনতে পারে মতিঝিলের ফটকের পাহারাদার। এটা নানিবেগমের নিজস্ব তাঞ্জাম। কুর্নিশ করে পাহারাদার তাঞ্জাম ভেতরে পৌঁছিয়ে দিয়ে এল। সামনে ঝিল। সেই ঝিল পেরিয়ে এসে তাঞ্জাম সোজা ভেতরে চবুতরে ঢুকে গেল।
ও যদি আপনার হাতের সই হয় তো আপনি বলুন, ও-চিঠি কেন লিখতে গেলেন?
মতিঝিলের বাঁদি এসে তাঞ্জামের ঝালর তুলে ধরল। তাঞ্জাম থেকে নামল নানিবেগম। আর তার পেছন পেছন আর একজন বেগম নামল। তাকে এর আগে বাঁদি কখনও দেখেনি। দু’জনেই তাঞ্জাম থেকে নেমে আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
আমার কথার উত্তর দেবেন না আপনি? উত্তর দিন!
ইব্রাহিম খাঁ সরাবখানার মধ্যে অন্ধকারে চুপ করে বসে ছিল। হাতির চোট খাবার পর সেদিন কিছু বিশেষ বোঝা যায়নি। কিন্তু পরদিন থেকেই গায়ে-গতরে একেবারে ব্যথা হয়ে টনটন করছিল।
ও-চিঠি জাল!
তাঞ্জামটা নজরে পড়েছিল ইব্রাহিম খাঁ’র। সিঁড়ির নীচেয় মতিঝিলের সরাবখানা। ঘুলঘুলিটা দিয়ে ওদিকটা দেখা যায়। হঠাৎ নজরে পড়ল দু’জন বেগম নামল তাঞ্জাম থেকে। নানিবেগমের তাঞ্জাম দেখলেই সবাই চিনতে পারে। নানিবেগমকে অনেকবার দেখেছে ইব্রাহিম খাঁ। কিন্তু পাশের বেগমকে দেখেই চমকে উঠল সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ। যেন খুব চেনা-চেনা মুখ। কোথায় যেন দেখেছে, কোথায় যেন বড় কাছ থেকে দেখেছে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলে না। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে গেল। হাতিয়াগড়ের নফর শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ে সেই মরালী না?
জাল? আপনি প্রমাণ করতে পারেন, এ-চিঠি জাল চিঠি?
নেয়ামত খাঁ তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকল। নবাবের সামনে এসে তিনবার কুর্নিশ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললে–জাঁহাপনা, নানিবেগম!
নানিবেগম! এখানে! মতিঝিলে! এই অসময়ে! নবাব মির্জা মহম্মদ যেন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। মেহেদি নেসারের কানেও কথাটা গিয়েছিল। সেও কেমন যেন শুকিয়ে গেল কথাটা শুনে। মিরজাফর আলি সাহেব, হলওয়েল, রাজা দুর্লভরাম, ইয়ারজান, সফিউল্লা, মোহনলাল সবাই একটু নড়ে দাঁড়াল এতক্ষণ পরে।
সরাবখানার অন্ধকারে সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ তখনও আকাশ-পাতাল ঘুরে বেড়াচ্ছিল। শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ে তো নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল বিয়ের পর। আবার এখানে এল কেমন করে?
নবাব মির্জা মহম্মদ মসনদ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পাশের ঘরের দিকে গেল। যাবার সময় বলে গেল আপনারা বসুন। আমি আসছি—
*
চেহেল্-সুতুনের ভেতরেও বোধহয় তখন তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। সকলেই অবাক হয়ে গিয়েছিল নানিবেগমের হুকুম শুনে। লুৎফুন্নিসার ঘরে গিয়ে নানিবেগম বলেছিল–আমি মতিঝিলে যাচ্ছি বহু
এমন সাধারণত হয় না। নানিবেগমকে যারা জানে তারা শুধু তাকে এতদিন কোরান হাতে নিয়ে থাকতেই দেখেছে।
আমি গিয়ে মির্জাকে জিজ্ঞেস করব এই রানিবিবিকে কে এখানে আনতে হুকুম দিয়েছে, মির্জা নিজে মেহেদি নেসার
মরালী চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। সমস্ত চেহেলসূতুন আজ তাকে চিনে ফেলেছে। এতদিন এখানে এসেছে, কিন্তু কেবল নিজের ঘরের মধ্যেই কাটিয়েছে সারা দিনরাত। তাকে কেউ চিনত না, কেউ জানত না, এক গুলসন ছাড়া। মরালী ভেবেছিল এমনি করেই চারটে দেয়ালের মধ্যে বুঝি তার জীবন কেটে যাবে। সবাই তাকে মরিয়ম বেগম বলেই জানবে। তারপর একদিন সবার অগোচরে চেহেল্ সুতুনের বাইরে খোশবাগের কবরখানায় চারজন লোক তাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে গিয়ে কবর দিয়ে দেবে। কিন্তু তা হল না। সব জানাজানি হয়ে গেল। জুবেদার ওই অবস্থা দেখে আর চেপে রাখতে পারেনি সে নিজেকে। একেবারে সকলের মুখোমুখি হয়ে নিজের পরিচয় সকলকে জানিয়ে দিয়েছে।
নানিবেগম প্রথমে অনেক সান্ত্বনা দিয়েছিল তোমার কিছু ডর নেহি বেটি, তুমি আমার কাছে কিছু চেপে রেখো না, বললো, তোমার কী হয়েছে?
মরালী বলেছিল–আমি অনেক দিন ধরে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলাম মা, আমার অনেক কথা বলবার ছিল কিন্তু কেউ আপনার সঙ্গে আমাকে দেখা করতে দিত না
কে দেখা করতে দিত না?
ওই আপনার খোজা নজর মহম্মদরা। একদিন গুলসন বেগমের সঙ্গে আপনার কাছে লুকিয়ে লুকিয়ে আসছিলাম, তারপর ভয় পেয়ে ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ঢুকে পড়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম
তারপর?
তারপর সেদিন রাত্তিরে লুৎফুন্নিসা বেগমসাহেবার ঘরে ভুল করে ঢুকে পড়েছিলাম, ভেবেছিলাম, ওইটেই বুঝি গুলসন বেগমের ঘর। সেখান থেকে নিজের ঘরে গিয়ে দেখি মেহেদি নেসার সাহেব আমার ঘরে বসে আছে, আর তারপরই নজর মহম্মদ আপনাকে গিয়ে খবর দিতেই আপনি এলেন, আপনি এসে আমাকে মেহেদি নেসার সাহেবের হাত থেকে বাঁচালেন। সেদিন আপনি আমায় আদর করলেন, আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন, আমি বললাম আমার নাম মরিয়ম বেগম। তখন আমি ভয়ে আপনাকে সত্যি কথা বলতে পারিনি মা–
হাতিয়াগড় থেকে এখানে তোমায় কে আনলে?
