নেসার সাহেব চিঠিটা পড়ে আস্তে আস্তে কুর্নিশ করে চিঠিটা নবাবের হাতে দিলে।
চিঠিটা পড়তে পড়তে মির্জার চোখ দুটো কেমন জ্বলে উঠল তাও লক্ষ করলে নেসার সাহেব।
নবাব জিজ্ঞেস করলে–এখত কোত্থেকে এল?
জাঁহাপনা, আমার দফতরের লোক আদায় করে এনেছে
আর সঙ্গে সঙ্গে যেন বোমা ফেটে উঠল মতিঝিলের দরবারঘরে। হয়তো বোমা ফাটলেও এত চমকাত না কেউ। আলিবর্দি খাঁর আমলে যে-মির্জাকে মিরজাফর দেখেছে এ যেন সে-মির্জা নয়।
এ-মির্জা এরকম গলার আওয়াজ কোথায় পেল! যাকে সবাই আড্ডাবাজ, ফুর্তিবাজ বলে জেনে এসেছে এতদিন, সে বুঝি একটা লড়াই জিতে এসেই একেবারে খাঁটি নবাবিআনা শিখে ফেলেছে।
পাঙ্খাওয়ালা পেছনে দাঁড়িয়ে বিরাট পাখা চালাচ্ছিল, হঠাৎ ভয় পেয়ে তার হাত থেকে পাখাটা পড়ে গেছে।
মিরজাফর আলি সাহেব!
১৭৩০ সালে যে-মির্জার জন্ম, তার বয়েস সবে ছাব্বিশ পেরিয়েছে। অথচ তারই সামনে পাকা ঝুনোঝানু সব আমিওমরা ভয়ে স্থির হয়ে রয়েছে স্থাণুর মতো।
মিরজাফর আলি সাহেব এক-পা এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে কুর্নিশ করলে।
আপনি এ-চিঠি লিখেছেন?
বহু শতাব্দী আগে মোগলবংশ হিন্দুস্থান দখল করে নিয়েছিল। ততদিনে সে-দখল কায়েমি হয়েও গিয়েছিল। কিন্তু রাজনীতি বোধহয় চিরকালই বেকায়েম। রাজনীতির অভিধানে কায়েমি বলে কোনও শব্দ নেই। মসনদ আজ আছে, কাল নেই। কিন্তু নবাব আলিবর্দি খাঁ’র পাশে থেকে থেকে কবে যে মির্জা সেকথা শিখে নিয়ে রপ্ত করে ফেলেছিল তা বোধহয় তার ঘনিষ্ঠ ইয়ার মেহেদি নেসাররাও জানত না। তাই সেদিন সেই মতিঝিলের দরবারের মধ্যে নবাব মির্জা মহম্মদের গলা শুনে তারা চমকে গিয়েছিল।
আমার ভাইকে আপনি বিদ্রোহ করবার জন্যে এই চিঠি লিখেছেন? এ তো দেখছি আপনারই হাতের লেখা। দেখুন, আপনার হাতের লেখা আপনি চিনতে পারেন কি না, আপনি নিজেই পড়ে দেখুন
মিরজাফর আলি সাহেব চিঠিটা নিজের হাতে নিলে। তারপর আবার সেখানা ফিরিয়ে দিলে মির্জার হাতে।
কী দেখলেন?
মিরজাফর আলি সাহেব কোনও উত্তর দিলে না।
তা হলে কি বুঝব আপনিও আমাকে ভুল বুঝলেন? আপনি জানেন যে, আমার বল-ভরসা বলতে যা-কিছু সব আপনারা। সেই আপনি কিনা আমার শত্রুতা করবার জন্যে তৈরি? আমি যে নতুন সিংহাসন পেয়ে সুস্থির হয়ে সবকিছু সুব্যবস্থা করব, তাও আপনারা আমাকে করতে সময় দেবেন না? ফিরিঙ্গিদের আমি বুঝতে পারি। তারা হিন্দুস্তানে এসেছে ব্যাবসা করে টাকা উপায় করতে। কিন্তু আপনারা? আপনারা যে আমার আত্মীয়! আপনাদের যে আমি সবচেয়ে বিশ্বাস করি। আপনারই যদি এমন করে বিশ্বাসঘাতকতা করেন তো আমি দাঁড়াব কোথায়? কার মুখের দিকে চেয়ে আমি রাজ্য চালাব?
তবু মিরজাফর আলি সাহেব চুপ!
আমি জানি আমার আড়ালে লোকে আমার নামে কী বলে! আমার নিজের দোষ নেই একথা আমি বলছি না। আমার নিজের দোষটাও আমি জানি, আমার কী ভাল তাও জানি। কিন্তু আপনারা? আপনাকেই আমি জিজ্ঞেস করছি, আমার কি কোনও গুণই নেই? এমন কোনও সদগুণ নেই যার জন্যে আমি আপনাদের সহানুভূতি পেতে পারি? আপনাদের ভালবাসা পেতে পারি? আপনারা কি সত্যিই চান আমার বদলে অন্য কেউ এই মসনদে বসলে দেশের মঙ্গল হবে? আপনারা মুখ ফুটে বলুন। সে-কথা! আমি স্বেচ্ছায় মসনদ ছেড়ে চলে যাব। যদি বোঝেন আমার মাসতুতো ভাই শওকত জঙ এলেই দেশের ভাল হবে, তা হলে তাই-ই বলুন, তা হলে তাকেই ডেকে এনে আমার জায়গায় বসিয়ে। দেব। আর যদি বোঝেন ঘসেটি বেগম এলেই দেশের ভাল হবে তো তাতেও আমি গররাজি নই। আমি এক্ষুনি আমার মাসিকে চেহেল্-সুতুনের বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়ে দিচ্ছি
মিরজাফর সাহেব তখনও চুপ করে আছে।
লোকে বলে আমি নাকি দেশ শাসনের কিছুই জানি না। আমি স্বীকার করছি দেশ শাসনের আমি কিছুই জানি না। কিন্তু আমি তো সবে দেশের ভার মাথায় তুলে নিয়েছি। আমাকে প্রথমে জানতে সময় দিন, বুঝতে অবসর দিন, তবে তো শিখতে পারব। তার পরেও যদি দেখেন আমি কিছুই জানি না, তখন আমাকে না-হয় সরিয়ে দেবেন। সরিয়ে দিয়ে যাকে খুশি আমার সিংহাসনে বসাবেন। আমি খুশি মনে আপনাদের কাছে বিদায় নিয়ে চলে যাব। আর কখনও মুর্শিদাবাদে আসব না, প্রতিজ্ঞা করে যাব–
তখনও মিরজাফর আলি সাহেব চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিছু কথা বলেনি।
এই যে পাষণ্ড হলওয়েল দাঁড়িয়ে আছে, যদি মনে করেন এরাই দেশের ভাল করবে তো এদের হাতেই না-হয় এই মুর্শিদাবাদের মসনদ তুলে দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু যদি মনে করেন যে, এরা দেশের দুশমন, এরা কারবার করবার নাম করে এখানে আমাদের ভাইতে-ভাইতে লড়াই লাগিয়ে দিয়ে নিজেরা এই মসনদ কেড়ে নেবার মতলব করছে, তবে তাদের শায়েস্তা করা কি এতই অন্যায়? যে তাদের শায়েস্তা করবে, তাকে কি আপনারা কুশাসক বলবেন? বলবেন কি সে দেশ শাসন করতে। জানে না?
তারপর একটু থেমে আবার বলতে লাগল–স্বীকার করছি আমার বয়েস কম, অভিজ্ঞতা কম, জ্ঞানও কম, কিন্তু আপনি আমার ডান হাত, আপনার তো অনেক বয়েস, আপনার তো অনেক অভিজ্ঞতা, আপনার তো অনেক জ্ঞান; আপনি সহায় থাকতে আমি দেশ শাসন করতে পারব না-ই বা কেন? যদি না পারি সে তো আপনারও লজ্জা! আপনারও কলঙ্ক! লোকে আপনাকেই দোষ দেবে, বলবে যে আপনার মতো অভিজ্ঞ আত্মীয় থাকতেও কম বয়েসি নবাবকে আপনি কিছু সাহায্য করেননি। কী হল, আপনি কথা বলছেন না কেন, উত্তর দিন?
