*
চেহেল সুতুনের ইতিহাসে যা কখনও হয়নি, সেদিন যেন তাই-ই হয়েছিল। সেদিনকার চেহেল্-সুতুনের নিয়মকানুনে যেন হঠাৎ ভাটা পড়ল। অনেক দিন পরে যখন অনেক কিছু বদলে গিয়েছিল, মুর্শিদাবাদের ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গিয়েছিল তখনকার দিনের কথা আর কারও মনে থাক আর না থাক, কান্তও তখন নেই, আর মরালী তো মেরী বিশ্বাস হয়ে গেছে সেই সময়কার সব কাহিনী একে একে। সংগ্রহ করে রেখে গেছে উদ্ধব দাস। সমস্ত কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখে গেছে পুঁথির পাতায়। মুর্শিদাবাদ, কাশিমবাজার, কলকাতা, পলাশি, সমস্ত যেন উদ্ধব দাস নিজের চোখে দেখেছে। লর্ড ক্লাইভের বাগানবাড়িটাও তার লেখায় বাদ পড়েনি। বিরাট বিরাট থামওয়ালা বাড়িটা। তার চারপাশে চল্লিশ বিঘে বাগান। সেই বাগানের মধ্যে বসে থাকত ক্লাইভ সাহেব। আর সেইখানে তখন থাকত মরালী। বেগম মেরী বিশ্বাস।
মানুষের মনের অন্তস্তলে কোথায় বুঝি এক অদৃশ্য অন্তর্লোক আছে। সেখানকার সন্ধান সে সবসময় নিজেও রাখে না। রাখবার চেষ্টাও করে না। কিংবা খবর রাখবার চেষ্টা করাই হয়তো পণ্ডশ্রম। কিংবা হয়তো সেইটুকু তার একান্ত গোপন সম্পদ। সেই সম্পদটুকু গোপনে পুষে রেখেই সে বুঝি তৃপ্তি পায়। তুমি আমার স্বামী হলেও তোমার প্রবেশ সেখানে নিষেধ। সেখানকার খবর কেউ যেন না জানতে পারে। আমি যতদিন বাঁচব ততদিন সেটুকু আমার। আর কারও নয়। আমার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ দিয়ে তাকে আমি আমার অন্তরে লালন করব। সে তুমি হাজার প্রশ্ন করলেও আমি বলব না। কান্তর কথা আমাকে জিজ্ঞেস কোরো না তুমি।
কিন্তু উদ্ধব দাসের অদ্ভুত ক্ষমতা। সেই একান্ত গোপন খবরটুকুও সে বুঝি কেমন করে জেনে ফেলেছিল। বেগম মেরী বিশ্বাসের পাতায় পাতায় তা-ই সে সবিস্তারে লিখে গেছে। কবে একদিন কান্ত কেমন করে নিজের অগোচরে অন্তরের অনুরাগটুকু দিয়ে উদ্ধব দাস আর মেরী বেগমের অস্তিত্ব নিরাপদ করে গিয়েছিল তাও উদ্ধব দাস লিখতে বাকি রাখেনি। বাংলার ইতিহাসের এক অনিবার্য সন্ধিক্ষণে মরালীকে ঢুকতে হয়েছিল মুর্শিদাবাদের চেহেল্-সুতুনে, আর ভাগ্যবিধাতার এক অমোঘ নির্দেশে কান্তকেই আবার সেই দূর্ঘটনার সাক্ষী থাকতে হয়েছিল। আর উদ্ধব দাস? উদ্ধব দাসই বা এত জায়গা থাকতে সেদিন সেই রাত্রে হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির অতিথিশালায় গিয়ে হাজির হবে কেন? হয়তো সে হাজির না থাকলে এই পলাশির যুদ্ধও হত না, হয়তো বাংলার ইতিহাসের পাতাগুলো অন্যরকম করে লেখা হত। হয়তো ক্লাইভ সাহেবকেও শেষ জীবনে নিজের জীবনটা নিজের হাতে নিতে হত না। হয়তো সেখানে হাজির না থাকলে নানিবেগম সুখী হত, লুৎফুন্নিসা বেগমও সুখী হত। মরালী, কান্ত, উদ্ধব দাস, মিরজাফর, সবাই জীবনটা সুখেই কাটিয়ে দিতে পারত।
কিন্তু হয়তো তা হবার নয়।
হবার নয় বলেই আজ এত বছর পরে তাদের নিয়ে বেগম মেরী বিশ্বাস’ লিখতে বসেছি।
কিন্তু সেদিনকার কাহিনী কেমন করে বলব বুঝতে পারছি না। এই দুশো বছর পরে আমি কি বর্ণনা করতে পারব সেদিনকার মরালীর মনের অবস্থা?
মতিঝিলের দরবার-ঘরের ভেতরে তখন সকলের বিচার শেষ হয়ে গেছে। হয়তো সেটা সুবিচারই। কিংবা হয়তো অবিচার। কৃষ্ণবল্লভ, উমিচাঁদ, তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফিরিঙ্গিরা যখন লড়াইতে হেরেই গেছে তখন আর তা নিয়ে জল ঘোলা করে লাভ কী। হলওয়েল সাহেব মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে ক্ষমা চেয়েছে। তার বিচারই শুধু তখনও বাকি ছিল।
আগের দিন রাত্রে গুলসন বেগমের নাচ হয়েছে সারারাত। মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, সফিউল্লা সাহেব, তাদের তখনও নেশা কাটেনি বোধহয়। কিন্তু নবাব যে এত ভোরে উঠে সকলকে ডাকাডাকি করবে তা কেউ বুঝতে পারেনি।
নেয়ামত ছুটতে ছুটতে এসেছে।
জনাব, নবাব এত্তেলা দিয়েছে।
মতিঝিলের দরবার ততক্ষণে জমজমাট। সত্যিই নবাবের যেন ক্লান্তি নেই। যে-মির্জার সঙ্গে তারা একদিন ইয়ারকি করেছে, আড্ডা দিয়েছে, ফুর্তি করেছে, মহফিল জমিয়েছে, সেই মির্জাই যখন আবার লড়াই করতে যায়, যখন দরবার বসায়, তখন যেন আবার সে অন্য মানুষ। তখন যেন আর চেনা যায় না সেই মির্জাকে। তখন যেন সে সত্যিইনবাব। তখন যেন সে মুর্শিদাবাদের খোদাতালা। মির্জার সামনে দাঁড়িয়ে তখন মেহেদি নেসারও থরথর করে কাঁপে। যে-মিরজাফর আড়ালেতে কিছু বলে বেড়ায়, সামনে এসে কিছু বলবার আর সাহস থাকে না তার। নবাব শোলাম হোসেন খাঁ বাহাদুর এতদিনের লোক, আলিবর্দি খাঁর আমলের পুরনো নিজামতি দারোগা আর আরজবেগি, তাকে পর্যন্ত মক্কায় যাবার নাম করে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল নবাবের ভয়ে।
মেহেদি নেসার সাহেবরা যখন দরবারে এসে হাজির হল তখন হলওয়েল সাহেবের দুটো হাতে হাতকড়া। হাতকড়া-বাঁধা অবস্থায় নবাবের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাহেব।
রাজা দুর্লভরাম একপাশে। তার ওপাশে মিরজাফর সাহেব। সমস্ত আবহাওয়াটাই যেন জাকুটি কুটিল। মেহেদি নেসার সাহেব মিরজাফর খাঁ’র দিকে চেয়ে দেখলে। বড় শান্ত সুখী মানুষটা। বাইরে থেকে দেখলে কিছু বোঝবার উপায় নেই।
বশির মিঞা গুটি গুটি পায়ে মেহেদি নেসার সাহেবের পেছনে এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে চুপি চুপি হাতে একটা চিঠি দিয়ে আবার বাইরে চলে গেল।
