তা হলে আমার একটা চাকরির কিছু চেষ্টা করবেন?
সচ্চরিত্র বললে–আমার যদি পরামর্শ নাও তো বলি, এ-জায়গায় তুমি চাকরি কোরো না বাবাজি। তা হলে আমার মতো তোমারও ইহকাল-পরকাল দুই-ই যাবে!
না ঘটকমশাই, সে যা-হয় হবে, আপনি আমার একটা চাকরি দেখুন। নিজামতের চাকরিই আমায় করতে হবে।
কেন বাপু? নিজামতের চাকরির ওপর তোমার লোভ কেন এত? এর থেকে জমিদারি সেরেস্তার চাকরি একটা কোথাও জুটিয়ে নিলেই পারে। তাতে আয় কম হলেও ধর্মটা থাকে।
কান্ত বললে–সে আপনি বুঝবেন না ঠিক, মতিঝিলের চাকরি হলেই আমার ভাল হয়।
কেন?
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ বুঝতে পারলে না কান্ত বাবাজির এত আগ্রহ কেন মতিঝিলের চাকরির ওপর।
তারপর বললে–ঠিক আছে, এখন যাই বাবাজি, আমার নমাজের দেরি হয়ে গেল
সারাফত আলির দোকানের সামনে তখনও লোকজনের চলাচল শুরু হয়নি। সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ। মশাই একা সেই রাস্তায় নেমে হনহন করে এগিয়ে চলল। মাটির হাঁড়াটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, সব মদ রাস্তার ধুলোর ওপর পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। একটু একটু খোঁড়াচ্ছে যেন। কান্তর মনে হল হাতির পায়ের তলায় চাপা পড়লে আর বাচত না লোকটা।
আস্তে আস্তে সচ্চরিত্র অনেক দূরে অদৃশ্য হয়ে যাবার পরও কান্ত সেইখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এই তো একটু দূরে চেহেল-সুতুন। সেই তারই ভেতরে এখন হয়তো ভীষণ তোলপাড় চলছে। কেন। বলতে গেল মরালী নিজের পরিচয়টা? মিথ্যে করে থোক, সত্যি করে থোক, কারও নাম বলবার। দরকারটা কী ছিল? যদি এখন হাতিয়াগড়ে খবর যায়! যদি খোঁজ পড়ে রানিবিবিকে তারা না-পাঠিয়ে মরালীকে পাঠিয়েছে, তা হলে? অথচ, কেউ জানতে না-পারলে হয়তো একদিন পালিয়ে যেতে পারত চেহেল্-সুতুন থেকে।
মনে হল এখনই যদি একবার গিয়ে সাবধান করে দিয়ে আসতে পারত মরালীকে।
হঠাৎ পেছনে আওয়াজ হতেই কান্ত ফিরে দেখলে। সারাফত আলি সাহেব জেগে উঠে দোকানে। এসেছে।
কী রে কান্তবাবু, সে-লোকটা কেমন আছে? সেই ইব্রাহিম খা? বেটা মরেছে না জিন্দা আছে?
কান্ত বললে–মতিঝিলে চলে গেছে।
তা হলে জিন্দা আছে? দারু পিয়ে পিয়ে কলিজায় ওদের কড়া পড়ে গেছে, ওরা কখনও মরে? ঝুটমুট তুই কালকে চেহেল্-সুতুনে গেলি না। নজর মহম্মদ এসে রাত্তিরে ডেকে ডেকে ফিরে গেল।
কান্ত জিজ্ঞেস করলে–আজ নজর মহম্মদ আসবে?
সারাফত আলি বললে–ক্যা মালুম, ও-লোককা মর্জি! আজ এলে যাবি তুই?
হা মিঞাসাহেব, আজকে যাবই। কালকে ইব্রাহিম খাঁ’র কাছে যা শুনলুম তাতে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছি–কালকে নাকি রানিবিবি নিজের আসল পরিচয় সকলের সামনে বলে দিয়েছে। সব জানাজানি হয়ে গিয়েছে। নেসার সাহেবকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে নানিবেগম, খোজা সর্দার পিরালি খাঁ খুব চটে গেছে রানিবিবির ওপর। এখন কী হবে বুঝতে পারছি না! এখন যদি কিছু সর্বনাশ হয়!
সারাফত আলি বললে–কুছ নেই হোগা! মোহর পেলেই সব ফয়সালা হয়ে যাবে। এক মোহরে কাম না হয় দো মোহর দেঙ্গে, দো মোহরে কাম না হলে তিন মোহর দেঙ্গে। মোহর দিলে সব জব্দ। সবাই খুশি। হিন্দুস্থানের বাদশা ভি মোহর পেলে সব ভুলে যায়, তো নজর মহম্মদ। নজর মহম্মদের বাপ পর্যন্ত মোহর পেলে কবর থেকে হাত বাড়াবে। তুই কিছু ভাবিসনি কান্তবাবু।
রাস্তায় কে যেন গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিল। গানের সুরটা কানে আসতেই কান্ত সচেতন হয়ে উঠেছে। উদ্ধব দাস না!
আমি রবো না ভব-ভবনে
শুন হে শিব শ্রবণে!
কান্ত এক লাফে রাস্তায় নামল। তারপর চিৎকার করে ডাকতে লাগল-দাসমশাই, ও দাসমশাই–
উদ্ধব দাস পাগলাকছমের লোক। যেন শুনতেই পায়নি। বেশ গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে চলেছে। কান্ত দৌড়িয়ে কাছে যেতেই উদ্ধব দাস পেছন ফিরল।
কান্ত বললে–তোমাকেই তো আমি খুঁজছিলাম দাসমশাই
কিন্তু কথাটা বলেই কেমন যেন সন্দেহ হল। জিজ্ঞেস করলে আপনি উদ্ধব দাস না?
উদ্ধব দাস?
লোকটাও অবাক হয়ে গেছে। বেশ আপন মনেই গান গাইতে গাইতে আসছিল। হঠাৎ অচেনা লোকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বললে–আমি উদ্ধব দাস কেন হতে যাব বাবা, আমি তো পরমেশ্বর দাস।
কিন্তু এ-গান তো উদ্ধব দাসেরই বাঁধা। উদ্ধব দাসই তো এ-গান গায়।
লোকটা বললে–তা হতে পারে বাবা, গানটা একদিন এক মাঝির গলায় শুনেছিলাম, তাই মুখস্থ করে নিয়েছি। ভণিতাতে তো ভক্ত হরিদাসের নাম আছে।
কান্ত মনে মনে হতাশ হয়ে গেল। উদ্ধব দাসের সঙ্গে এখন দেখা হলে খুব ভাল হত। উদ্ধব দাসকে দেখা হলে বলা যেত যে তারই বউ চেহেল্-সুতুনে আছে। তার বড় বিপদ! অথচ আশ্চর্য! যার বউ, যে বিয়ে করল তার মাথাব্যথা নেই, সে কেমন আরামে গান গেয়ে গেয়ে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে, আর কোথাকার কে কান্ত, তাই নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। সে কেন ভাবছে এত! মরালীর কী হল না হল তা নিয়ে তার এত দুশ্চিন্তা কেন? মরালী তার কে? তার সঙ্গে তো তার কোনও সম্পর্ক নেই!
তারপর মনে হল–সে ভাববে না তো কে ভাববে! কে আর জানে আসল খবরটা। আসলে মরালীকে এই চেহে-সূতুনে নিয়ে আসার জন্যে সে নিজেই তো দায়ী। কান্ত নিজেই তো এনে এখানে এই পাপের রাজ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে তাকে।
যে-লোকটা গান গাইছিল, সে আবার গান গাইতে গাইতে চলে গেল। কান্ত আবার সারাফত আলির দোকানের দিকে ফিরে এল।
