বাইরে তখনও কেউ জাগেনি। সারাফত আলির তখনও জাগবার সময় হয়নি। চেহেসূতুনের নহবতখানায় তখন ইনসাফ মিঞা টোড়িতে সুর ধরেছে।
সচ্চরিত্র সেই দিকে চোখ পড়তেই বললে–সুর তো বেশ মিঠে সুরই বাজাচ্ছে মিঞাসাহেব, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে ছুঁচোর কেত্তন চলেছে তা তো বাইরের লোক কেউ টের পাচ্ছে না। কাল তো চেহেল্-সুতুনের মধ্যে তুমুল কাণ্ড হয়ে গেছে বাবাজি!
কান্ত উদগ্রীব হয়ে উঠল। বললে–চেহেল্-সুতুনের ভেতরেও আপনি যান নাকি?
না, ভেতরে আর কী করে যাব! কিন্তু চেহেল্-সুতুনের খবর তো মতিঝিলেও ভেসে ভেসে আসে।
কী হয়েছে কাল? বলুন না!
নেয়ামত মিঞার কাছে শুনছিলাম কাণ্ডটা! নজর মহম্মদ হঠাৎ দিনেরবেলায় এসে নেসার সাহেবকে ডেকে নিয়ে গেল দেখে আমি নেয়ামতকে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা কী! শুনে আমার তো চোখ কপালে উঠল বাবাজি। পাপের কি আর শেষ আছে চেহেল্-সুতুনে! আহা!
কান্ত আবার বললে–কী হয়েছে তাই বলুন না!
সচ্চরিত্র বললে–তোমরা বিয়েথা করোনি, ওসব তোমাদের না-শোনাই ভাল বাবাজি। মরিয়ম বেগম বলে একজন নতুন বেগমসাহেবা এসেছিল চেহেল্-সুতুনে। মরিয়ম বেগম হচ্ছে গিয়ে লস্করপুরের তালুকদার কাশিম আলির মেয়ে। লস্করপুরের তালুকদার কাশিম আলিকে একদিন ওই নেসার সাহেবই চর লাগিয়ে খুন করেছে, তা কেউ জানে না। তারপর তার তালুকদারিও গেছে, সবই গেছে, কিন্তু একটা মেয়ে ছিল, সেই মেয়ের নামই হল গিয়ে মরিয়ম বেগম। নেসার সাহেবের লোক তাকে ধরে নিয়ে এসে পুরেছিল চেহেল-সুতুনে। ও-সব ওই বশির মিটার কাজ। শুনলাম, নাকি কোন হিন্দু ছোঁড়াকে দিয়ে তাকে এখানে আনিয়েছিল। আজকাল টাকা পেলে কারও কিছু করতে তো আটকায় না। টাকার জন্যে আজকাল লোকে মানুষই বলে খুন করে ফেলছে টাকার এমনই গুণ বাবাজি
তা তারপর কী হল বলুন।
সচ্চরিত্র বললে–আমার তো সব শোনা কথা বাবাজি, ঠিক-ঠিক বলতে পারিনে। আমি তো নিজের চোখে দেখিনি কিছু। শুনলাম কাল নাকি একজন বাদিকে ধরে খোজারা খুব শাস্তি দিচ্ছিল–সে নাকি অন্তঃসত্ত্বা ছিল–তার নাম জুবেদা, ওই মরিয়ম বেগমের বাঁদি!
কী শাস্তি দিচ্ছিল?
তাকে একেবারে ন্যাংটো করে পা দুটো ওপরে বেঁধে মাটিতে হাত দুটো পুঁতে দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে। দিয়েছিল। বাঁদিটা আবার বোবা, মুখে কথা বলতে পারে না। তাই না জানতে পেরে মরিয়ম বেগম একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল খোজাদের ওপর! খোজারা হল চেহেল-সুতুনের কর্তা। নানিবেগমই বলো আর লুৎফুন্নিসা বেগমই বলো, ওরা তো আসল মালিক নয়। আসল মালিক হল খোজারা! তাদের কাজে বাধা দেওয়া! সে একেবারে হইচই কাণ্ড চেহেল্-সুতুনের ভেতরে। নানিবেগম চিৎকার শুনে নিজে দৌড়ে এসেছে। নজর মহম্মদ করেছে কী, মতিঝিলে এসে নেসার সাহেবকে ডেকে নিয়ে গেছে। কিন্তু মজাটা কী হল জানো বাবাজি-মরিয়ম বেগম সেইখানে সকলের সামনে ফাস করে দিয়েছে যে, সে আসলে লস্করপুরের তালুকদার কাশেম আলির মেয়ে নয়, তার আসল পরিচয়টা বলে দিয়েছে। আসল পরিচয়টা বলে দিতেই নেসার সাহেবের মুখ চুন! নেসার সাহেব আর সেখানে দাঁড়ায়নি, সোজা মুখে চুনকালি মেখে পালিয়ে চলে এসেছে মতিঝিলে। এসে ঢোক ঢোঁক করে কেবল মদ গিলেছে আর নেয়ামতকে গালাগাল দিয়েছে
কান্ত শুনতে শুনতে শিউরে উঠল। জিজ্ঞেস করলে মরিয়ম বেগমের আসল পরিচয়টা কী বলেছে?
আরে, আসলে নাকি ও লস্করপুরের তালুকদারের মেয়েই নয়
মেয়ে নয় তো কে ও? কী বললে?
আরে, ও হল গিয়ে সেই হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই ছিল, যেখানে তোমার বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলাম গো, ও নাকি সেই ছোটমশাইয়ের দ্বিতীয়পক্ষের বউ রানিবিবি! হারামজাদা কিনা তাকে নিয়ে এসে চেহেল্-সুতুনে পুরেছে। ছি ছি ছি, ওদের কি কোনওকালে ভাল হবে বাবাজি!নরকেও ওদের ঠাঁই হবে না, এই তোমাকে বলে রাখলাম। যাই বাবাজি, আজকে এখন গিয়ে আমাকে আবার নমাজ পড়তে হবে–
কান্ত তবু ছাড়লে । বললে–তারপর কী হল বলুন!
তারপর আর কী হবে। তারপর নানিবেগম মরিয়ম বেগমকে ধরে নিজের ঘরে নিয়ে চলে গেল। চেহেল্-সুতুনের সব বেগমরা জানত একরকম, এখন সব দোষটা নেসার সাহেবের ঘাড়ে এসে পড়ল। তাই তো রেগে গিয়ে হাড়া হাড়া মদ গিলেছে। তারপর শুনলুম জুবেদাকে নাকি ছেড়ে দিয়েছে, হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিতে হুকুম করেছে নানিবেগম। খোজাদের অপমানের একশেষ। এর পর কি আর তারা ছেড়ে কথা বলবে বলতে চাও?
সেকথা থাক, হাতিয়াগড়ের রানিবিবির কী হল বলুন? তার কোনও ক্ষতি হয়নি তো?
এখন কী ক্ষতি হবে! কিন্তু খোজারা কি এ অপমানের পর আর ছেড়ে কথা বলবে ভেবেছ? তারা তো মুশকিলে ফেলতে চাইবেই। এর আগেও তো কত বাঁদিকে ঝুলিয়ে রেখে তিন দিন তিন রাত ধরে–খাইয়ে-খাইয়ে ওইরকম করে মেরে ফেলেছে ওরা, তাতে তো কারও কিছু আপত্তি ওঠেনি! তোমার এমন কী সতীপনা করবার দরকার পড়েছিল শুনি? তুমি বাছা, যখন একবার চেহেলসূতুনে ঢুকেছ তখন জাত-জন্ম তো সব খুইয়েছ আমার মতন, তার ওপর আবার সতীপনা দেখাতে গেলে কেন? কী বলো, আমি কিছু অন্যায় বলেছি বাবাজি?
কান্ত কী আর বলবে! কথাগুলো শুনতে শুনতে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল।
সচ্চরিত্র বলতে লাগল–এই যে আমি, আমার কথাই ধরো না, আমি তো অতবড় নামজাদা ঘটক বংশের সন্তান, আমার পিতা হলেন ঈশ্বর ইন্দীবর ঘটক, আমার পিতামহ ঈশ্বর কালীবর ঘটক, সেসব কথা কি আমি এখন মনে রেখেছি? সে কথা আমি কাউকে বলি? বরং পাছে কেউ চিনতে পারে বলে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে থাকি, এই দাড়ি রেখেছি। এখন কি আর ঘটকালি করি আমি কারও? না করব? সে-সব কথা আমি ভুলেই গেছি বাবাজি। আমি গাঁয়ে গেলে গাঁয়ের লোক আমায় তাড়িয়ে দেয়, আমার গায়ে থুতু দেয়। তা তো দেবেই! দেবে না? কী বলো তুমি? তারা তো অন্যায় কিছু করে না। তা আমি কি তাতে আপত্তি করছি? আপত্তি করব কার কাছে বাবাজি? কে আমার আপত্তি শুনছে? যেমন যুগ। পড়েছে, তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই চলতে হবে তো? তাই বাবাজি, আমি ভাটিখানায় বসে চুপ করে নাকে কাপচাপা দিয়ে কাজ করি, আর তিন-সন্ধে নামাজ পড়ি। কী আর করব বলো? আমার নিজের মনে তো কোনও পাপ নেই। তবে শুধু ওই ম্লেচ্ছ মাংসটা এখনও খেতে পারিনি বাবাজি। ওটা খেতে কেমন যেন গা বমি-বমি করে এখনও–এমনি করেই যেক’দিন বেঁচে থাকি, কাটিয়ে দিতে পারলেই বিদেয় নেব! কিন্তু এও তোমাকে বলে রাখলাম বাবাজি, দিনকাল বড় খারাপ পড়েছে, খুব সাবধানে থাকবে।
