কান্ত জিজ্ঞেস করলে–তা তোমাকে কী কী কাজ করতে হয়?
সচ্চরিত্র বললে–বাবাজি, কাজের কি আর অন্ত আছে? মদের গন্ধে আমার বমি আসে, কিন্তু নাকে কাপড় দিয়ে সেই মদের মধ্যেই কাটাতে হয়। মদের জাহাজ এলে সেই মদ মাথায় করে বয়ে আনতে হয়, ভাটিখানায় রাখতে হয়, রেখে আবার তদারকি করতে হয়। আবার মদের টান পড়লে খবর দিতে হয় জোগানের জন্যে অপচো নষ্ট হলে আমাকেই আবার তার জবাবদিহি করতে হয়–
মতিঝিলের পুরনো যারা খিদমদগার তাদের সবাইকে মেহেদি নেসার সাহেব তাড়িয়ে দিয়ে বরখাস্ত করে দিয়েছে। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও আর জায়গা নেই মতিঝিলে। বড় সাধ করে ঘসেটি বেগম তৈরি করেছিল মতিঝিল। একদিন তার আশা ছিল মুর্শিদাবাদের মসনদ তারই দখলে যাবে। মির্জার ভাই এক্রামউদ্দৌলাকে নবাব করার স্বপ্ন দেখত ঘসেটি। কিন্তু তাও চলে গেল। নিজের পেটের ছেলে হল না বলে মির্জার ভাইকে পুষ্যি নিয়েছিল। কিন্তু সে-ও মারা গেল। স্বামীও চলে গেল। তাতেও নবাবজাদির তত দুঃখ ছিল না! দেওয়ান রাজবল্লভ ছিল তার ডান হাত। হুসেনকুলিও ছিল ঘসেটির। আর একজন শাগরেদ। শেষ পর্যন্ত ছিল নজর আলি।
নবাবজাদিদের কেলেঙ্কারি কাণ্ড তুমি তো জানো নিশ্চয়ই বাবাজি! শুনেছও তো কিছু কিছু
কান্ত বললে–কিছু কিছু শুনেছি, সমস্ত জানি না
ও না-জানাই ভাল বাবাজি। সাধে কি আর এ-চাকরি করতে ভাল্লাগে না। ওসব রাজা-বাদশার কেচ্ছা-কিত্তি এখন দেখে দেখে আমার চোখ পচে যাচ্ছে–
এখনও দেখছেন নাকি আপনি? এখনও হয়?
তা হবে না? এই কালই তো হল বাবাজি! চেহেল্-সুতুন থেকে গুলসন বলে এক বেগমকে নাচতে নিয়ে গেছল মতিঝিলে। আমি তো ভেতরে যেতে পারিনে, আমার যাবার হুকুমই নেই। আমি সমস্ত রাত ধরে জেগেছি। আমি হলাম মদের ভাড়ারি, আমার তো ঘুমোলে চলে না। ভেতরে ঘুঙুরের শব্দ শুনছি আর মাতালদের চেঁচানি শুনছি আমার ভাঁড়ারে বসে বসে চোখ দুটো ঘুমে ঢুলে আসছে, কখন তাব পড়ে তার তো ঠিক নেই। হঠাৎ বশির মিল্লা…
বশির মিঞার নাম শুনেই কান্ত চমকে উঠল।
বশির মিঞাকেও আপনি চেনেন নাকি?
বশির মিঞাকে চিনব না? ওর পিসেমশাই হল মেহের আলি মনসুর সাহেব। মেহেদি নেসার সাহেবের আসল শাগরেদ বাবাজি! আমাকে এসে চুপি চুপি বললে– আমাকে একটু দারু পিলাও ইব্রাহিম! তা আমি বুড়োমানুষ, আমি হলাম চাকরস্য চাকর। আমি আর কী করব, আমি ঢালতে যাচ্ছিলুম, হঠাৎ নেয়ামত খাঁ এসে হাজির, দেখতে পেয়েই আমাকে যা নয় তাই বলে মুখ খারাপ করে গালাগাল দিতে লাগল
আর বশির মিঞা?
বশির মিঞা তো ততক্ষণে সেখান থেকে চম্পট দিয়েছে। ওদিকে তখন নেশার তুফান উঠেছে। মতিঝিলের ভেতরে। মেহেদি নেসার সাহেবের আবার নেশা হলে কাণ্ডজ্ঞান থাকে না কিনা। অথচ আজ যে আমার এই দুর্দশা এ-সব তো ওই নেসার সাহেবের জন্যেই। ওই ইয়ারজান, সফিউল্লা সাহেব, ওরাই তো আমার মুখে ম্লেচ্ছ-মাংস পুরে দিয়েছিল, নইলে কি আর আজ আমার জাত যায়! নইলে কি আর আজ আমাকে মতিঝিলের ভাটিখানায় খিদমদগারের কাজ করতে হয়? নইলে কি বাবাজি আমি আজ লজ্জায় মুখ ঢেকে বেড়াই? তা তুমি এখানে কী করতে? আর বিয়েথা করেছ নাকি?
কান্ত মন দিয়ে সব শুনছিল। বললে–না।
তা আর কী করেই বা করবে? আর আমি থাকলে না-হয় একবার চেষ্টা করে দেখতুম! ওদিকে খবর শুনেছ তো? সেই পাগলটা, যার সঙ্গে শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ের বিয়ে জোর করে দিয়ে দিলে, সেও তো সংসার করতে পারলে না। সেই মেয়েও শুনছি পালিয়েছে বাড়ি থেকে! অথচ তোমার সঙ্গে বিয়েটা হলে এমন ঝাটও হত না। তোমরা দুটিতে সুখী হতে, আমাকেও আর এই ইব্রাহিম খাঁ হতে হত না।
কান্ত হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা, আপনাদের মতিঝিলে কোনও চাকরি খালি আছে?
চাকরি? কেন? তোমার সেই সাহেব কোম্পানির সোরার গদির চাকরির কী হল? সেটা নেই? লড়াইয়ের সময় বুঝি গদিদি ফেলে সাহেবরা পালিয়েছে? নিজামতের চাকরিতে এই একটা সুবিধে বাবাজি, জাত থাকে না বটে, কিন্তু চাকরিটা পাকা! এ সহজে যায় না কারও–
আমাকে একটা চাকরি দিতে পারেন আপনি, আপনাদের মতিঝিলে?
তা এখন তুমি কী করছ?
কিছুই করছি না, সে না করারই মতো, একটা চাকরি খুঁজছি যে-কোনও চাকরি, ঘোরাঘুরির চাকরি না। বসে বসে খাতালেখার কি হিসেবপত্তর দেখাশোনার কাজ পেলে ভাল হয়।
সচ্চরিত্র বললে–আমি নেয়ামত মিঞাকে বলে তোমায় জানাব। নেয়ামত নেসার সাহেবের খুব পেয়ারের বোক! তা তোমায় কোথায় পাব? কোথায় তোমায় খবর দেব?
কান্ত বললে–এই এখানেই পাবেন আমাকে, এই সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের পেছনেই আমি থাকি
সচ্চরিত্র বললে–তা তুমি যেন আবার কাউকে বলে দিয়ো না বাবাজি যে, আমাকে তুমি দেখেছ। কাউকে বোলো না। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াই, বড় লজ্জা করে বাবাজি। আমি যে ঈশ্বর কালীবর ঘটকের পৌত্র, ঈশ্বর ইন্দীবর ঘটকের পুত্র, ওসব কথা ভুলতেই চেষ্টা করি! মনে রেখে তো কোনও লাভ নেই, কী বলল বাবাজি? মনে করলেই কেবল কষ্ট
তারপর একটু থেমে বলতে লাগল–যাই বাবাজি, মরে তো যেতামই, তুমি তবু তুলে এনে সেবা করলে বলে একটু গতরে শক্তি পেলুম। কবে এমনি করেই বেঘোরে প্রাণটা যাবে। বাপ-পিতেমো’র নামও, কেউ করবে না মরে গেলে পিন্ডি দিতেও কেউ থাকবে না
