বলব তোকে সব, আল্লার-কিরে বলছি সব বলব, কিন্তু তার আগে আমাকে একবার দেখা করিয়ে দে রানিবিবির সঙ্গে। হারেমের ভেতরে গিয়ে একবার শুধু বাইরে থেকে একটা কথা বলে আসব–
কী কথা?
কান্ত বললে–কাটোয়ার সরাইখানার সামনে একটা পাগলা নোক এসে সেদিন খুব গান গেয়েছিল, সবাই খুব খুশি তার গান শুনে, রানিবিবি তার নামটা জানতে চেয়েছিল আমার কাছে। আমি নামটা জেনে এসে আর বলতে পারিনি তাকে। বলবার সুযোগ হয়নি–
কে সে লোকটা?
সে একটা পাগলা কছমের লোক। কিন্তু খুব মজাদার গান গাইতে পারে ভাই। আমাকে তার নামটা জেনে আসতে বলেছিল রানিবিবি। নামটা জেনেও এসেছিলাম, কিন্তু রানিবিবিকে তা বলা হয়নি সেইটে একবার হারেমের ভেতরে গিয়ে বলে আসব–একবার শুধু যাব ভেতরে, আর নামটা রানিবিবিকে বলেই চলে আসব–মাইরি বলছি, ভেতরে আমি থাকব না বেশিক্ষণ–
বশির মিঞা চুপ করে কী যেন ভাবতে লাগল।
এই তোর পায়ে পড়ছি ইয়ার, আজকে একবার দেখা না করতে পারলে হয়তো জীবনে আর দেখা করা হবে না। অথচ কথা দিয়ে কথা রাখতে পারলুম না বলে মনটায় বড় আফশোস হচ্ছে ভাই, এ আফশোস আমার মরণেও যাবে না–
কিন্তু লোকটা কে? কার নাম জানবার জন্যে রানিবিবির এত নাফড়া?
কান্ত বললে–বলছি তো একটা পাগলা-ছাগলা লোক—
জাসুস নয়তো?
জাসুস? তার মানে?
ফিরিঙ্গিদের গোয়েন্দা ফোয়েন্দা নয়তো? ওরা তো চর লাগিয়েছে তামাম মুর্শিদাবাদে–
আরে না, জাসুস হতে যাবে কেন? চরই বা হবে কেন?
তা নাম কী তার?
উদ্ধব দাস!
নামটা শুনে কিছুই বোঝা গেল না। মনসুর আলি মেহের সাহেবের মোহরার দফতরে ওনামের কোনও চর তো নেই। সকলের নামই মুখস্থ করে রেখেছে বশির মিঞা। উদ্ধব দাস তা হলে হয়তো কোনও বাউল-ফকির হবে। বাউল-ফকিরদের মুলুক এই বাংলা মুলুক। সব বাঙালির বাচ্চাই বাউল-ফকির ভেতরে ভেতরে। ওরা রাজ্য চায় না, মসনদ চায় না, আওরাত চায় না, দৌলত চায় না, শুধু চায় আল্লাতালার দোয়া। তাজ্জব জাত এই বাঙালির বাচ্চারা। আল্লাতালার নাম করতে করতে বাদশাহি পর্যন্ত চলে গেলেও এদের খেয়াল থাকে না।
বশির মিঞা বললে–আচ্ছা চল, খোঁজা-সর্দারকে বলে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছি তোকে, কিন্তু হুঁশিয়ার, বেশিক্ষণ থাকবি না
কান্ত বললে–না ভাই বশির, কথা দিচ্ছি বেশিক্ষণ থাকব না—
তারপর কোণের ফটকটার কাছে গিয়ে বললে—আয়–
ফটকের সামনে পাহারা দিচ্ছিল কে একজন। বশির মিঞা তাকে পাঞ্জা দেখাতেই ভেতরে যেতে দিলে। লম্বা সুড়ঙ্গ মতন রাস্তা। মাথার ওপরে পাতলা ইটের ছাদ। সেটা পেরিয়ে আর একটা ফটকের কাছে আসতেই আর একজন মুখোমুখি দাঁড়াল। বশির মিঞা বুক ফুলিয়ে এগিয়ে গেল। ভয়ডর কিছু নেই। এই পথ দিয়েই হারেমে যাবার রাস্তা। দু’পাশে ঘুলঘুলির মতন গর্ত। ঘুলঘুলির মধ্যে পায়রা বাসা বেঁধেছে। সামনে দিয়ে কারা আসছে। তারা বাইরে যাবে।
বশির মিঞা পাহারাদারকে জিজ্ঞেস করলে–পিরালি কোথায় রে?
লোকটা কী যেন বললে। বশির মিঞা তাকে একপাশে ডেকে কানে কানে কী বলতে লাগল। হাত-মুখ নেড়ে দু’জনের কী সব কথাও হল। দূর থেকে কান্ত কিছুই শুনতে পেলে না। বশিরের ইঙ্গিতে কাছে যেতেই বশির বললে–দেখিস হুঁশিয়ার, ঝটপট চলে আসবি, আর তোর কাছে টাকা আছে?
কান্ত বললে–টাকা? কীসের টাকা?
টাকা লাগবে না? তোকে ঢুকতে দিচ্ছে যে, পিরালিকে ঘুষ না দিলে যে চেয়েই দেখবে না তোর দিকে–
টাকা তো সঙ্গে নেই, তলব পেয়ে পরে দিতে পারি।
বশির মিঞা বললে–দুর, নগদ ছাড়া ঘুষ হয় কখনও! ঘুষের কারবার কখনও বাকিতে চলে?
বলে নিজের পিরানের জেব থেকে টাকা বার করে লোকটার হাতে দিলে। সঙ্গে সঙ্গে একটা লম্বা সেলাম করলে লোকটা কান্তকে। বললে—চলো–
লোকটার পেছন পেছন কান্ত এগিয়ে যেতে লাগল আর একটা ইট-বাঁধানো রাস্তা দিয়ে।
.
কিন্তু যতই ভেতরে যেতে লাগল ততই অবাক হবার পালা কান্তর। ভেতরে তখন বোধহয় খুব গোলমাল চলছে। কারা বোরখা পরে সামনের দিকে আসছিল। লোকটার পেছনে দাঁড়িয়ে কান্ত তাদের পথ করে দিলে। আবার পেছন থেকেই দৌড়োতে দৌড়োতে দু’জন লোক আসছিল। তারা চেঁচাতে লাগল–ফিরিঙ্গিলোগ আ গয়া।
কে এসেছে?
কলকাতা-কুঠির টুপিওয়ালা সাহেবলোগ!
কথাগুলো যেন বিদ্যুতের মতো ক্রিয়া করল চারদিকে। কোথা থেকে আর এক দল লোক বেরিয়ে আসতে লাগল পিলপিল করে। তাদের কথাবার্তা থেকে কিছু বোঝা গেল না।
*
কিন্তু কান্ত জানতেও পারলে না মুর্শিদাবাদের গঙ্গার এ-পারে তখন মানুষের ভিড়ে কোথাও তিল ধরবার জায়গা নেই আর। সারা দেশ ঝেটিয়ে মানুষ এসেছে ইতিহাসের আর এক মজা দেখতে। এতদিন যারা। ঘরের হুড়কো এঁটে মুখে কুলুপ লাগিয়ে বসে ছিল, তারা সবাই গঙ্গার ঘাটে এসে ভিড় জমিয়েছে। এসেছে! ফিরিঙ্গি-কোম্পানির সাহেবরা এসেছে। আর ভয় নেই। এবার ঘরের মেয়েছেলে নিয়ে। নিশ্চিন্তে গেরস্থালি করব। জোর করে কেউ কলমা পড়াবে না। একসঙ্গে দূর থেকে পালতোলা ক’টা জাহাজ বেশ গম্ভীর চালে এগিয়ে আসতে লাগল। মুর্শিদাবাদের মানুষ আনন্দে লাফিয়ে উঠল সেই দিকে। চেয়ে। কাউকে চিনতে পারবার জো নেই। লাল-লাল মুখ সব। গোরা পল্টন। সবসুদ্ধ গোটা তিরিশেক। লোক হবে, তার বেশি নয়।
ক্লাইভ সাহেবের কেমন ভয় করতে লাগল। সবাই যদি একটা করে ঢিল ছুঁড়ে মারে তা হলেই তো আর তাদের দেখতে হবে না। পাশেই গভর্নর ড্রেক সাহেব। মেজর কিলপ্যাট্রিক, মেজর গ্র্যান্ট, মিস্টার ম্যানিংহাম, অমিয়ট, স্ক্র্যাফটন, ওয়াটসন। আর পেয়ারের মুনশি নবকৃষ্ণ। আরও অনেকে। সামনের ফৌজিদল আস্তে আস্তে শহরে ঢোকবার চেষ্টা করতে লাগল। আর সঙ্গে সঙ্গে মুর্শিদাবাদের মানুষ শাখ বাজাতে, উলু দিতে লাগল।
