কিন্তু তা হলে আপনি আছেন কী করতে? আপনি তা হলে কোরান পড়েন কী করতে? কোরানে কি এইসব কথা লেখা আছে?
এবার লুৎফুন্নিসা বেগম এগিয়ে এল। বললে–বহেন, এ চেহেল্-সুতুন, এখানে দুনিয়াদারির কানুন খাটবে না–তুমি কেঁদো না বহেন, রোও মাত–
বলে মরালীর চোখের জল নিজের ওড়নি দিয়ে মুছিয়ে দিতে লাগল।
ওদিকে বুঝি নজর মহম্মদ নেসার সাহেবকে কখন গিয়ে খবর দিয়ে এসেছিল। হঠাৎ এরই মধ্যিখানে মেহেদি নেসার সাহেব আসতেই সব আবহাওয়া যেন থমথমে হয়ে এল। শুধু ঝুলে থাকা উলঙ্গ বাদিটার গলা থেকে বেরোনো গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া আর সবকিছু নিস্তব্ধ।
বেগমসাহেবা!
নানিবেগম নেসার সাহেবের দিকে চেয়ে রইল।
মেহেদি নেসার তেমনি মাথা নিচু করে বললে–বেগমসাহেবা, নবাব মির্জা মহম্মদ মরিয়ম বেগমসাহেবাকে মতিঝিলে এত্তেলা দিয়েছে–
কথাটা শেষ হবার আগেই মরালী চিৎকার করে উঠল–আমি মতিঝিলে যাব না নানিবেগমসাহেবা, আমি মতিঝিলে যাব না
নেসার সাহেব বললেনবাবের হুকুম যে এটা মরিয়ম বেগমসাহেবা।
আমি যাব না, আমি কিছুতেই যাব না মতিঝিলে বলে মরালী হঠাৎ নানিবেগমকে গিয়ে জড়িয়ে ধরল প্রাণপণে। আর কিছুতেই ছাড়তে চায় না। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য!
বললে–আপনার পায়ে পড়ি নানিবেগমসাহেবা, আমি আপনার মেয়ের মতন
কিন্তু মির্জা যে তোমাকে ডেকেছে মা, না গেলে সে যে গোঁসা করবে! সে যে খুব রাগী মানুষ! মরিয়ম বেগমের নাম করে যখন ডেকেছে, তখন না-গেলে নবাবের অপমান হয়। না মা মরিয়ম, তোমার কোনও ডর নেই, আমি বলছি তুমি যাও
হঠাৎ মরালী নানিবেগমের মুখের ওপর মুখ রেখে বললে–কিন্তু মা, আমি তো মরিয়ম বেগম নই
মরিয়ম বেগম নও? লস্করপুরের তালুকদার কাশিম আলির লেড়কি নও
মরালী বললে–না মা, আমি হাতিয়াগড়ের জমিদারের ছোটবউ, আমি আজ সত্যি কথাই বলি, আমি হাতিয়াগড়ের রানিবিবি!
কথাটা বলবার সঙ্গে সঙ্গে যেন সারা চেহেল্-সুতুনে বিদ্যুৎ চমকে গেল। নানিবেগম অবাক হয়ে মেহেদি নেসার সাহেবের দিকে চেয়ে বললে–হাতিয়াগড়ের রানিবিবি!
কিন্তু মেহেদি নেসার তখন সেখান থেকে নিঃশব্দে সরে গেছে। নানিবেগমের হঠাৎ মনে পড়ল বহুদিন আগে হাতিয়াগড়ের বড় রানিবিবি তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে একটা খত্ লিখেছিল। তখন নেসার বলেছিল সেসব মিথ্যে কথা। শেষকালে সেই খল্টার কথাই সত্যি হল?
নানিবেগম মরালীকে বুকের মধ্যে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল।
লুৎফুন্নিসা বেগমও তখন মরালীকে সান্ত্বনা দিতে লাগল–বহেন, তোমার কোনও ডর নেই, তুমি কেঁদো না বহেন
ওদিকে কাঠগড়ার ওপরে বোবা জুবেদা তখনও গোঁ গোঁ করে গোঙাচ্ছে, আর তার মুখ দিয়ে গলগল করে সাদা সাদা ফেনা বেরোচ্ছে।
২.০৫ খুশবু তেলের দোকান
সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানেও তখন সকাল হয়েছে। ইব্রাহিম খাঁ-কে সারা রাত হাওয়া করেছে কান্ত। বুড়ো মানুষ। কিন্তু টাকার জন্যে সরাবের হড়া বয়ে নিয়ে যেতে হয় ভাটিখানা থেকে। ইস্তানবুল খোরাসান, দিল্লি থেকে কিম্মৎদার দারু মুর্শিদাবাদের ঘাটে আসে নৌকায় করে। সেই হাড়া বয়ে বয়ে নিয়ে যেতে হয় মাথায় করে। বয়ে নিয়ে গিয়ে মতিঝিলের সরাবখানায় রাখতে হয়। মতিঝিলের ঠান্ডা ঘরের ভেতর সেই সরাব জমা হয় নবাবের জন্যে। মহফিলের দিন সবাই সেই সরাব খায়। শুধু নবাব সরাব খায় না। কিন্তু নবাব না খেলেও শাগরেদরা খায়, নবাবের ইয়াররা খায়। মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, সফিউল্লা সাহেব খায়!
তা তোমার তো খুব মেহনত হয়। তুমি কত তলব পাও খাঁ সাহেব?
ইব্রাহিম খাঁ সারারাত ঘুমিয়ে তখন একটু সেরে উঠেছিল। বললে–তিন টাকা জনাব!
তিন টাকা মাত্তর! কিন্তু দিনের আলোয় ইব্রাহিম খাঁ’র মুখের দিকে চেয়ে কান্ত আরও নিচু হয়ে কী যেন দেখতে লাগল। বড় চেনা-চেনা লাগল যেন মুখখানা।
ইব্রাহিম খাও দেখলে কান্তকে। কান্তকে যেন এতক্ষণে চিনতে পারলে।
কান্তও বললে–আচ্ছা খাঁ সাহেব, তোমাকে যেন কোথায় দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছে বলো তো?
ইব্রাহিম খাঁ হঠাৎ বলাকওয়া-নেই তেড়েফুঁড়ে উঠে বসল।
উঠছ কেন? শুয়ে থাকো, শোও শোও
কিন্তু তখন আর কে তার কথা শোনে। বুড়ো উঠে একেবারে পালাবার জন্যে বাইরে চলে যায় আর কী! কান্তও বুড়োর কাণ্ড দেখে অবাক হয়ে গেল। এমন হঠাৎ উঠে পড়বার কী হল!
কিন্তু দরজার কাছে আসতেই দিনের আলোয় মুখখানা দেখে স্পষ্ট চিনতে পারলে কান্ত।
আরে, তুমি সেই সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাই না?
বুড়ো হঠাৎ নিজের মুখখানা দু’হাতে ঢেকে ছুটে পালাবার চেষ্টা করতে লাগল। বলতে লাগল না, আমি ইব্রাহিম খাঁ, আমি ইব্রাহিম খাঁ
কিন্তু পালাবার আগেই কান্ত পুরকায়স্থ মশাইয়ের হাতখানা জোরে ধরে ফেলেছে। ধরে ফেলতেই পুরকায়স্থমশাই একেবারে ছেলেমানুষের মতো হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছে।
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থকে দেখে কান্ত সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছিল। সেই বুড়ো মানুষটার যে এমন দশা হবে তা কল্পনাও করতে পারেনি। তার সংসার গেছে, বউ-ছেলেমেয়ে গেছে। গাঁয়ের লোকও তাকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তার ব্যাবসাও গেছে। কতদিন লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়িয়েছে। না-খেয়ে দিন কাটিয়েছে, ছেলেমেয়েগুলোর জন্যে মন কেমন করেছে। রাতের অন্ধকারে গ্রামে গিয়ে তাদের দেখতে চেয়েছে। কিন্তু লোকের ভয়ে আবার চলে এসেছে সেখান থেকে। তারপর এখানে এসে মতিঝিলের নেয়ামত খ-কে ধরে এই চাকরি পেয়েছে। বুড়ো বয়েসে এই খাটুনির চাকরি করবার ক্ষমতাও নেই শরীরে, অথচ না করেও উপায় নেই। দুটো খেতে তো হবে।
