ভয়ে আতঙ্কে বোবা বাঁদিটা গোঁ গোঁ করে গোঙাতে লাগল প্রাণপণ! বেশ চলছিল সব। চারদিকে বেশ মজা দেখবার ভিড় জমেছিল। এমনি করেই পাপীর শাস্তি হয়ে থাকে চেহেল্-সুতুনে। পাপের ভাঁড়ারের মধ্যে পাপীকে প্রশ্রয় দেওয়ার রীতি নেই। তাই এমনি করেই পাপীর শাস্তি চিরকাল ধরে এখানে চলে আসছে। যেদিন থেকে পৃথিবীতে সূর্যোদয় শুরু হয়েছে সেই দিন থেকেই এই রেওয়াজ। জাফরির ফাঁক দিয়ে যারা এ-দৃশ্য দেখছে, তাদের কাছে এ-কিছু নতুন নয়। এমনি করে তিন দিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা হবে জুবেদাকে। এক কণা রুটি দেওয়া হবে না, এক ফোঁটা জল দেওয়া হবে না, এক মুঠো করুণাও কেউ দেবে না। তিন দিন পরেও যদি জুবেদা বেঁচে থাকে তো তখন…
হয়তো এমনি করেই আরও অনেকক্ষণ ধরে মজা দেখত চেহেল্-সুতুনের মানুষরা।
কিন্তু হঠাৎ একটা কাণ্ড ঘটল।
ওদিক থেকে পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে এসেছে মরিয়ম বেগমসাহেবা।
পিরালি খাঁ দেখতে পেয়েই ইঙ্গিত করলে নজর মহম্মদকে। আর নজর মহম্মদও ইঙ্গিতটা বুঝল। বোঝবার সঙ্গে সঙ্গে মরিয়ম বেগমসাহেবার পথ আটকে দাঁড়িয়েছে।
আমার বাঁদি। আমার বাঁদিকে তোমরা ও কী করছ? ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও ওকে
মরালীর চিৎকারটা আর্তনাদ হয়ে যেন সমস্ত চেহেল্-সুতুনটা একেবারে কাঁপিয়ে তুলল। সকলের মনে হল যেন এতদিন পরে যোবা চেহেল্-সুতুনটারও মুখে কথা ফুটল। মরিয়ম বেগম যেন চেহেল সুতুনের সকলের হয়ে এই প্রথম এক প্রবল প্রতিবাদ পেশ করল।
জাফরির ফাঁকে তক্কি বেগম পাশের বাঁদিকে জিজ্ঞেস করলে–উও কৌন?
বাদি বললে–কোই নয়ি বেগমসাহেবা হোঙ্গি
বব্বু বেগমও অবাক হয়ে গেছে। আগে কখনও মরিয়ম বেগমকে দেখেনি। সেও জিজ্ঞেস করলে তার বাঁদিকে–উও কৌন?
জাফরির ফাঁকে ফাঁকে যত বেগমসাহেবা ছিল সকলের মুখেই ওই একই জিজ্ঞাসা? উও কৌন? এত সাহস তো এতদিন কারও হয়নি। এর আগেও কত বেগমসাহেবার কত বাঁদির ঠিক এমনি করেই শাস্তি হয়েছে, কিন্তু আগে তোকই এমন করে কেউ প্রতিবাদ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েনি এখানে?
কাঠগড়ার ওপর তখনও উলঙ্গ বাঁদিটার পাপী দেহ ঝুলছে আর মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করে গোঙাচ্ছে।
খোলো, ওকে খুলে দাও, ওর পায়ের দড়ি খুলে দাও–ও মরে যাবে যে—
পিরালি খাঁ নজর মহম্মদকে আর একবার চোখ টিপে ইঙ্গিত করলে। নজর মহম্মদও আর দেরি করলে না। মরালী কাঠগড়ার ওপর উঠে নিজেই বাদিটার পায়ের দড়ি খুলে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নজর মহম্মদ মরিয়ম বেগমসাহেবার একটা হাত ধরে ফেলেছে।
মরালী এক ঝটকায় সঙ্গে সঙ্গে নজর মহম্মদের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়েছে।
তোমরা ভেবেছ কী? বোবা মেয়েমানুষ পেয়ে ভেবেছ যা খুশি তাই করবে? সরে যাও এখান থেকে, সরে যাও–
এবার নজর মহম্মদের সঙ্গে বরকত আলিও এল মরিয়ম বেগমকে সামলাতে।
মরালী এবার যেন একেবারে ফেটে চৌচির হয়ে গেল।
নানিবেগমসাহেবা–নানিবেগমসাহেবা
চেহেল-সুতুন যেন তোলপাড় হয়ে যাবে মরিয়ম বেগমের চিৎকারে। নজর মহম্মদ তাড়াতাড়ি এসে মরালীর মুখটা চাপা দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু হাতিয়াগড়ের শোভারাম বিশ্বাসের মেয়ে অমন অনেক নজর মহম্মদকে দেখেছে। একদিন মরালীর ভয়ে সমস্ত হাতিয়াগড়ের মানুষ কাঁপত। সেই মরালীকে অত সহজে কাবু করা সম্ভব নয়। মরালী নজর মহম্মদের হাতটা দাঁত দিয়ে জোরে কামড়ে ধরলে। কামড়াতেই নজর মহম্মদ গিয়া গিয়া বলে চেঁচিয়ে উঠে হাত ছেড়ে দিয়েছে।
এবার পিরালি খাঁ আর দেরি করলে না। নিজেই এগিয়ে এসে মরিয়ম বেগমকে ধরতে গেল।
কিন্তু তার আগেই নানিবেগম এসে হাজির হয়েছে। সঙ্গে লুৎফুন্নিসা বেগম।
নানিবেগম শান্ত গলায় ডাকলে–পিরালি খাঁ
পিরালি সঙ্গে সঙ্গে নানিবেগমের দিকে মুখ করে তিনবার কুর্নিশ করে মাথা নিচু করে দাঁড়াল।
মরিয়ম বেগমসাহেবাকো ছোড় দো
বেগমসাহেবা, জুবেদাকে কাঠগড়ায় লটকে দিয়েছি, নেসার সাহেবের হুকুমে মরিয়ম বেগমসাহেবা বাধা দিচ্ছে
মরালী দৌড়ে নানিবেগমের কাছে এসে দাঁড়াল।
বললে–ও যে মরে যাবে নানিবেগমসাহেবা, ও মেয়েমানুষ বলে কি ওর এত হেনস্থা, ওকে কেউ দেখবে না–ওকে ছেড়ে দিতে বলুন না আপনি–
নানিবেগম মরালীর দিকে চাইলে। তারপর শান্ত গলায় বললে–তুমি মা ওদের ব্যাপারে কেন মাথা ঘামাচ্ছ? ওদের কাজ ওরা করুক, ওতে বাধা দিতে নেই–
কিন্তু ও যে বোবা! ও যে কথা বলতে পারে না।
কিন্তু যা নিয়ম তা তো মানবেই ওরা। ওদের কাজ ওরা করবেই!
মরালী বললে–নানিবেগমসাহেবা, আপনি আমার মায়ের মতন, আপনি জুবেদারও মায়ের মতন, আপনার চোখের সামনে এত বড় অন্যায়টা ঘটবে আর আপনি কিছু বলবেন না ওদের? নিয়মটাই বড় হবে আপনার কাছে? মায়া-দয়াটা কিছু নয়? আপনার নিজের পেটের মেয়ের বেলায় যদি অমনি হত, তা হলে? আপনি তা চোখ দিয়ে দেখতে পারতেন?
নানিবেগম প্রথমে কিছু বললে–না। তারপর বললে–তুমি মা নতুন এসেছ এখানে, তাই অত বিচলিত হয়ে উঠেছ, আর কিছুদিন থাকলেই সব বুঝতে পারবে
মরালী বললে–সে যখন বুঝতে পারব তখন বুঝব, এখন ওকে ছেড়ে দিতে বলুন আপনি ও গোঁ গোঁ করছে, ও নির্ঘাত মরে যাবে, আর বাঁচবে না–
নানিবেগম শান্ত গলায় বললে–তুমি মা ওসব কথা ভেবো না, তুমি এখান থেকে চলে যাও, আমিও চলে যাচ্ছি, চেহেলসূতুনের নিয়ম ওরা মানবেই, ও কেউ ঠেকাতে পারবে না
