বললে–মিঞাসাহেব, এখনও মরেনি লোকটা, একটু জল দেব মুখে যদি বেঁচে যায়—
বাদশা এল। কান্ত বললে–একটু জল আনো তো
সারাফত আলি মুখে কিছু বললে–না। কিন্তু মুখের ভাব দেখে মনে হল খুশি হয়নি। নবাব-নিজামতের কোনও লোকের ওপরই সে খুশি নয়। জিজ্ঞেস করলে এ কৌন হ্যায়?
কান্ত বললে–শুনলাম, মতিঝিলে সরাবখানায় খিদমদগারের কাজ করে ইব্রাহিম খাঁ
সারাফত আলি কিছু বললে–না। শুধু জোরে শব্দ করে গড়গড়ার নলে তাম্বাকুর ধোঁয়া টানতে লাগল।
*
বখতিয়ার খিলিজির পর থেকে নবাব আলিবর্দি খাঁ পর্যন্ত ইতিহাসের একটা গতিপথ আছে। সে-গতিপথে অনেক অত্যাচার অনাচার অবিচার ঘটলেও মুর্শিদকুলি খাঁ’র পর থেকে দেশে একটা শৃঙ্খলা আনবার চেষ্টা হয়েছিল। সে চেষ্টার খানিকটা এসেছে মোগল-পাঠানদের নিজেদের লড়াই মারামারি থেকে। আর খানিকটা এসেছিল দেশের মানুষের আত্মরক্ষার তাগিদ থেকে।
হয়তো এই-ই নিয়ম। হয়তো এমনিই হয়ে থাকে।
হয়তো অন্ধকারের পাশেই আলো থাকে। অত্যাচারের পাশেই থাকে ন্যায়বিচার। একদিকে ইতিহাস যখন অত্যাচারের কলঙ্কে পঙ্কিল হয়ে উঠেছে, তখনই আর একদিকে উদয় হয়েছে তথাগত বুদ্ধদেবের, চৈতন্যদেবের, আর শঙ্করাচার্যের। কিন্তু মুর্শিদকুলি খাঁ’র চেহেলসূতুনের মধ্যে তখনও সেই। প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার। তার এপাশেও আলো নেই, ওপাশেও হতাশা। ওর ভেতরে দিন-রাত, ধর্ম-অধর্ম, পাপ-পুণ্য, সংস্কার কুসংস্কার সব একাকার। ওখানে তখন পৃথিবী তার আদিম অবয়ব নিয়ে নিশ্চল দারুভূত হয়ে আছে। বুদ্ধদেবের নির্বাণ-মন্ত্র ওখানে পৌঁছোতে পারেনি,–চৈতন্যদেবের আচণ্ডালপ্রীতি কোনও রেখাপাত করেনি, শঙ্করাচার্যের ব্রাহ্মণ্য বাণী ওদের কাছে গিয়ে বোবা হয়ে গেছে।
তাই যেদিন বোবা জুবেদার শরীরটা নিয়ে চেহেল্-সুতুনের ভেতরে টানাহ্যাঁচড়া চলল সেদিন কারও কাছে সে-ঘটনা নতুন মনে হয়নি। এ আর এমন কী! এ তো সহজ! এ তো স্বাভাবিক। আদিযুগ থেকে তো এমনিই হয়ে আসছে। আবার অনন্তকাল ধরেও এমনিই চলবে! ও নিয়ে অত বিচলিত হচ্ছ কেন? যে বাচ্চার বাপের ঠিক নেই, সেই বাচ্চাকে যে পেটে ধরেছে তার শাস্তি হবে না? তার শাস্তি যদি না হয় তো চেহেল্-সুতুন, যে অনাসৃষ্টিতে ভরে যাবে!
চেহেল-সুতুনের চবুতরের আরও পুবে যেখানে ধোবিখানা, সেই দিকটাতে সকাল থেকেই ছুতোর মিস্ত্রিদের কাজ চলছিল। একটা উঁচু লম্বা কাঠের কাঠগড়া। দু’পাশে দুটো কাঠের খুঁটি। তার মাথায় শক্ত দুটো হাতল। ওদিকটায় বেশি কেউ যায় না। রাতের বেলায় জায়গাটা খাঁখাঁ করে। লাল পাথরে বাঁধানো জায়গাটার ওপর দিনেরবেলা কিছু ঘাগরা-ওড়নিকঁচুলি কেচে শুকোতে দেয় ধোপারা যখন তাও দেয় না তখন খিলেনের ভেতর থেকে পোষা পায়রার ঝক এসে ওইখানে বসে পাখা চুলকোয়। পেখম তোলে। চানা খায়। কিন্তু সেদিন সকাল থেকেই যেন চাপা-চাপা কানাঘুষো চলেছে। চেহেল-সুতুনের মহলে মহলে ফিসফিস গুজগুজ।
কে? কাকে লটকাবে বললে?
বাঁদিরা বেগমদের কাছে খবরটা দিয়ে তারিফ পাবার আশা করে।
ওমা, তাই নাকি? বোবা মাগির পেটে পেটে এত? কে করলে রে? মানুষটা কে?
সবাই যেন বেশ খুশি-খুশি। সবাই-ই ডুবে ডুবে জল খায়, তবু যে ধরা পড়েছে তার ওপরেই যেন সকলের বিষনজর। নাগর তো আমাদের ঘরেও আসে বাছা, ঘরে এসে রাত কাটায়, কিন্তু এমন করে ধরা তো পড়ি না। কতদিন ন্যাকড়া-জড়ানো রক্ত-মাখানো ডেলাটা চেহেল্-সুতুনের পাঁচিল ডিঙিয়ে বাইরে চুপি চুপি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। ভোরবেলা কাক-চিল-শকুনের ভিড় হবার আগে পর্যন্ত কেউ-ই টের পায়নি। আর টের পেলেও পিরালি খাঁ’র হাতে কিছু গুঁজে দিলেই সব ধামাচাপা পড়ে গেছে। কেউ জানতে পারেনি কোন বেগমের ঘর থেকে তা ফেলা হয়েছে, আর কে-ই বা দায়ী!
বেগমসাহেবা, চলো চলো, দেখবে চলো জুবেদাকে ধরে এনেছে
ও-ও তো একটা কাজ। সারা দিনরাত খেয়েদেয়ে ঘুমিয়েও তো সময় কাটে না কারও। কত আরক খাবে, কত রাত জাগবে, কত গান গাইবে, কত নাচ নাচবে! তবু যে ওদের সময় ফুরোতে চায় না। তক্কি বেগম জাফরিটার আড়ালে গিয়ে দেখছে। বব্বু বেগম গিয়ে দেখছে, গুলসন বেগম গিয়ে দেখছে। সবাই জড়ো হয়েছে আড়ালে। সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবে। জাফরির ফাঁক দিয়ে বাইরের সব জিনিস স্পষ্ট দেখা যাবে, কিন্তু বাইরের লোক ভেতরের কিছুই দেখতে পাবে না।
পিরালি খাঁ তদারকি করছিল কাঠগড়ার কাজে। ওদিক থেকে চারজন খোঁজা জুবেদাকে ধরে নিয়ে এল হিড়হিড় করে। বাঁদিটার কাপড়জামা কঁচুলি সব খুলে নিয়েছে। উদোম চেহারা একেবারে। আহা, আসতে কি চায়। কথাও বলতে পারে না, চেঁচিয়ে কাঁদতেও পারে না; শুধু গলা দিয়ে এক রকম গো গোঁ আওয়াজ বেরোচ্ছে। আর নজর মহম্মদ, বরকত আলি ওরা চাবুক নিয়ে শাসাচ্ছে
টানতে টানতে হিচড়োতে হিচড়োতে একেবারে সোজা কাঠগড়াটার সামনে নিয়ে এল। তারপর একজন ধরলে জুবেদার পা দুটো, আর একজন ঘাড়টা। ধরে ঝুলিয়ে দিলে। পা দুটো ওপরের হাতলের সঙ্গে বেঁধে মাটির দিকে মাথাটা ঝুলিয়ে দিলে।
সমস্ত চেহেল্-সুতুনের যেন আনন্দে একেবারে দম বন্ধ হয়ে পড়বার অবস্থা।
তারপর নীচেয় গর্ত করে, হাত দুটো মাটিতে পুঁতে জম্পেশ করে কাঠের খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিলে। যেন হাত না নাড়তে পারে।
